গল্প
রূবাইয়া হাসনাইন
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৪ ১২:৫৭ পিএম
অলংকরণ : মিথিলা ভৌমিক অষ্টম শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে বৃহস্পতি। ভাবছে, পৃথিবী আমার চেয়ে কয়েক গুণ ছোট। অথচ কত সুন্দর। কত নদীনালা, সমুদ্র-পাহাড় এবং ফুলে ফলে সাজানো। পশুপাখি, কীটপতঙ্গসহ কত যে প্রাণীর কোলাহল। এদের মধ্যে মানুষ নামে একজাতীয় প্রাণী আছে, যে কি না সবকিছু নিজের দখলে নিতে পারে। তারপর ইচ্ছামতো ব্যবহার করে। এসব ভাবতে গেলেই মনটা ভরে যায়। আর এই আমি! এখনও পুরোনোই রয়ে গেছি। নদীনালা, গাছপালা, পশুপাখি আর মানুষকে আশ্রয় দিতে পারিনি।
তাহলে পৃথিবীর এত সৌন্দর্য এলো কোথা থেকে? এর রহস্য কোথায়?
একদিন শুক্র, শনি, বুধ আর নেপচুনকে বনভোজনের দাওয়াত দিয়ে বসল। সময়মতো সবাই এসে হাজির। সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ‘প্রিয় বন্ধুগণ, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, পৃথিবী ইতোমধ্যে নানা গুণে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। সে আমাদের টপকে গেছে। দিনদিন তার সম্মান বেড়েই চলেছে। কিন্তু আমরা সেই মর্যাদা অর্জন করতে পারিনি। আপনাদের কাছে আমি জানতে চাইÑপৃথিবীর এত সৌন্দর্যের রহস্য কী?’
কেউই কোনো উত্তর দিতে পারল না। উল্টো বৃহস্পতির কাছে জানতে চাইল, ওই একই প্রশ্নের উত্তর আমরাও খুঁজছি। আপনি আমাদের চেয়ে বড়। ভাবছি, এ উত্তর আপনার কাছেই আছে। তাই জানা থাকলে আপনিই বলুন, ‘পৃথিবীর এত সৌন্দর্যের কারণ কী?’
বৃহস্পতি এবার কিছুটা বিপদে পড়ে গেল। মুখে কোনো কথা নেই। কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমার পেট ব্যথা করছে। পেটে অনেক গ্যাস। ডান পাশে ঝড়ের মতো কী যেন শুম শুম করছে। পারলে আমার জন্য একটা গ্যাসের ট্যাবলেট নিয়ে এসো।’ এই বলে সভা শেষ করে উঠে পড়ল বৃহস্পতি।
অন্যরা কিছুটা অবাক হলো। কিন্তু কী আর করা? বৃহস্পতির দাওয়াতে এসেছে, সে-ই যদি চলে যায়, তবে বসে থেকে আর কী হবে? যে-যার মতো তাই চলে গেল। যেতে যেতে ভাবল, ‘আমরা নিজেরাই এক এক সমস্যায় আছি। সেই কবে থেকেই তো এসব দূর করতে চাইছি, হচ্ছে না।
আরও একটা কথা সবার মনে মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। বৃহস্পতি, পৃথিবীর ব্যাপারে এতটা কৌতূহলী কেন? কেনই বা এত কিছু জানতে চাইছে সে?
আড়াল থেকে সব কথা শুনে ফেলে মঙ্গল এবং পরদিন পৃথিবীকে একটা চিঠি লেখে।
প্রিয় পৃথিবী,
তুমি আমার অনেক কাছের। তোমাকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। তোমার সৌন্দর্যের কথা এখন সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে। ব্রহ্মাণ্ডের অনেক জায়গায়ই তোমার গুণের কথা পৌঁছে গেছে। কিন্তু কেউ জানে না এমন রহস্যের কারণ কী। তোমার আপত্তি না থাকলে আমাকে জানাতে পারো। আমি তোমার হয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই।
ইতি
মঙ্গল
মঙ্গলের চিঠি পেয়ে পৃথিবী খুব একটা খুশি হলো না। যদিও মঙ্গলের প্রতি তার সহানুভূতি আর ভালোবাসার অভাব নেই। বরং অবাক হয়ে ভাবনায় পড়ে গেল। কারণ সে বুঝে গেছে, সৌন্দর্যই তার সম্পদ। এ সম্পদের ওপর হয়তো অন্যদের চোখ পড়েছে। তাই নিজের খেয়ালখুশি আর ইচ্ছা-অনিচ্ছার যত্ন নেওয়া দরকার। না হলে এ সম্পদের আশায় কেউ আমাকে মেরে ফেলতেও পারে। তাই সে স্থির করল, মঙ্গলকে সে কিছুই জানাবে না। চিঠিরও কোনো উত্তর না দিল না। চুপচাপ রইল।
বহু বছর পর। পৃথিবী নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ল। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল। ভেতর থেকে সবকিছু নষ্ট হতে শুরু করল। নানা চেষ্টা করেও কিছু করা যাচ্ছিল না। পৃথিবী বুঝতে পারল, এভাবে চলতে থাকলে বেশিদিন আর বেঁচে থাকা যাবে না। তাই দ্রুতই এর একটা বিহিত করা প্রয়োজন। কিন্তু কাকে কী বলবে? বুঝে উঠতে পারছিল না।
হঠাৎ তার মনে পড়ল প্রতিবেশী মঙ্গলের কথা। আর ভাবল, তার চিঠির উত্তর দিলে আজ তাকে পাশে পাওয়া যেত। কিংবা এমনও হতে পারত যে, সবাই আমাকে ধারণ করলে আজকের এ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
পৃথিবী বুঝতে পারল, সৌন্দর্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়াই ভালো ছিল। এত দিনে তার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। তাই সে মঙ্গলের কাছে চিঠি লিখতে বসল।...