× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো কনটেস্ট -২০২৪

জীবনসংগ্রামের দৃশ্যগল্প

হাসনাত মোবারক

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:০৭ পিএম

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৪ ১৪:২১ পিএম

পিতা মেসুত হাঞ্চের ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপাপড়া ১৫ বছর বয়সি মেয়ে ইরমাকের হাত ধরে আছেন। ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির ভোরে তুরস্ক এবং সিরিয়ার বুকে বয়ে যায় ৭.৮ মাত্রার এক ভূমিকম্প। দক্ষিণ তুরস্কের ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরমাক মারা যায় ৭ ফেব্রুয়ারি। সিরিজ এ ভূমিকম্পের প্রথম আঘাতেই ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ভিটেছাড়া হয় প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ। আলতানের তোলা আলোকচিত্রটি সেই ভূমিকম্পের খণ্ডচিত্র

পিতা মেসুত হাঞ্চের ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপাপড়া ১৫ বছর বয়সি মেয়ে ইরমাকের হাত ধরে আছেন। ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির ভোরে তুরস্ক এবং সিরিয়ার বুকে বয়ে যায় ৭.৮ মাত্রার এক ভূমিকম্প। দক্ষিণ তুরস্কের ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরমাক মারা যায় ৭ ফেব্রুয়ারি। সিরিজ এ ভূমিকম্পের প্রথম আঘাতেই ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ভিটেছাড়া হয় প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ। আলতানের তোলা আলোকচিত্রটি সেই ভূমিকম্পের খণ্ডচিত্র

‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো কনটেস্ট-২০২৪’-এর বিজয়ী ১২৯টি ছবি নিয়ে রাজধানীর পান্থপথের দৃক গ্যালারিতে ২৫ অক্টোবর শুরু হয়েছে তিন সপ্তাহব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ওয়ার্ল্ড প্রেস  ফটো ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৈশ্বিক এ আয়োজনে অংশ নেন ১৩০ দেশের ৩ হাজার ৮৫১ জন আলোকচিত্রী। তাদের কাছ থেকে জমা পড়ে ৬১ হাজার ৬২টি ছবি। সেখান থেকে নির্বাচিত ও বিজয়ী আলোকচিত্র নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রদর্শনী-২০২৪। বিশ্বব্যাপী সফরের অংশ হিসেবে বর্তমান প্রদর্শনীটি ৬০টির বেশি দেশে সফর করছে...

আলোকচিত্রী : এডডি জিম

ফিজির কিওয়া দ্বীপের সালিয়া বে উপকূলে গলা অবধি পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৭২ বছর বয়সি লোটোমাউ ফিয়াফিয়া ও তার নাতি জন। এ অবস্থায় তাদের ক্যামেরাবন্দি করেন অস্ট্রেলিয়ান আলোকচিত্রী এডডি জিম। জিমের তোলা এ আলোকচিত্রটি তুলে ধরেছে ফিজির মানুষের বেদনাবিধুর দীর্ঘ জীবনের গল্প। যেখানে লোটোমাউ গলাপানিতে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানেই তার শৈশব কেটেছে। উপকূলটি এখন পানির নিচে। ১৯৪০-এর দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে উত্তরের তুভালু দ্বীপ থেকে লোটোমাউর পূর্বসূরিরা এ কিওয়া দ্বীপে এসে বসতি গড়েন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে এ দ্বীপটির বাসিন্দাদের মাৎস্য অর্থনীতি ও কৃষি হুমকির মুখে। শঙ্কায় আছে ফিজির ছয়শর বেশি সম্প্রদায়ের আবাসভূমিটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার। ‘ডুবি নাই যুদ্ধ করে চলেছি’ শিরোনামে তোলা স্থিরচিত্রের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত অনুভূতির গল্প তুলে ধরেছেন এডডি জিম।

ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী মুহাম্মদ সালেমের তোলা ছবি

একটি ছবি কখনও কখনও হাজারো শব্দের প্রতিবেদনের চাইতেও শক্তিশালী। শান্ত, নিশ্চল একটি চিত্রই হয়ে ওঠে মানবমনের গহিনে জমানো অব্যক্ত বেদনার খতিয়ান। তেমনই একটি ছবি তুলেছেন ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী মুহাম্মদ সালেম। এ ফটোগ্রাফারের তোলা ছবিটি এ বছর ‘ফটো অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছে। কী আছে এ দৃশ্যগল্পে? ছবিতে দেখা যাচ্ছে ৩৬ বছর বয়সি ফিলিস্তিনি নারী আনাস আবু মামার তার ছয় বছর বয়সি ভাতিজি স্যালিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। স্যালির সঙ্গে এটিই তার শেষ আলিঙ্গন। ২০২৩ সালে ১৭ অক্টোবর একটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের বাড়িতে আঘাত হানলে পরিবারের চারজনের সঙ্গে আদরের স্যালিও নিহত হয়। ইসরায়েলি হামলার ভয়াবহতা নিয়ে ব্রিটিশ আলোকচিত্রী লিওন নিলের ‘সুপারনোভায় বিস্ফোরণ’ ও ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক মুস্তফা হাসনুনার ক্যামেরায় ধারণ করা গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক বাসিন্দার ছবিও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।

কাবুলের উপকণ্ঠের এক পুনর্বাসন ক্যাম্পে ইরানি ফটোগ্রাফার ইব্রাহিম নওরোজির তোলা ছবি

‘আফগানিস্তান : মানবিক বিপর্যয়ের খাদ’ শিরোনামের পাঁচটি ছবিগল্পে ইরানি ফটোগ্রাফার ইব্রাহিম নওরোজি যুদ্ধবিধ্বস্ত এ দেশটির গৃহহীন ও নির্বাসিত মানুষের দুর্দশার চিত্র উপস্থাপন করেছেন। কাবুলের উপকণ্ঠের এক পুনর্বাসন ক্যাম্পে মায়ের ভিক্ষা করে আনা আপেলের দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুদের ছবি দৃশ্যবন্দি করেছেন নওরোজি। ক্ষুধার্ত তিন শিশুর ছয়টি চোখ যেন অনর্গল কথা বলছে। ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্থানের চিত্রও ধারণ করেছেন আলোকচিত্রীরা। ব্রাজিলিয়ান ফটোগ্রাফার গ্যাব্রিয়ালা বিলো তুলেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার চিত্র।

আলোকচিত্রী  : ড্যানিয়েল সেটার্ড

বর্তমান বিশ্বের ভয়াবহ এক সমস্যা বনাঞ্চল ধ্বংস। ১৯৭০-এর দশকে জার্মানির রাইনল্যান্ডে হামবাখ এবং গার্ৎজভাইলার কয়লাখনি তৈরির জন্য নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল কয়েকটি গ্রাম। ২০১২ সালে এসে প্রতিবাদকারীরা হামবাখ বনের কিছু অংশ দখল করেন। ২০২৩ সালে আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে তারা পিছু হটে। রক্ষা পায় বনটির একটি অংশ এবং উচ্ছেদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি গ্রামের মধ্যে পাঁচটি। দীর্ঘমেয়োদি এ প্রকল্পে ধারাবাহিক ছবিগল্প ক্যামেরায় ধারণ করেছেন দেশটির আলোকচিত্রী ড্যানিয়েল সেটার্ড।

তুর্কি আলোকচিত্রী আদেম আলতানের ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিটির শিরোনাম ‘পিতৃ-হাহাকার’। পিতা মেসুত হাঞ্চের ভূমিকম্পের ধংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ১৫ বছর বয়সি মেয়ে ইরমাকের হাত ধরে আছেন। ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির ভোরে তুরস্ক এবং সিরিয়ার বুকে বয়ে যায় ৭.৮ মাত্রার এক ভূমিকম্প। দক্ষিণ তুরস্কের ধংসস্তূপের নিচে ইরমাক মারা যায় ৭ ফেব্রুয়ারি। সিরিজ এ ভূমিকম্পের প্রথম আঘাতেই ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ভিটেছাড়া হয় প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ। আলতানের তোলা একক আলোকচিত্রটি সেই ভূমিকম্পের খণ্ডচিত্র।

স্পেনিশ আলোকচিত্রী হাইমো রোহোর তোলা ছবি 

প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে ছবি তুলেছেন স্প্যানিশ আলোকচিত্রী হাইমো রোহো। এ আলোকচিত্রী প্রায় ২০ বছর ধরে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের জন্য মহাবিপন্ন মনার্ক প্রজাতির প্রজাপতির ছবি তোলেন। ১৯৯০ সালের পর থেকে এ প্রজাপতির প্রজননক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে ৮০ শতাংশ। আলোকচিত্রী দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে কারণ হিসেবে ছবিতে উল্লেখ করেছেন প্রজাপতির খাদ্য সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

