ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৫ ০৯:৪১ এএম
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে কফি চাষ করছেন বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার মেন ইয়াং ম্রো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী এই শিক্ষক তিন একর জমিতে অ্যারাবিকা ও রোবাস্টার প্রজাতির কফি চাষ করছেন। বছরে ৩-৪ মণ কফি সংগ্রহ করেন তিনি।
মেন ইয়াং ম্রো বলেন, বান্দরবানে স্থানীয় বাজারে কফির দাম কম। প্রতি কেজি অ্যারাবিকা শুকনো চেরি (খোসাসহ) বিক্রি হয় ৩০০ টাকায়। শুকনো পার্সলেন ৬০০ টাকা কেজি (সাদা অংশ) ও গ্রিনবিন (কফির দানা) ১ হাজার টাকা।
কফি চাষে সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, চাষ করতে পারলে দেশে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রচুর রোগবালাই হয়। এতে যত্ন নিতে হয়। আমরা প্রাকৃতিকভাবেই চাষাবাদ করছি। আর কফিতে কীটনাশক ব্যবহার করলে বিনের ভেতরে চলে যায়। এজন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না।
২০২১ সাল থেকে নেত্রকোণা জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কফি চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করেন টিউলিপ কফি ফার্মিং অ্যান্ড রোয়েস্টরি মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন (টিউলিপ)। তিনি বলেন, পাকা চেরি আমরা ১২০-১৭০ টাকায় কিনে থাকি। ৭ কেজি চেরিতে ১ কেজি কফি পাওয়া যায়। সাদা অংশটুকু ১০০০-১২০০ টাকা ও কফির দানা শুকনোটার কেজি ২০০০ টাকা। এখানে ৭০ জনের মতো কফি চাষি রয়েছে। তবে গত বছরের বন্যা ও হাতির আক্রমণে কিছু কৃষকের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫০ হাজার গাছের মধ্যে বর্তমানে ৩০ হাজারের মতো টিকে রয়েছে। তিনি বলেন, আম, মাল্টা, লেবু, লিচু বা অন্যকোনো বাগানে সহযোগী ফসল হিসেবে কফি চাষ হয়। এজন্য বাড়তি জমিরও প্রয়োজন পড়ে না। এক একর জমিতে ২০০-৩০০ গাছ রোপণ করা যায়।
২০২৩ সাল থেকে কফি প্রক্রিয়াজাত করা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাজারে আমরা সচরাচর যেসব কফি পান করি সেটাকে বলে ইন্সট্যান্ট কফি। আর আমাদেরটা হলো গ্রাউন্ড কফি। সরাসরি গরম পানিতে দিলে এটি মিশবে না। এগুলো চা যেভাবে ফুটিয়ে পান করতে হয় এসব কফিও সেভাবে প্রস্তুত করতে হয়।
কফি চাষে সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, মার্চ-এপ্রিলে কফি গাছে ফুল আসে। তখন সেচ বা পানির ঘাটতি হলে ফল ঝরে পড়ে। গাছের বৃদ্ধি কমে যায়। সেই সময় সপ্তাহে অন্তত একবার পানি দিতে হয়। আর আমাদের দেশের কৃষকরা প্রশিক্ষিত নয়। তাই তারা যথাযথভাবে চাষ করতে পারছে না। সরকার মাত্র একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। আমরা উপলব্ধি করেছি কমপক্ষে তিনটি প্রশিক্ষণ পেলে কৃষকরা পুরোপুরিভাবে কফি চাষ আয়ত্ত করতে পারবে।
বাজারে চাহিদা প্রচুর উল্লেখ করে মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কফি বাজারজাতে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের কফিগুলোর চাহিদা প্রচুর।
কফি পানের প্রজন্মে পরিবর্তন এসেছে বলে জানান অ্যারাবিকা কফির অপারেশন ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, আগে যুবক বা প্রবীণরা কফি পান করত। বর্তমানে যুবকরাও কফি পান করছে, সেই সঙ্গে ৫-৬ বছরের শিশুরাও কফি পান করছে। এটি এখন সর্বজনীন পানীয়তে পরিণত হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকরাও কফি পান করে।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বর্তমানের অরিজিনাল কফি যারা পান করে তারা মূলত আমেরিকার কফি পান করে। তারা মিল্ক কফির বদলে ব্লাক কফি পান করে। সিঙ্গেল বা ডাবল শর্ট থাকে। ৫-৬ বছরের শিশুও সিঙ্গেল শর্ট পান করতে পারে। প্রতি কাপ অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক কফি ২৫০-৩০০ টাকা, মিল্ক কফি ৩৫০-৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশে আমেরিকান ও ব্রাজিলিয়ান কফি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়।
