মো. আল-আমিন
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৬:১০ এএম
মালদ্বীপের হুয়েল সাবমেরিনে লেখক ছবি: লেখকের সৌজন্যে
অনেক আগে আকাশে উড়লেও সাগরের নিচে গিয়ে সাগরতলের জগৎ দেখা ছিল আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। গত ১৮ মে মালদ্বীপ ভ্রমণের সময় সাবমেরিনে চড়ে সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পেলাম।
সাগরকে ওপর থেকে নয়, বরং শতফুট গভীর থেকে উপভোগ করার এই স্বপ্নযাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে এখানে। বিশ্বে যে কয়েকটি প্যাসেঞ্জার সাবমেরিন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বৃহৎতম মালদ্বীপের এই হুয়েল সাবমেরিনটি। ষোলো বছরের বেশি আগে জার্মানের তৈরি এই সাবমেরিনটি ইতোমধ্যে আট হাজারের বেশিবার সাগরের নিচে গিয়ে তিন লক্ষাধিক ভ্রামণিককে সাগরতলের মায়াবী নীলজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
ভারত মহাসাগরের কোলঘেঁষে মালদ্বীপের মৎস্যরাজ্যে সাবমেরিনে ভ্রমণের জন্য প্রথম ধাপ অনলাইনে (https://www.whalesubmarine.com.mv) সিট বুকিং দেওয়া। মোট গুনতে হলো ৬৫ ইউএস ডলার। নির্ধারিত দিনে নিজ ব্যবস্থাপনায় মালের এক নম্বর জেটিঘাটে গেলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বোটে করে আমাদের ১০ মিনিটের দূরত্বে স্থাপিত সাবমেরিনের ভাসমান জেটিতে নিয়ে যাওয়া হলো। হালকা আপ্যায়ন শেষে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে আমরা এক এক করে প্রায় ৭৩ ফুট লম্বা সাবমেরিনে প্রবেশ করলাম। আমাদের দলে ছিল মালদ্বীপ, রাশিয়া, নেপাল, লেবানন ও ভারতের ২২ জন পরিব্রাজক। জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তার ব্যবহারিক প্রদর্শনী শেষে সবাই বসে অপেক্ষা করছেন কখন সাবমেরিনটি গভীর জলে ডুব দেয়।
নির্ধারিত সময় সকাল ১০টায় ১-৭-২০ করতে করতে ১৪০ ফুট গভীরে সাবমেরিনটি নেমে আসে। এবার অবাক হয়ে দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে নানা ধরনের মাছ, কচ্ছপ, হাঙর, গলদা চিংড়ি আমাদের ঘিরে ফেলেছে। মাছদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- বক্স, প্রজাপতি, টুনা, গ্রুপার, রেইনবো রানার, ট্রেভালি, রূপচাঁদা, ব্লুস্ট্রাইপ স্ন্যাপার। স্বচ্ছ কাচ মাছদের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান তৈরি করলেও মনে হচ্ছে আমরাও যেন সাঁতার কাটছি মাছদের সঙ্গে।
নীল জলরাশিতে মাছদের সংসার ছিল দেখার মতো। এগুলো মোটেও আক্রমণাত্মক ছিল না। কিছু মাছ সদলবলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিছু মাছ বিচ্ছিন্নভাবে। আমরা দেখলাম কিছু মাছ প্রবালের ছোট ছোট গুহায় নিশ্চল হয়ে রয়েছে। প্রথমে ভাবলাম- মাছগুলো বুঝি মরে গেছে। একটু পরেই গা-ঝাড়া দিল। না, মরেনি তাহলে! দেখলাম সাগরতলের নানা বর্ণিল উদ্ভিদ, শৈবাল, প্রবালের প্রাচীর ও গুহা। এবড়ো-থেবড়ো এই প্রবাল প্রাচীরকে অসংখ্য মাছ ঘিরে রেখেছে। মাছ দেখতে দেখতে হঠাৎ প্রবালের ওপর একটি প্লাস্টিকের বোতল চোখে পড়ল।
অপচনশীল এই বস্তু সাগরের তলদেশে আমাদের অব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতিবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের স্মারক হিসেবে রয়ে গেছে! নানা প্রজাতির মনোহারি এসব মাছের অবাধ বিচরণ দেখতে দেখতে কখন যে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল টের পেলাম না। এবার ফেরার পালা। ১২০-৫০-১০ করতে করতে একেবারে চলে এলাম সাগরের ওপরে। তৃপ্তির রেশ সবার চোখেমুখে। আজীবন মনে থাকার মতো এই অভিজ্ঞতা জীবনবোধকে নাড়া দিল। ইচ্ছে করলÑ বিশ্বভরা প্রাণের এই জগতে আমি অনেক দিন বেঁচে থাকতে চাই।