সিঙ্গাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ২১:২০ পিএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ২২:০৪ পিএম
কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেছেন, শীতকালে শালগম, মুলাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপন্ন হয়। সে সময় দাম কম থাকে। সংরক্ষণের অভাবে পঁচে যায়। এতে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার কৃষকপর্যায়ে মিনি কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা করছে। এতে প্রয়োজনমত সবজি সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে। এতে তাদের ক্ষতির পরিমাণ কমবে।
বুধবার (২৭ আগস্ট) মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের মেদুলিয়া এলাকায় ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আজ সারাদেশে ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ বিতরণ করা হয়।
উপদেষ্টা বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষি সিন্ডিকেট করে বড় বড় বিল্ডিংয়ের মালিক হচ্ছেন। কৃষকরা কুঁড়ে ঘরেই থাকতে হচ্ছে। ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ কেবল ফসল সংরক্ষণ নয়, বরং কৃষি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে এ প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের হাতে প্রযুক্তি পৌঁছে।
তিনি বলেন, মানিকগঞ্জে গাজর, শীতকালীন সবজি বেশি উৎপাদন হয়। এই ব্যবস্থায় কৃষক, ভোক্তার সরাসরি উপকৃত হবেন। এ মিনি কোল্ড স্টোরেজে পরে আরও বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে কৃষকরা নিজেরাও বাড়িতে তৈরি করে নিতে পারবেন অল্প খরচে। আমারা কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিব।
কৃষি উপদেষ্টাকে কাছে পেয়ে বেশ কিছু দাবি জানিয়েছেন সিংগাইরের স্থানীয় কৃষকরা। তারা দাবি জানান, মানিকগঞ্জে প্রচুর গাজর হয়। এসব প্রক্রিয়ার জন্য মেশিন দরকার, যাতে অল্প সময়েই কাজ করা সম্ভব হয়।
এ সময় উপদেষ্টা বলেন, মেশিন পেলে আবার কুইড়া (অলস) হয়ে যাবেন। মেশিনের কারণের কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। তবে আমরা কিছু মেশিন দেব। হাতেও কাজ করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
স্থানীয় প্রভাবশালীরা খাল দখল করে রাখায় চাষাবাদ করা যাচ্ছে না- কৃষকদের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসককে খালটি উদ্ধারের নির্দেশনা দেন উপদেষ্টা।
স্থানীয় জমিগুলো বড় বড় কোম্পানিগুলো নিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেন। এসময় উপদেষ্টা বলেন, কৃষিজমির জন্য নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। কেউ ইচ্ছা করলেই সেখানে যা খুশি তা করতে পারবে না। তাছাড়া মাটির উপরের অংশ বা টপসয়েল ইটের ভাটায় বিক্রি না করতে নির্দেশ দেন তিনি।
নকল ও ভেজাল বীজের ব্যাপারে উপদেষ্টা বলেন, নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপদেষ্টা বলেন, ‘শিল্প কারখানা ও অন্যান্য অবকাঠামোর জন্য আলাদা জমি থাকবে। সড়ক অধিগ্রহণের সময় সড়ক বিভাগ জমির মালিককে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ দিলেও এলজিইডি কোনো অর্থ দেয় না। নতুন আইন প্রণয়ন হলে এলজিইডির প্রকল্পেও ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা তিনগুণ ক্ষতিপূরণ পাবেন।’
কী সুবিধা পাবেন কৃষক
কোল্ড স্টোরেজ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়িত ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর আওতায় প্রাথমিকভাবে সারাদেশে ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়েছে। একটি ঘরভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজে ১০ টন পণ্য রাখা যায় এবং খরচ প্রায় ৫ লাখ টাকা। কনটেইনার মডেলের খরচ ১৫ লাখ টাকা। প্রচলিত কোল্ড স্টোরেজের তুলনায় এই মিনি সংস্করণের খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কম।
এটি পুরোপুরি কৃষকবান্ধব প্রযুক্তি। বাংলাদেশের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এতে স্থানীয় ও আমেরিকান হাই-টেক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে। ঘরভিত্তিক টিএসসিআর এবং কনটেইনারভিত্তিক টিএসসিসি—দুটি মডেলের কোল্ড স্টোরেজ তৈরি করা হয়েছে। সোলারচালিত এ প্রযুক্তিতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ইন্টারনেটভিত্তিক এবং রিয়েল টাইম তদারক সুবিধা থাকায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘরে বসে এই মিনি কোল্ডস্টোরেজ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একটি ঘরভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজে ১০ টন পণ্য রাখা যায় এবং খরচ প্রায় ৫ লাখ টাকা। কনটেইনার মডেলের খরচ ১৫ লাখ টাকা।
প্রচলিত কোল্ড স্টোরেজের তুলনায় এই মিনি সংস্করণের খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কম। এটি বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমায়—যা ১৪০-১৬০টি গাছের সমান পরিবেশবান্ধব সুবিধা।
প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে কৃষকরা মৌসুমি সবজি ও ফলের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদন হলে বাজারে দাম পড়ে যায়, আর তখন কৃষকের ফসল লোকসানে বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষকের পাশাপাশি ভোক্তাও লাভবান হবেন। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি কৃষকের ঘরেই স্থাপন করা সম্ভব এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। কৃষকের আয় বৃদ্ধি, ফসলের অপচয় কমানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।