দেশীয় কফি চাহিদা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনও দেশিয় কফি আমরা সংগ্রহ শুরু করিনি। তবে পকিল্পনা আছে সেগুলো আমরা নেব। বিশেষ করে পাহাড় ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কফির ভালো আবাদ হচ্ছে। সেগুলোর মানও উন্নত। এগুলো যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে জোগান বাড়বে। পাশাপাশি আমাদের বৈদেশিক অর্থ সাশ্রয় হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশে কফির চাহিদা প্রায় ২ হাজার টন। গত এক দশকে গড়ে কফির চাহিদার প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫৬ শতাংশ। বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কফি দেশের অভ্যন্তরে বিক্রি হয়। ভোক্তা পর্যায়ে গত ৫ বছরে পণ্যটির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, কফির উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলা, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কফির আবাদ একটি বড় সুযোগ রয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য গুণগতমান সম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য চাহিদা পূরণ ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নত দেশে রূপান্তর করা। কৃষি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এবং সহনীয় কৃষি ব্যবস্থার ওপর গবেষণা ও উন্নত জাত ও কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২১ সালে প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর কফি আবাদের পাহাড় ও সমতলে বিপুল সম্ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছে।
শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশের পার্বত্য অঞ্চলের ২ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমিকে কাজুবাদাম ও কফি চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে উৎপাদিত কফির মাধ্যমে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ১ বিলিয়ন ডলার এর রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে বিএসআরএম ও কাজী গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান রপ্তানির উদ্দেশ্যে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করেছে। সেখানে ১২০০ জনের মতো লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তা ছাড়া বিদ্যমান প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে প্রায় ২০০০ জন শ্রমিক কাজ করছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হলো নারী শ্রমিক।
বেড়েছে কফি চাষ, কমেছে আমদানি
চাষাবাদের পরিমাণ বাড়ায় দেশে কফির আমদানি কমেছে। বর্তমানে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলার পাশাপাশি টাঙ্গাইল, রংপুর, নেত্রকোণাসহ ১৯ জেলার ৬৬ উপজেলায় কফি চাষ হচ্ছে। কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে কফি চাষ হতো ৫০-৬০ হেক্টর জমিতে। বর্তমানে তা বেড়ে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর হয়েছে। বর্তমানে ৫৫-৬০ টন কফি উৎপাদন হচ্ছে।
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে শহীদুল ইসলাম বলেন, আমাগী ৩-৪ বছরের মধ্যে আমাদের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২ হাজার টন। মূলত দেশীয় কফি দিয়েই যেন চাহিদা পূরণ শেষে রপ্তানি করা যায় সেটি নিয়েই কাজ করছি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কফি আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৩২ হাজার কেজি। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৩ হাজার কেজি কমে তা ১৪ লাখ ৩৯ হাজার কেজিতে নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্রিন কফি আমদানি হয়েছে ২৮৪ মেট্রিক টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫২ টন।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কেমন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বান্দরবানের বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ জানান, আমরা অ্যারাবিকা ও রোবাস্টার কফির চারা উৎপাদন করে পাহাড়ি অঞ্চলে আবাদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছি। এখানে কৃষকদের সমতলের চেয়ে কম দামে চারা বিক্রি করা হয়। তিনি বলেন, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৯ লাখ কফির চারা বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ৫ লাখ ২০ হাজার চারা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাহাড়ে সহযোগী ফসল হিসেবে কফির আবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে জানান, বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমএম শাহ্ নেয়াজ। তিনি বলেন, আম, লিচুসহ বিভিন্ন বাগানে সহযোগী ফসল হিসেবে পার্বত্য অঞ্চলে কফির আবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এখানে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প-কারখানা সৃষ্টি হয় তাহলে কৃষকরা ভালো দাম পাবে। তখন দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করতে পারব।