× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভাড়ারদহ বিল

‘উত্তুরে ল্যাঞ্জা হাঁস’ অপার্থিব এক প্রাপ্তি

একেএম ফজলুল হক

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ১১:৩৭ এএম

ভাড়ারদহ বিলে উত্তুরে ল্যাঞ্জা হাঁসের কলকাকলি। ছবি: একেএম ফজলুল হক

ভাড়ারদহ বিলে উত্তুরে ল্যাঞ্জা হাঁসের কলকাকলি। ছবি: একেএম ফজলুল হক

একসময় যেখানে কেবল ধান, গম, সরিষা কিংবা আলুর চাষ হতো; আজ সেই ভাড়ারদহ বিল পরিণত হয়েছে প্রাণ ও প্রকৃতির এক মোহনীয় মিলনস্থলে! কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ‘ইআইআর’ প্রকল্পের মাধ্যমে বদরগঞ্জ উপজেলার ভাড়ারদহ বিলটি দখলমুক্ত ও খনন করার পর বদলে যায় এর রূপ। খননকৃত বিলের প্রশস্ত পাড়ে রোপণ করা হয়েছে শতাধিক দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ, যা এখন সবুজের সমারোহে বিলটিকে দান করেছে এক অনন্য রূপ। বিলের স্বচ্ছ নীল জল আর আকাশের নীলিমা যেন মিতালিতে মেতেছে। এই নিস্তব্ধতা ভেঙে জলকেলিতে মেতে থাকে পানকৌড়ি, মাছরাঙা আর পাতি সরালির ঝাঁক। তাদের কিচিরমিচির আর খুনসুঁটি দর্শনার্থীদের মন ভরিয়ে দেয়। প্রকৃতি এখানে সেজেছে তার নিজস্ব রঙে। ২০২০ সালেও যে বিলে শুধু ধান-গম-সরিষা-আলুর চাষ হতো, সেখানে এখন প্রাণ ও প্রকৃতির সম্মিলনে তৈরি হয়েছে আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা বিলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের খাবার (শেওলা, ছোট মাছ, শামুক ইত্যাদি) থাকে না। কিন্তু ভাড়ারদহ বিলে প্রাকৃতিকভাবে খাবারের সংস্থান এবং পাড়ে ফুল ও ফলের গাছ থাকায় এটি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। পাখির এই আবাসস্থল রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। বিলটিকে রাখা হয়েছে ইজারা বহির্ভূত, যার ফলে বছরের প্রায় আট মাস পাখিরা এখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করে। কেবল প্রজননকালীন চার মাস তারা বনে-জঙ্গলে থাকে আর শীতের শুরুতে আগমন ঘটে পরিযায়ী পাখির। বিলটিতে গিরিয়া হাঁস, দলপিপি, জলময়ূর, ডাহুক, সরালি, পাতি সরালি, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, শালিক, ঘুঘু, কোকিল, হাঁড়িচাচা, দোয়েল, ফিঙে, শ্বেতাক্ষি, বউ কথা কও, বেনে বউ, পাপিয়া, কাবাসি, বুলবুলি, হুদহুদ, সোহেলি, চাচপাখি, লরীয়তী, বন ভরত, খঞ্জনা, চাতক, টুনটুনিসহ নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা দেখা যায়।

পরিযায়ী পাখিদের জগতে ‘উত্তুরে ল্যাঞ্জা হাঁস’ (Northern Pintail) এক বিস্ময়ের নাম। এদের রাজকীয় অবয়ব ও সরু-লম্বা লেজের নান্দনিকতাÑ এদের পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে ‘অ্যারিস্টোক্র্যাট’ বা অভিজাত পাখির অভিধায় সিক্ত করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত এই পাখিটি সাধারণত শীতকালে হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, বাইক্কা বিল বা নিঝুম দ্বীপের মতো বড় জলাশয়ে দেখা যায়।

এই পাখিটিকে ঘিরে আমার এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প আছে। ২০২৪ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে গিয়েও মনের মতো ছবি মেলেনি। এ বছর পাখিটি তিস্তা নদীতে এসেছিল; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ ও খাইরুল ইসলাম চমৎকার ছবি তুলেছেন। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন আমি তাদের সঙ্গী হতে পারিনি। দুদিন পর খাইরুল ইসলামকে নিয়ে তিস্তায় হন্যে হয়ে খুঁজলেও পাখিটির দেখা মেলেনি। বারবার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় পাখিটির প্রতি আমার আগ্রহ আর আবেগ চরমে পৌঁছায়।

অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে আমারই খনন করা ভাড়ারদহ বিলে। বিলটিতে যখন ল্যাঞ্জা হাঁসটিকে দেখলাম, প্রথমটায় নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! প্রবল উত্তেজনা আর আবেগ সামলে নিয়ে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলাম। লেন্সের ফ্রেমে যখন সেই রাজকীয় হাঁসটি ধরা দিল, তখন যে আনন্দ আর তৃপ্তি অনুভব করেছিÑ তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। 

পুরুষ হাঁসের লেজের মাঝখানের দুটি পালক সুচালো ও লম্বা, যার কারণেই এদের নাম হয়েছে ‘ল্যাঞ্জা’। এদের পরিযান বা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া সত্যিই বিস্ময়কর। এরা পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া পাখি। এদের ওড়ার ক্ষিপ্র গতি ও অনেক উচ্চতা দিয়ে ওড়ার ক্ষমতার কারণে এদের বলা হয় আকাশের ‘জেট প্লেন’। এমনকি হিমালয়ের মতো সুউচ্চ পর্বতমালা পাড়ি দেওয়ার রেকর্ডও রয়েছে এদের। শীতকালে সাইবেরিয়ার জলাভূমি বরফে ঢেকে যায়, তাই খাবারের সন্ধানে এরা চলে আসে আমাদের দেশে। তখন দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিলে দেখা মেলে।

ভাড়ারদহ বিলের মতো ছোট জলাশয়ে পাখিটিকে পাওয়া এক অবিশ্বাস্য প্রাপ্তি; যদি সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে, তবে ভবিষ্যতে এখানে হয়তো নীলশির, খুন্তি হাঁস বা নাগতা হাঁসের মতো আরও দুর্লভ পাখির দেখা মিলবে।


লেখক : প্রকৌশলী ও আলোকচিত্রী

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা