কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৫৫ পিএম
বন্যা, অতিবৃষ্টি আর অনিশ্চিত আবহাওয়ার ধাক্কায় বছরের পর বছর ক্ষতির মুখে পড়ছেন দেশের লাখো মাছচাষি। কখনও পুকুরের পানি উপচে মাছ ভেসে যায়, কখনও হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে মাছ মরে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন অনিশ্চয়তার মাঝেই মাছচাষিদের জন্য এসেছে এক নতুন ভরসা ‘মৎস্য মাইক্রোইনস্যুরেন্স’। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া এই বীমা মাছচাষিদের দিচ্ছে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে আর্থিক সুরক্ষার এক কার্যকর ছাতা। ক্ষতি যাচাই নয়, বরং আবহাওয়া নির্দিষ্ট সূচক অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণÑ এমন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় বদলে যেতে পারে দেশের মৎস্য খাতের নিরাপত্তা চিত্র। এটি এখন জলবায়ু অভিযোজনের বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে, যা শুধু মাছচাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই নয়, তাদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতেও সহায়ক হবে।
ইনোভিশন কনসালটিং লিমিটেড ও গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্সের যৌথ এই উদ্যোগ এটি বাস্তবায়ন করছে সুইসকন্ট্যাক্ট, আর আর্থিক সহায়তা দিয়েছে সুইস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন এজেন্সির (এসডিসি) অধীন বাংলাদেশ মাইক্রোইনস্যুরেন্স মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (বিএমএমডিপি)।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের মোট কৃষিজ জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসে মৎস্য খাত থেকেÑ যে খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি প্রতিবছরই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বন্যা, অতিবৃষ্টি, ঝড় ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া ও রোগব্যাধির কারণে দেশের মাছচাষিরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের।
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ মাইক্রোইনস্যুরেন্স মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (বিএমএমডিপি) সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কৃষির বিভিন্ন উপ খাতে মাইক্রোইনস্যুরেন্স চালুর উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ইনোভিশন কনসালটিং লিমিটেড ও গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স যৌথভাবে তৈরি করেছে দেশের প্রথম ‘আবহাওয়া সূচক-ভিত্তিক মাইক্রোইনস্যুরেন্স’ পণ্য, যা অতিবৃষ্টি, তীব্র গরম ও নিম্ন তাপমাত্রাজনিত ক্ষতির ঝুঁকি থেকে মাছচাষিদের সুরক্ষা দেবে।
ইনস্যুরেন্সের মূল বৈশিষ্ট্য হলোÑ এটি ক্ষতি যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্দিষ্ট আবহাওয়া সূচক অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা বা বৃষ্টিপাত নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে পেমেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়, মাঠে ক্ষতি যাচাই করার কোনো প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করা হয় এবং নির্ধারিত ট্রিগার পূর্ণ হলে ক্ষতিপূরণ পরিমাণ হয় ৩০০ টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রিমিয়ামও কৃষকদের নাগালের মধ্যে রাখা হয়েছে। পুকুরের আকার অনুযায়ী প্রিমিয়াম ১৭০ টাকা থেকে ১৩,০০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত।
মৎস্য খাতের জন্য নতুন মাইক্রোইনস্যুরেন্স পণ্যটি জনপ্রিয় করতে প্রকল্প দল ৩০টিরও বেশি অংশীদারের সঙ্গে কাজ করেছে, যার মধ্যে হ্যাচারি, খাদ্য ও রাসায়নিক কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মৎস্য অধিদপ্তর রয়েছে। জনমনে বীমার প্রতি অনীহা কমাতে এটি ‘মৎস্য বন্ধু’ডিজিটাল প্লাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। অ্যাপে কৃষকরা নিবন্ধন, পলিসি তথ্য, প্রিমিয়াম পরিশোধ ও ক্লেম দাখিল করতে পারেন। আছে এআইচালিত কল সেন্টার, নলেজ ব্যাংক, এক্সপার্ট পরামর্শ, ফিড ক্যালকুলেটর, আবহাওয়া সতর্কতা এবং বিক্রেতা তথ্য। ইতোমধ্যেই ৩,৫০০-এর বেশি কৃষক যুক্ত হয়েছেন।
খুলনার কৃষক জ্যোতির্ময় বিশ্বাস বলেন, গত বছর আমার খামারে হোয়াইট স্পট রোগ হয়েছিল। পোনা কিনতে টাকা জোগাড় করার জন্য আমাকে গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। যদি এমন সময় বীমা আমাদের সহায়তা দিত, আমি অবশ্যই এই বীমার অংশ হইতাম।
খুলনার কৃষক নজরুল ইসলাম খান বলেন, স্কুল থেকে ফিরে আমার ছেলে পুকুরের দেখাশোনায় সাহায্য করে। যদি এই বীমা আমাদের খারাপ মৌসুমের পরও ব্যবসায় টিকে থাকতে সাহায্য করে, তাহলে প্রিমিয়াম দেওয়াটা সার্থক হবে।
সাতক্ষীরার কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানার সময় আমার পুকুর উপচে পড়েছিল, সব মাছ ভেসে গিয়েছিল। তখন কোনো সহায়তা পাইনি। বীমা থাকলে আমি আবার শুরু করতে পারতাম।
যশোরের কৃষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগে বীমার কথা শুনলে মনে হতো এটি শুধু ধনী কৃষকদের জন্য। কেউ যদি সহজভাবে এসে বুঝিয়ে দেয়, আমরা অবশ্যই শুনব।
মাছের খাদ্য সরবরাহকারী আজিজুর রহমান পারভেজ বলেন, আমি ২০০-এর বেশি কৃষককে মাছের খাদ্য সরবরাহ করি। যদি ইনপুটের সঙ্গে বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়, আমি তথ্য ছড়িয়ে দিতে এবং প্রিমিয়াম সংগ্রহে সাহায্য করতে পারব।
বিএমএমডিপির প্রধান পারভেজ আশেক বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহে বীমার চাহিদা বাড়তে দেখছি। ইনোভিশন ও গ্রিন ডেল্টা এই বাজারে নতুন নতুন কভারেজ সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
ইনোভিশন কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সরওয়ার বলেন, আমাদের লক্ষ্য মৎস্য খাতে টেকসই বীমা বাজার ব্যবস্থা গঠন করা। ফিড কোম্পানি, রাসায়নিক সরবরাহকারী, হ্যাচারি ও নার্সারির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বীমা ছড়িয়ে দেওয়াÑ এটি সবাইকে লাভবান করবে, বিশেষত কৃষকদের।
গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানাহ চৌধুরী বলেন, অন্তর্ভুক্তি ছাড়া স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র মাছচাষিরা সুরক্ষিত না থাকলে গোটা ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে থাকে। ‘মৎস্য বন্ধু’ হচ্ছে এমন এক পদক্ষেপ, যা প্রান্তিক কৃষকদের পুনরুদ্ধার, অভিযোজন ও উন্নতির পথে এগিয়ে নেবে।