ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১০:০৭ এএম
আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১০:০৭ এএম
বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এর রপ্তানি ও উৎপাদন দুটোই কমেছে। ফাইল ছবি
পাট ছিল একসময় অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির মূল শক্তি। কেননা এটি রপ্তানির ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেত। পাট তাই হয়ে উঠেছিল সোনালি আঁশ। কিন্তু পাটের সেই স্বর্ণালি যুগ হারিয়ে গেছে। বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এর রপ্তানি ও উৎপাদন দুটোই কমেছে। তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে আগের সময়ের চেয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। এ রপ্তানিতে ‘আশার আলো’ দেখছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে বিগত সময়ের চেয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪১৮ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।’ তিনি বলেন, ‘পাটশিল্পের উন্নয়ন মানেই রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির সমৃদ্ধি।’
দেশে যখন পাট ও পাটজাত পণ্য নিয়ে এ ধরনের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, ঠিক তখন আজ শুক্রবার (৬ মার্চ) ‘পাটশিল্প গড়ে তুলুন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে জাতীয় পাট দিবস। দিবসটি উপলক্ষে আজ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বহুমুখী পাট মেলা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
পাটের উৎপাদন কমছে
বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তারপরও পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির হার স্থিতিশীল নয়। ২০১৬ সালে ১৭ দশমিক ৮৫ একর জমির আবাদ থেকে উৎপাদিত হয়েছিল ১৫ দশমিক ৪৯ লাখ মেট্রিক টন পাট। ২০২১ সালে জমির পরিমাণ বেড়ে ২৩ দশমিক ৭৯ লাখে একরে উন্নীত হয়। কিন্তু সেবার জমির পরিমাণ বাড়লেও পাটের উৎপাদন নেমে এসেছিল ১৪ দশমিক ০৯ লাখ মেট্রিক টনে। ২০২৫ সালে পাটের আবাদ হয় ১৬ দশমিক ৮২ একর। উৎপাদন ছিল ১৫ দশমিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন কমলেও এই এক দশকে পাটের গড় বাজারমূল্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি কেজি পাটের গড় বাজারমূল্য ছিল ৪০ দশমিক ৫৮ টাকা; ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৪৮ টাকায়। অর্থাৎ দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির চালচিত্র
বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন ও পাট অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২০২৪- ২০২৫ অর্থবছরে ১২টি দেশে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। এই ১২টি দেশের মধ্যে রয়েছেÑ ভারত, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, তিউনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আইভরি কোস্ট, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড। অনেক দেশেই বর্তমানে পাট রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে।
পাট অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবরে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীন, ব্রাজিল, ইউকে, তিউনিশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ৮০ হাজার ৭৪০ বেল কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি হয় ২ দশমিক ২৯ টন, আয় হয় ১৭৮১.৭৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয় ৬.৪৩ লাখ টন ও আয় হয় ৮০৯৫.২০ কোটি টাকা।
চাহিদা থাকলেও রপ্তানি করা যাচ্ছে না
পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি সম্পর্কে বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। অল্প কিছু দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এতে পাটের বাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। আমরা চাই কাঁচা পাট রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হোক।’ পাট খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ৪০টির মতো পাটকল চালু আছে। যদিও সরকারি হিসাবে সেটি দুই শতাধিক বলা হয়। তবে আমরা চাই অন্য পাটকলগুলোও চালু করা হোক। কেননা বিশ্বে পাটের চাহিদা রয়েছে; কিন্তু সেই তুলনায় আমরা রপ্তানি করতে পারছি না।’
তিনি বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। বিএনপি কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানির বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা চাই পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ওপর যেসব বিধিনিষেধ বিগত সরকার দিয়ে গেছে তা তুলে নেওয়া হোক।’ তিনি বলেন, ‘পাটকলসহ অন্য কলকারখানাগুলো চালু করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাটের বাজারদরও বাড়বে। বর্তমানে এক মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের খরচ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। এই পাট তারা ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে পারে। এ দাম আরও বাড়ালে কৃষকের পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে।’
তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পাটশিল্প বড় অবদান রাখবে
পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সৈয়দ মো. নূরুল বাসির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্বে আমাদের দেশের পাট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে কাঁচা পাট রপ্তানি বিগত সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। কেননা কয়েকটি দেশ আমাদের কাঁচা পাট নিয়ে পণ্য তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করে। তবে দেশীয় শিল্প ও পাটকল এবং অন্যান্য কলকারখানায় পাটের চাহিদা বেড়ে যাওয়াও রপ্তানি বন্ধ থাকার একটি কারণ।’
মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের বন্ধ থাকা সরকারি পাটকলগুলো বেসরকারিভাবে লিজভিত্তিক চালু করা হচ্ছে। ২৫টির মধ্যে ২০টি লিজের জন্য ধার্য করা হয়েছে, ৫টি লিজ দেওয়া হয়েছে। আর বেসরকারি পর্যায়ে ২৬৬টি পাটকল রয়েছে। সেখানে ৯৩টি বন্ধ আছে।’
তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পাটশিল্প বড় অবদান রাখবে, এমন প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ‘দেশের ৪ ভাগের এক ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাটশিল্পের সঙ্গে জড়িত। পাট দিয়ে বহুমুখী পণ্য তৈরি করা যায়। বর্তমানে আমরা দেশে ২৮২ ধরনের পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করছি। আমাদের কৃষকরা যদি ভালো দাম পায় তাহলে তারা পাট চাষে মনোযোগ দেবে।’
পাট খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে
পাটের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে পাট খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পাট খাতকে উজ্জীবিত করতে স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদি কার্যক্রম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। স্বল্প মেয়াদি কর্মপরিকল্পনাতে পাট অধিদপ্তরের ১৫ প্রকার লাইসেন্স অনলাইন সেবাদান, পাট আইন সংশোধন, পাট খাতে বিশেষ প্রণোদনা, জুট পোর্টাল তৈরির মতো কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় ইন্ডাস্ট্রিজ-একাডেমি কলাবরেশন বৃদ্ধি, পৃথক টাস্কফোর্স গঠন, জুট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার-পাট খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, গোল্ডেন ফাইবার অব বাংলাদেশ নামে ব্র্যান্ডিংয়ের মতো বিভিন্ন কার্যপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।’