সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
এসএম ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:১১ পিএম
পৃথিবীকে বিনিসুতোয় গেঁথেছে ইন্টারনেট। প্রযুক্তির এই ভার্চুয়াল গ্রামের অন্যতম সমাজ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো। এসব মিডিয়ায় উভয়মুখী বিক্রিয়ার সুযোগে ফেসবুক, টুইটার, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো হয়ে উঠেছে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনটিতে ইন্টারনেট না থাকলেই যেন জীবন মনে হয় অসাড়। এই প্ল্যাটফর্মগুলো হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার মতোই আমাদের আবিষ্ট করেছে। আবার প্ল্যাটফর্মগুলো সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে ব্যবসায়িক সমৃদ্ধিকেও ত্বরান্বিত করছে। কখনও কখনও ভাঙনের সুরও বাজাচ্ছে সমানতালে। আর এই ধ্বংসের নকিব ‘অপতথ্য’।
অপতথ্যের রকমফের
বর্তমান সময়ে তথ্য হচ্ছে খনিজ তেলের মতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই তথ্যেরই জোগান দেয়। আর এই রসদ তৈরি করে খোদ ভোক্তারাই। ফলে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে তথ্যের পিঠাপিঠি বেড়ে ওঠে অপতথ্য। আবেগ, অজ্ঞতা আর লিপ্সায় বাড়ন্ত হয়। তবে প্রযুক্তির কারসাজিতে অপতথ্য চিনতে কষ্ট হয়। এ কারণেই অপতথ্যকে এখন পর্যন্ত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ম্যালইনফরমেশন। মিস ইনফরমেশন হলো অজ্ঞতার মাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্য। এই যেমনÑ কাঁচা হলুদ খেলে কিডনি ভালো থাকে টাইপের। ডিসইনফরমেশন হলো নির্জলা মিথ্যা তথ্য বা উড়ো খবর। আর ম্যালইনফরমেশন হলো ইচ্ছে করে রচিত ভুয়া তথ্য বা গুজব। এটি সত্য-মিথ্যার মিশেলে একটি রসনাবিলাসী ব্যঞ্জন বলা চলে। সোশ্যাল মিডিয়া মোটা দাগে তিন ধরনের অপতথ্য ছড়ায়।
রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা : এক দল বা ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার জন্য মিথ্যা বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য প্রচার করা। এর মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা, বিরোধী পক্ষের চরিত্রহনন, বিভ্রান্তিকর পোস্ট বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
ধর্মীয় প্রোপাগান্ডা : ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য ভুল তথ্য বা উস্কানিমূলক বার্তা প্রচার। এটি কখনও ধর্মীয় সহিংসতা বা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
গুজব ও মিথ্যাচার : সামাজিক মিডিয়ায় অনেক সময় এমন গুজব বা মিথ্যা খবর ছড়ানো হয় যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু সেটি নিয়ে মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া।

সোশ্যাল মিডিয়া না ধোঁকার বাজার?
সোশ্যাল মিডিয়ার অভ্যুদয়ের আগেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেÑ অপতথ্য। বিশেষ করে নাৎসি জার্মানির তথ্যমন্ত্রী পল জোসেফ গোয়েবলসের সময় থেকে পেয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপও। অ্যাডলফ হিটলারের এই একনিষ্ঠ সহযোগীর প্রধান কাজ ছিল হিটলারের পক্ষে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। মিথ্যাকে সত্য বানানো। তার থিউরি ছিলÑ মিথ্যা+মিথ্যা+মিথ্যা...=সত্য। গোয়েবলস বলতেনÑ মিথ্যা যখন বলবে, তখন বড় মিথ্যাই বলবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেহেতু যেকোনো তথ্য-উপাত্ত মুহূর্তে বিশ্বময় ছড়িয়ে যায়; সেক্ষেত্রে ‘অপতথ্য’ এই সময়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। ফটোশপ এবং এআই এই চ্যালেঞ্জকে আরও উস্কে দিয়েছে। ক্লিক-বিট; ভাইরাল, ইনফ্লুয়েন্সার ইত্যাদি অপতথ্যের শৈল্পিক রূপে কখনও কখনও সোশ্যাল মিডিয়াকে ধোঁকার বাজার বানিয়ে ছাড়ে। অনেক সময় সামাজিক মিডিয়ায় প্রচারিত খবরের মাধ্যমে প্রচারিত ভুল তথ্য বা গুজব প্রথাগত গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। একপর্যায়ে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে নিজেদের প্ল্যাটফর্মের তথ্য যাচাই করতে কমিউনিটি গাইডলাইন তৈরি করে ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা। তারাই প্রথম চালু করে ফ্যাক্ট চেক। আর সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অনেক অপতথ্যই যেহেতু মিডিয়াতেও সাওয়ার করে, সেদিকটায় খেয়াল রেখে সংবাদের ফ্যাক্ট চেক চালু করে বার্তা সংস্থা এএফপি। বাংলাদেশে মেটার হয়ে ফ্যাক্ট চেকের কাজ করে ইউল্যাবের ফ্যাক্ট ওয়াচ। এএফপি ফ্যাক্ট চেক টিমও রয়েছে বাংলাদেশেই।
সোশ্যাল মিডিয়া; অপতথ্য ও বাংলাদেশ
