বানে ভাসা জীবন
আজহার উদ্দিন রিজভী
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:২৭ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১৩:০৬ পিএম
ছবি : আরিফুল আমিন
২৩ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে বোনের বাসায় ছিলাম। খবর পেলাম, ফেনী বন্যায় ডুবে গেছে। তখনও আমাদের মিরসরাইয়ের সাহেবদিনগর গ্রামে পানি ওঠেনি। বন্যার পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে যেকোনো সময় গ্রামে পানি ঢুকতে পারে। ২৪ আগস্ট সকালে আমি বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিই। দুপুর ১টায় মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এসে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল। জোরারগঞ্জ থেকে ৬ নম্বর ইাছাখালী সাহেবদিনগর প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ। এ পথ কীভাবে যাব? দুয়েকটি গাড়ি আছে।তারাও যেতে চাচ্ছে না।
অবশেষে অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে বাড়িতে পৌঁছাই। বাড়ি এসে দেখি একহাঁটু পানি। রাতে ৯টার দিকে পানি আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। পরিবারের সবাই মিলে তাড়াহুড়া করে রাত প্রায় ১২টার দিকে পাশের একটি উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিই। দুয়েকটি ছাড়া বাড়ি সব ডুবে গেছে। সেখানে মানুষজন গাদাগাদি করে আশ্রয় নিয়েছে। আমরাও সবার সঙ্গে অনেক কষ্টে রাতটি পার করলাম। পরদিন ২৬ আগস্ট পানি বাড়ছে দেখে একটি নৌকা জোগাড় করলাম। মা, বোন, চাচিকে নৌকায় তুলে আমরা একবুক পানির মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে যাই। এক ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে মহাসড়কে পৌঁছাই। সেখানে কোনো গাড়ি নেই। হঠাৎ একটি ট্রাক আসে। তাদের অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে জোরারগঞ্জ এসে নামলাম। সেখান থেকে মা, বোন, চাচিকে চট্টগ্রামের গাড়িতে তুলে দিই। আমি চাচার সঙ্গে বাড়ি গেলাম। দেখি সব হাঁস-মুরগি, কবুতর, গরু-ছাগল পানির মধ্যে। কিছু মারাও গেছে। পুরো বাড়ি পানিতে ভাসছে। শুরু হলো ভয় আর আতঙ্কের রাত। রাত সাড়ে ১২টার দিকে একদল লোক এসে বাড়িঘরের জিনিসপত্র, গরু-ছাগল লুট করতে থাকে। কিছু বলার ছিল না আমাদের। ভয়ংকর সেই রাত পার হলো। পানি নেমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখে আমরা বাড়িঘরের আশা ছেড়ে দিই। আশপাশে নৌকাও নেই। একবুক পানির মধ্যে কাপড়ের ব্যাগ মাথায় নিয়ে হাঁটা শুরু করি। কিছু দূর যাওয়ার পর গলা ছুঁইছুঁই পানি। পেছানোর উপায় নেই। সাঁতরে সামনে এগোতে থাকলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা সাঁতার কেটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বামুনসুন্দর দারোগারহাটে পৌঁছাই। তত সময়ে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। আশার আলো নিয়ে একটি ট্রাক এলো। সেই ট্রাকে উঠে মিঠাছরা বাজার পর্যন্ত যাই। তারপর একটি বাসে চড়ে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাই।

লেখক : শিক্ষার্থী, মহাজনহাট ফজলুর রহমান স্কুল অ্যন্ড কলেজ, চট্টগ্রাম