নাকিব নিজাম
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:৫২ এএম
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:২১ এএম
পানাম নগরের পুরাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যবাহী দালান
ঢাকার খুব কাছেই ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহরের নাম পানাম নগর।
পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের এটি একটি। এটি অনেকের কাছে ‘হারানো নগরী’ নামেও পরিচিত। সোনারগাঁয়ে ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে নগরটি। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর- প্রাচীন সোনারগাঁয়ের এই তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। পানাম নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের ইতিহাস। বর্তমানে পানাম নগরের দুধারে ঔপনিবেশিক আমলের মোট ৫২টি স্থাপনা রয়েছে, এর উত্তর দিকে ৩১টি ও দক্ষিণ দিকে ২১টি অবস্থিত। স্থাপনাগুলোর স্থাপত্যে ইউরোপীয় শিল্পরীতির সঙ্গে মুঘল শিল্পরীতির মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়।
নগরীতে এখনও দেখা যায় ৪০০ বছরের পুরোনো মঠবাড়ি। এর পশ্চিমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি ‘নীলকুঠি’ রয়েছে। আছে পোদ্দারবাড়ি, কাশিনাথের বাড়ি, সোনারগাঁয়ের একমাত্র আর্ট গ্যালারিসহ নানা প্রাচীন ভবন। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খিরাজ খাল। পানাম নগরীর নকশা নির্মাণ করা হয়েছে বেশ নিখুঁত আকারে। নগরীর প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে কূপসহ আবাস উপযোগী নিদর্শন। পানি সরবরাহের জন্য দুপাশে খাল ও পুকুর আছে। এখানে থাকার বাসস্থান ছাড়াও আছে উপাসনালয়, গোসলখানা, পান্থশালা, দরবার কক্ষ। এ ছাড়াও আছে ৪০০ বছরের পুরোনো টাঁকশালবাড়ি। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে পশ্চিম দিকে আছে গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ।

মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা দিয়ে একটু দক্ষিণ দিকে গেলে দেখা যায় আরও কিছু ইমারত, বারো আউলিয়ার মাজার, হযরত শাহ ইব্রাহিম দানিশ মন্দা ও তার বংশধরদের মাজার, দমদম গ্রামে অবস্থিত দমদমদুর্গ ইত্যাদি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীল চাষের নির্মম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী পানামের নীলকুঠি। পানাম পুলের কাছে দুলালপুর সড়কের পাশেই এর অবস্থান। এ ছাড়া আমিনপুর ও দুলালপুর গ্রামের সংযোগ রক্ষাকারী পানাম পুলটি পঙ্খিরাজ খালের ওপর ১৭ শতকে নির্মিত হয়। তিনটি খিলানের ওপর পুলটি স্থাপিত। তা ছাড়া নগরীর আশপাশে ছড়িয়ে আছে ঈসা খাঁ ও তার ছেলে মুসা খাঁর প্রমোদ ভবন, ফতেহ শাহের মসজিদ, সোনাকান্দা দুর্গ, পঞ্চপীরের মাজার, কদম রসুল, চিলেকোঠাসহ বহু পুরাতাত্ত্বিক গুরুত্ববহ স্থাপনা।
টিকিট
দেশি পর্যটকদের জন্য টিকিটের দাম ২০ আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য ১০০ টাকা। অন্যান্য দেশের জন্য টিকিটের দাম ৩০০ টাকা। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। সোমবার বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে পানাম সিটি।
যাতায়াত
ঢাকার গুলিস্তান থেকে বোরাক, দোয়েল ইত্যাদি বাসে করে সোনারগাঁয়ে নেমে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পানাম নগর যাওয়া যায়।
লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর
লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর আর বড় সরদারবাড়ি একই কমপ্লেক্সে অবস্থিত। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে আছে গ্রামবাংলার লোক ও কারুশিল্পের প্রাচীন নিদর্শন। দেখা যাবে বাংলার প্রাচীন সুলতানদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, তৈজসপত্র, পোশাক, বর্ম, অলংকার, প্রাচীন মুদ্রা, জামদানি, নকশিকাঁথা ইত্যাদি।
জাদুঘরে যাওয়ার আগে হাতের বাঁদিকে যে ভবন, সেটিই বড় সরদারবাড়ি। অনেকের কাছে দোতলা এ ভবন গোপীনাথ সাহা সরদারবাড়ি নামেও পরিচিত। বাড়িটির সামনে ও পেছনে আছে চমৎকার দুটি দীঘি। এর পাশেই চোখে পড়বে তলোয়ার হাতে ঘোড়ার পিঠে দুই সৈনিকের মূর্তি। সরদারবাড়ির নিচতলায় রয়েছে ৪৭ ও দোতলায় ৩৭টি কক্ষ। এগুলো এখন জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাদুঘর কমপ্লেক্সে আছে হ্রদ, বাগান, কারুপল্লী ও একটি লাইব্রেরি।
টিকিট ও অন্যান্য
লোকশিল্প জাদুঘর এবং আশপাশে ভ্রমণের জন্য টিকিট ৫০ টাকা। তবে বড় সরদারবাড়িসহ জাদুঘর দেখার টিকিটের দাম ১০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের টিকিট ৩০ টাকা। দুই জায়গার দুই টিকিট। ফলে কোনো টিকিট ফেলবেন না। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘর। বৃহস্পতিবার বন্ধ। এখানকার কারুপল্লী থেকে জামদানি শাড়ি ও অন্যান্য স্মারক কেনা যায়।