মিনি কোল্ড স্টোরেজ
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৪ এএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫০ এএম
দেশে বছরে লাউ, কুমড়া, ডাঁটা, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন প্রকারের সবজি উৎপাদিত হয় ২৫ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ৩০-৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এর পরিমাণ ৫ মিলিয়ন টনেরও বেশি। কষ্টের ফসল নষ্ট হওয়ায় পরবর্তীতে কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারান। এতে করে ক্রেতারাও বেশি দাম দিয়ে সবজি কিনতে বাধ্য হন। অনেক সবজি আবার বিদেশ থেকেও আমদানি করতে হয়।
'জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প'-এর আওতায় সম্প্রতি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার মেদুলিয়া ইউনিয়নে কৃষকদের মধ্যে কোল্ডস্টোরেজ হস্তান্তর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে ১০০টি মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করেছি। পরবর্তীতে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।
বছরে ১২ হাজার টন সবজি সংরক্ষণ
প্রকল্পটির পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ুর কারণে ফসল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করে দেন। তা ছাড়া বড় কোল্ডস্টোরেজগুলো সাধারণত আলুভিত্তিক, ব্যয়বহুল এবং শহরমুখী। তিনি বলেন, রুম-বেজড ও কনটেইনার-বেজড দুটি মডেল চালু করা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে টিএসসিআর (রুমবেজড মডেল)। যেখানে বিদ্যমান ঘরকে ইনসুলেশন, ভ্যাপার-বারিয়ার, কুলিং কন্ট্রোলার যোগ করে রূপান্তর করা হয়। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ১০ টন, খরচ প্রায় ৫ লাখ টাকা। এটি ইউনিয়ন পর্যায়ের সংগ্রহকেন্দ্র বা কৃষক সমিতির জন্য আদর্শ। দ্বিতীয়টি টিএসসিসি (কনটেইনার বেজড মডেল)। এটি প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড কনটেইনার, যা দ্রুত বসানো যায় এবং স্থানান্তরযোগ্য। এতে খরচ পড়ে ১৫ লাখ টাকা। এটি বাজারঘেঁষা এলাকা বা দ্বীপাঞ্চলে বেশি কার্যকর। দুটি মডেলেই রয়েছে সোলার-গ্রিড হাইব্রিড চালনা, স্মার্ট কন্ট্রোলার দ্বারা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ (৪-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস), হিউমিডিটি ম্যানেজমেন্ট (৮০-৯৫ শতাংশ আরএইচ), মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মনিটরিং এবং পরিবেশবান্ধব কনফিগারেশন। প্রতিটি ইউনিট প্রচলিত সিস্টেমের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে এবং বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কেজি কার্বন নিঃসরণ কমায়।
তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, এখন পর্যন্ত ১৯টি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করেছি। চলতি সেপ্টেম্বরে তা ৫০ এবং অক্টোবরে আরও ৫০টি স্টোরেজ স্থাপন করা হবে। এক মাসে গড়ে পর্যায়ক্রমে ১০ মেট্রিক টন করে হলেও বছরে ১২০ মেট্রিক টন সবজি সংরক্ষণ করতে পারবেন কৃষক। বছরে সংরক্ষণ করা যাবে ১২ হাজার টন। এতে অন্য কৃষকরাও কেজিতে ১-২ টাকা ভাড়া দিয়ে সবজি সংরক্ষণ করতে পারবেন।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মিনি কোল্ডস্টোরেজে বিভিন্ন সবজি ও ফল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সতেজ রাখতে পারে। টমেটো সাধারণত ১০-১৫ দিন এবং শসা, বেগুন, লাউজাতীয় সবজি ৭-১৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। পাতাওয়ালা সবজি যেমন-পালং শাক, ধনেপাতা বা লেটুস ৫-৭ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। ক্যাপসিকাম ও মরিচ ১৫-২৫ দিন পর্যন্ত মান ধরে রাখে। ফলমূলও ৪-৫ দিন সংরক্ষণ করা যায়।
কী বলছেন কৃষকরা
সরেজমিন মানিকগঞ্জের সিংগাইরে স্থাপিত কোল্ডস্টোরেজটিতে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কোল্ডস্টোরেজটি চলছে। কৃষকরা পটোল, চিচিঙ্গা, টমেটোসহ বিভিন্ন প্রকারের সবজি রেখেছেন। কথা হলে কৃষকরা জানান, সিংগাইরে প্রচুর শাকসবজি উৎপন্ন হয়। তারা বেশিরভাগ সময়ই ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। অনেক সময় এসব সবজি নামে মাত্র মূল্যে বিক্রি হয়। কৃষকদের চাষাবাদের খরচও আসে না। এ অবস্থায় এসব কোল্ডস্টোরেজ তাদের জন্য আশীর্বাদের মতো।
বিশেষজ্ঞ বক্তব্য
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিবিজনেস অ্যন্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকারের কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজের উদ্যোগটি অবশ্যই ভালো। এটি সরকারি সহায়তা দিয়ে চালিয়ে রাখা হলে তা বেশি টেকসই হবে না।