আবেদীন জনী
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১২:২২ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১২:২৮ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
আজকাল সিংহকে প্রজারা রাজা হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। কারণ সিংহরাজা অত্যাচারী হয়ে উঠেছে। সবাই চায় নতুন রাজা। কিন্তু সিংহ রাজাসন ছাড়তে রাজি নয়। এ নিয়ে সারা বনে শুরু হলো ভীষণ গন্ডগোল। মিছিলÑগদি ছাড়ো সিংহরাজা/নইলে পাবে অনেক সাজা।’
মিছিলে মিছিলে কেঁপে উঠল বন। সিংহরাজা ভয় পেল। কখন কারা আক্রমণ করে বসে! কোনো উপায় না পেয়ে সভা ডাকল রাজা। কে হবে নতুন রাজা, তা এ মিটিংয়ে ঘোষণা করা হবে।
সিংহরাজার ডাকে বুনো নেতাকর্মীরা জড়ো হলো। শুরু হলো মিটিং। আচমকা সিংহরাজা গর্জন করে বলল, সবাই জানে, বনের রাজা সিংহ। যুগের পর যুগ নড়চড় হয়নি। আজও হবে না। এটাই নিয়ম। বলো, কার কী সমস্যা? সমাধান করে দেব।
দাঁতাল বাঘনেতা গোঁফ নাচিয়ে কর্কশ স্বরে বলল, চুপ করো সিংহরাজা। বেশি কথা বললে ঘাড় মটকে দেব। নতুন রাজা নির্বাচনের জন্যই মিটিং ডেকেছো। ঘাড়ত্যাড়ামি চলবে না। নতুন রাজা বানাতেই হবে। বাঘজাতির পক্ষ থেকে আমিই হতে চাই এ বুনো রাজ্যের রাজা।
ভালুক হি হি হেসে বাঘকে বিদ্রূপ করে বলল, তুমি যত বড় নেতাই হও, তোমার মতো রাগী কেউ রাজা হওয়ার যোগ্য নয়। এখনই যে রকম অহংকার আর ভাবসাব, রাজা হলে তো সবাইকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। উপস্থিত সবাইকে বলছি, এবার রাজা হব আমি। ভালুকজাতি রাজা না হলে বনে শান্তি আসবে না।
পাশেই ছিল হাতি। সিংহ, বাঘ ও ভালুকের মাথায় শুঁড় দিয়ে জল ছিটিয়ে বলল, তোমরা থামো। উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই। মাথা ঠান্ডা করে আমার কথা শোনো। রাজা হবে সেজন, যে সবচেয়ে বড় আর নাদুসনুদুস। সে হিসেবে একমাত্র হাতিই বনের রাজা হওয়ার যোগ্য। আর কেউ নয়।
হাতির কথা শুনে শিয়ালনেতা চুপ থাকতে পারল
না। হুক্কাহুয়া ভাষায় বলল, মানুষ কথায় কথায় বলে, গোঁফ থাকলেই দারোগা হওয়া যায় না, তেমনই পাহাড়ের মতো শরীর থাকলেই রাজা হওয়া যায় না, বুদ্ধি থাকতে হয়। শিয়ালের পেটে সাত ছালা বুদ্ধি। শিয়াল মানেই চালাকের বিচি। সুতরাং বনের রাজা হব আমিÑশিয়ালনেতা মিস্টার টিয়াল।
শান্তিপ্রিয় হরিণ ছাড়া একে একে বুনোরাজ্যের নেতারা রাজা হওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিল। সব শেষে বক্তব্য দিল পিঁপড়ে নেতা কুট্টুস। বলল, এ বনে পিঁপড়েরাই সংখ্যায় বেশি। অতএব পিঁপড়েদের মধ্য থেকেই হবে নতুন রাজা। ভোট হলে বিপুল ভোটে রাজা হব আমি।
কুট্টুসের কথায় কেউ কেউ চোখ কপালে তুলল, কেউবা হাসল তাচ্ছিল্যের হাসি। সিংহ, বাঘ ও ভালুক রেগে আগুন হয়ে বলল, একটা ফুঁ দিলেই তোরা সব উড়ে যাবি, আবার রাজা হতে চাস! হাতি বলল, এক পায়ের এক ডলাতেই শেষ করে ফেলব তোদের কয়েক কোটি। পিঁপড়ে হয়ে বনের রাজা হতে চায়, শখ কত!
পিঁপড়ে নেতা চুপ করে সব শুনছিল আর ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে পেয়ে গেল একটা বুদ্ধি। তার পিঁপড়ে বাহিনীকে গোপনে নির্দেশ দিলÑসিংহ, বাঘ, ভালুক, হাতি ও শিয়ালের কানে ঢুকে যাও তাড়াতাড়ি। প্রতিটি কানে ১০টি করে পিঁপড়ে। যে পর্যন্ত ওরা আমাকে রাজা হওয়ার সম্মতি না দেবে, সে পর্যন্ত কানের ভেতর সুড়সুড়ি দেবে আর দৌড়াতে থাকবে। কামড় দেবে না কিন্তু।
পিঁপড়েরা তাই করতে লাগল। তারপর পিঁপড়ে নেতা কুট্টুস সবাইকে বলল, তোমরা কি আমাকে রাজা বানাতে রাজি?
সুড়সুড়ি খেয়ে সিংহ মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চেঁচিয়ে বলল, রাজি, আমি রাজি। তোমার পিঁপড়ে বাহিনীকে থামাও, বাবা।
লেজ খাড়া করে লাফাতে লাফাতে বাঘ বলল, বাব্বারে বাবা, আমি রাজি।
ডিগবাজি খেতে খেতে ভালুক দিল বিড়ালদৌড়। এক দৌড়ে হাওয়া।
হাতি ফটাফট কান নাড়াতে নাড়াতে বলল, থামাও তোমার দুষ্টুর দল। আমি রাজা হতে চাই না। খালি কলাগাছ চাই। কলাগাছ চাই।
শিয়াল কান চুলকাতে চুলকাতে বলল, গেল রে গেল, আমার কান গেল। ওরে বাবা কুট্টুস, থামাও তোমাদের সুড়সুড়ি থেরাপি। তুমিই রাজা হওয়ার যোগ্য। তোমার বুদ্ধির সামনে আমার সাত ছালা বুদ্ধি কিছুই না!
পিঁপড়েদের কাছে হেরে গেল বড় বড় সব জীবজন্তু। অবশেষে রাজা হয়ে গেল লাল পিঁপড়ে কুট্টুস।