গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৪ ১৪:৪৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রক্ত মানবদেহের এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি। ফলে জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্তের জন্য দাতার প্রয়োজন হয়। প্রতি বছর বিশ্বে এমনকি আমাদের দেশেও পর্যাপ্ত রক্তের অভাবে অনেক মুমূর্ষু রোগী প্রাণ হারান। তাই রক্তদানকে মহৎ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৪ জুন পালিত হলো বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। এ উপলক্ষে যাদুকাটার বিশেষ আয়োজন
প্রথমবার বন্ধুদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় রক্তদানের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রাহিল। কিন্তু বয়স না হওয়ায় সেবার তার রক্ত দেওয়া হয়নি। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানীর সদস্যরা তাকে বয়স ১৮ বছর হওয়ার পর রক্তদানের পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন রাহিল। এখন পর্যন্ত তিনি ৩৯ বার রক্ত দিয়েছেন। রাহিল বলেন, ‘মানুষের উপকার করতে পারার চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই। এই ভাবনা থেকেই রক্তদানের চিন্তা মাথায় আসে।’
দেশে রাহিলের মতো স্বেচ্ছায় রক্তদাতা আরও অনেকে আছেন। মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পেশাদারদের চেয়ে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংখ্যা এখন বেশি। রক্তদাতা সংগঠন ব্লাডম্যানের প্রতিষ্ঠাতা শাহারিয়ার হাসান জিসান বলেন, দেশে রক্তের যে চাহিদা, তা পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের যে সংখ্যা, তা চাহিদার তুলনায় কম। ফলে রক্তের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তাই স্বেচ্ছায় রক্তদানে আরও বেশি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল ১৪ জুন পালন হলো বিশ্ব রক্তদান দিবস। ১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক রক্তদান দিবস পালন এবং ২০০০ সালে ‘নিরাপদ রক্ত’-এই থিমের ওপর ভিত্তি করে ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে প্রথম পালিত হয় আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস। ২০০৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। এ বছর এ দিবসের ২০ বছর পূর্তি হলো।
ব্লাডম্যান সংগঠনের জিসান বলেন, নিয়মিত রক্তদান করা একটি ভালো অভ্যাস। রক্তদান করা কোনো দুঃসাহসিক বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কাজ নয়। বরং এর জন্য একটি সুন্দর মন থাকাই যথেষ্ট। রক্তদাতার শরীরের কোনো ক্ষতি তো হয়ই না, বরং নিয়মিত রক্তদান করলে বেশ কিছু উপকারও পাওয়া যায়। বরং প্রতিবার রক্তদানের পর রক্তদাতার অস্থিমজ্জা নতুন রক্তকণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয়। ফলে রক্তদানের দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে সে ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। গত ১০ বছরে ব্লাডম্যান সংগঠনটি রক্তদাতা ম্যাচমেকিং করিয়েছে ৭ লাখ ৪৩ হাজার এবং তাদের কাছ থেকে টেলিমেডিসিন সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৮৬ হাজার। বেসরকারি রক্তদাতা সংগঠন কোয়ান্টামের সূত্রানুসারে ২০০০ সালে দেশে প্রয়োজনীয় রক্তের ৪৭ শতাংশই আসত পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে। ২০১১ সালে তা কমে আসে ২০-২৫ শতাংশে। আর ২০১৭ সালে তা এসে দাঁড়ায় শতকরা ১২ ভাগে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই যুগের যাত্রায় কোয়ান্টাম গড়েছে পাঁচ লক্ষাধিক স্বেচ্ছা রক্তদাতার সুসংগঠিত ডোনার পুল (মে ২০২৪ পর্যন্ত)। যাদের অর্ধ লক্ষাধিকই নিয়মিত রক্তদাতা, অঙ্গীকার করেছেন আজীবন রক্তদানে। জীবন বাঁচানোর জন্য এ পর্যন্ত কোয়ান্টাম দিয়েছে ১৬ লক্ষাধিক ইউনিট রক্ত ও রক্ত উপাদান (মে ২০২৪ পর্যন্ত)। আর বছরে দিচ্ছে ১ লাখেরও বেশি ইউনিট। বছরে দেশে রক্তের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ ব্যাগ। কিন্তু নিরাপদ রক্তের জোগান প্রয়োজনীয় রক্তের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। তরুণ প্রজন্মের স্বেচ্ছায় রক্তদানই হতে পারে এই সংকটের সমাধান। কোনো অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১ থেকে ৩ শতাংশ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করলে নিরাপদ রক্তের প্রয়োজনীয়তা সহজেই পূরণ করা যায়। রক্তদাতা সংগঠন পজিটিভ ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান পরিস্থিতির আরও উন্নতি ঘটাতে হবে। নয়তো শিগগিরই রক্তের চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হবে না। জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে।’
রক্ত ছাড়া কোনো মানুষের জীবন কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু মানবদেহের এই অত্যাবশ্যকীয় উপাদানটির কোনো বিকল্প তৈরি করা সম্ভব হয়নি। মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে প্রায়ই জরুরিভিত্তিতে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া রোগী যারা রক্তের ওপর নির্ভরশীল অর্থাৎ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, ঠিক এদের বেঁচে থাকার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন প্রতি মাসে এক বা একাধিক রক্তের ব্যাগ। থ্যালাসেমিয়া একটি মারাত্মক বংশগত রক্তের রোগ, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের শরীরে হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন পর্যাপ্ত হয় না বলেই রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে যায়। ফলে এদের দেহে মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীরা প্রতি মাসে এক-দুই ব্যাগ রক্ত গ্রহণ করে জীবনধারণ করে। আর এ কারণেই তাদের বেঁচে থাকাটাই পুরোপুরি নির্ভর করে হৃদয়বান রক্তদাতাদের ওপর। শুধু থ্যালাসেমিয়া রোগী নয়, কারও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনায় আহত, সন্তান প্রসব, অ্যানিমিয়া, হিমোফিলিয়া, অস্ত্রোপচার, রক্তবমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলেও রোগীর শরীরে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে।
আমাদের তরুণদের একটা বড় অংশ স্বেচ্ছা রক্তদানে আগ্রহী। কিন্তু তার পরও দেশের রক্তচাহিদা পূরণ না হওয়ার মূল কারণ রক্তদানে নিয়মিত হওয়ার অনীহা। মানবদেহে প্রতি চার মাসে রক্তকণিকাগুলো নতুন করে উৎপাদিত হয়। পুরোনো কণিকাগুলোর জীবনাবসান হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রক্তদানের ফলে দাতার শরীরের অস্থিমজ্জায় রক্তকণিকাগুলোর উৎপাদন বাড়ে। এর প্রভাবও ব্যাপক। ত্বকের লালিত্য, বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানো থেকে শুরু করে বহুবিধ উপকারিতা সত্ত্বেও নিয়মিত রক্তদানে আগ্রহী স্বেচ্ছাদাতার সংখ্যা আমাদের দেশে তুলনামূলক কম।