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ১০০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ, আর নারী ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নারী ব্যবহারকারী ৩২ দশমিক ১ শতাংশ এবং পুরুষ ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ ছিলেন। সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেসবুকের মেসেঞ্জার ব্যবহারকারী ৫ কোটি ৭২ লাখ ৬৫ হাজার ৮০০ জন। যার ৬৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৪ শতাংশ নারী। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মেসেঞ্জার ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল নারী। আর পুরুষ ছিল ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ব্যবহারকারী বেড়েছে এবং একই হারে পুরুষ ব্যবহারকারী কমেছে। তবে নেপোলিয়নক্যাটের তথ্যানুযায়ী ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ইনস্টাগ্রামে। এতে গত এক বছরে দেশের নারী ব্যবহারকারী কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে প্রতি ১০০ জন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর মধ্যে ৬৬ জনই পুরুষ। শতাংশের হিসাবে নারী ৩০ দশমিক ৮ এবং পুরুষ ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ইনস্টাগ্রামে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের মধ্যে নারী ছিল ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম বাংলাদেশ নিয়ে ভুয়া খবর ও গুজব ছড়িয়েছে। এমন ভুয়া খবর প্রচারের তালিকায় ভারতের অন্তত ৪৯টি গণমাধ্যমের নাম উঠে এসেছে বাংলাদেশের তথ্য যাচাই সংস্থা রিউমার স্ক্যানারের এক প্রতিবেদনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সেও (সাবেক টুইটার) চলছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় আক্রান্তÑ মূলত এমন ভুয়া তথ্য বেশি ছড়ানো হচ্ছে সেখানে। অপতথ্য ছড়াতে এক্সে নতুন আইডি খোলার হার বেড়েছে ২১৪ শতাংশ। গত বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ করা (আপলোড) ৭৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৯টি ভিডিও মুছে ফেলেছে টিকটক। ডিসমিসল্যাব এমন ৫৮টি ইউটিউব চ্যানেলের খোঁজ পেয়েছে যেগুলো বিদেশি ও বাংলাদেশি সুপরিচিত সংবাদমাধ্যমের কার্যত নকল।
এ এক নতুন যুদ্ধের মঞ্চ
মূলত ২০১৫-১৬ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল মঞ্চে অপতথ্যের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু ব্যক্তিগত জীবন শেয়ার করার একটি স্থান নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রচারণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও সামাজিক মিডিয়ার এই শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা, যা অনেক সময় বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়, তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক সময়ই উত্তপ্ত থাকে এবং এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় এবং তার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সামাজিক মিডিয়া ছিল একটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। ওই সময় বুম বাংলাদেশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কাজ শুরু করে। এরপর ইউল্যাবের ফ্যাক্ট ওয়াচ, রিউমার স্ক্যানারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই কাজ শুরু করে। তবে এসব প্রচেষ্টা মোটেই যথেষ্ট নয়। কেননা এখানে দলীয় সমর্থকরা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনও সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার করে নিজেদের চিন্তা-ধারা ও আদর্শ প্রচার করতেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এই প্ল্যাটফর্ম। সবশেষ দেশের বাইরে থেকেও শুরু হয়েছে এই অপতথ্য নিয়ে যুদ্ধ। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে ‘অত্যাচার’Ñ যেসব ভুয়া পোস্ট এখন দুই দেশের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের সচেতনতা এবং মিডিয়ার ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন নাগরিকরা এ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠতে পারে, তবে তা কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অপতথ্য মোকাবিলায় করণীয়
ফেসবুকের থাকলেও টুইটার, ইউটিউব, টিকটকের ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে কমিউনিটি গাইডলাইন নেই। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার অপতথ্য ঠেকাতে নিজেদেরই গেটকিপারের ভূমিকা পালন করতে হবে। আলো জ্বেলে যেমন অন্ধকার দূর করতে হয়; তেমনি তথ্যের অবাধ প্রবাহে তথ্য যাচাই করে ঠেকাতে হবে অপতথ্য। এক্ষেত্রে অপতথ্য চেনার জন্য সবার আগে অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তথ্য-ভোক্তাদের। তথ্যের উৎস; যৌক্তিকতা, স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় নিতে হবে কোনো কিছু শেয়ার করার আগে। ম্যালইনফরমেশনের ন্যারেটিভ তৈরির বিষয়ে থাকতে হবে সজাগ। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বাধ্যতামূলক করার বিকল্প নেই। পাঠকদের সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যকে কখনই ‘সংবাদ’ বলে বিবেচনা করাটা ঠিক হবে না। তথ্য বিশ্বাস করার আগে প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা থাকতে হবে তথ্যটির ইথিক্যাল ও লজিক্যাল অ্যানলাইসিস করে এর ভ্রান্তি দূর করা যেতে পারে। একইভাবে ছবি বা ভিডিও, গুগল ইমেজ ও ভিডিও রিভার্স সার্চ করে খতিয়ে দেখার প্রবণতা বাড়াতে হবে।