জলবায়ু সংকট থেকে শুরু করে অভিবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সংগ্রামের চিত্র ভারতীয় আলোকচিত্রী জিশান এ লতিফ তুলে ধরেছেন তার ‘কিনারে’ শিরোনামে ছবিতে। ছবির মতো বাগ্মী খুব কম জিনিসই রয়েছে। ভেনেজুয়েলান আলোকচিত্রী আলে হান্দ্রা সেগরার তোলা ‘দুই দেয়াল’ শিরোনামের একটি ছবিতে দেখতে পাই ‘দ্য বিস্ট’ নামে মালবাহী ট্রেনের ওপর হাঁটছেন এক অভিবাসী। আশ্রয়প্রার্থীদের কাছে পাচারকারীদের দেওয়ার মতো টাকা নেই। তাই অভিবাসীরা বাধ্য হয়ে মার্কিন সীমান্তে পৌঁছাতে এ ট্রেন ব্যবহার করেন।

‘তবু আমি আছি তোমাদের সঙ্গে’- এ শিরোনামটি প্রয়াত চীনা তরুণী জিউয়ারের পরিবারের ফটো অ্যালবামের। ‍জিউয়ার ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর শেষ বছরগুলোয় জীবনের প্রতি আরও গভীর বোঝাপড়া ও কৃতজ্ঞতাবোধ অনুভব করেন। সার্জারির আগে তিন সন্তানসহ পরিবারের সঙ্গে কাটানো একান্ত সময়গুলো স্থিরচিত্রে বন্দি করতে আলোকচিত্রী ওয়াং নাইগংকে আমন্ত্রণ জানান। নাইগংয়ের তোলা ছবিগুলো হয়ে উঠেছে শিল্প। বর্তমান বিশ্বের মানুষ হয়ে পড়ছে অনেকটা স্বজনবিচ্ছিন্ন, একাকী! ফটোগ্রাফার তার ক্যামেরায় তুলে ধরেন পরিবারের প্রয়োজনীয়তা এবং ভালোবাসার মুহূর্ত। প্রথম ছবির ক্যাপশনে জিউয়ার বলেছেন, ‘জীবন খুব ছোট। ঠিক তাই করো যা তুমি করতে চাও, এবং ভালোবাসো।’ চিত্রগুলো আমাদের চিহ্নিত করে পৃথিবীর কিছু সমস্যারও দলিল হিসেবে। গ্যালারির দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো বিচিত্র বিষয় উপজীব্য করে তোলা। বলা যায়, বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি এক ছাদের নিচে উপস্থান করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা এসে ছবি দেখছেন, কেউ আলোকচিত্রগুলোর সঙ্গে নিজের ছবিও তুলছেন। কেউ কেউ আবার নিবিষ্ট মনে ছবির বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণ করছেন। ছবিগুলো গভীর মনোযোগসহকারে দেখছিলেন দর্শনার্থী নিপা গোমেজ। তার সঙ্গে কথা হলে বলেন, ‘এ ছবিগুলোয় পৃথিবীর অন্য দেশে কী ঘটেছে বা কেমন অবস্থার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে, সেগুলোর করুণ চিত্র ফটোগ্রাফাররা দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। প্রতিটি ছবিই আমাদের বিবেক নাড়া দেয়। আলোড়িত করে। মানুষের জীবনে কত সংগ্রাম এবং দুঃখ তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি এ প্রদর্শনীতে এসে।’

কথা হয় ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর এশিয়া অঞ্চলের সমন্বয়ক বাংলাদেশি নাগরিক এএসএম রেজাউর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, এ প্রতিযোগিতায় ছবি কতটুকু ভালো তার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় ছবির গল্পটি কত বেশি মানুষের মনে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তিনি আরও জানান, তিন বছর আগে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতার জন্য পৃথিবী ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়- ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা। প্রতিটি অঞ্চলে আলাদা করে প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়। এখান থেকে বিজয়ী ছবিগুলো নিয়ে গ্লোবাল প্রতিযোগিতা হয়। বিশ্বের আলোকচিত্রীদের কাছে এ পুরস্কারটি অস্কারের সমতুল্য। ১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতার এবারের আসর ছিল ৬৭তম। ঢাকা সংস্করণের দৃক গ্যালারিতে আয়োজিত প্রদর্শনীটি চলবে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা