হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫ ১৬:৩৮ পিএম
সবুজ পাতার ফাঁকে রঙিন করমচা। প্রবা ফটো
রোদ-বৃষ্টির খামখেয়ালিতে ভরা জ্যৈষ্ঠের শেষ বিকাল। একটু আগেই একপশলা বৃষ্টির পরশ বুলিয়ে গেছে। ব্যস্ত রাজধানী। ধুলোয় ধূসরিত তার পথতরুর পাতাগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে কিছুটা চকচকে দেখাচ্ছে। রাজধানীর কাকরাইল-বিজয়নগর মোড়ে এসে বাস থেকে নেমেছি। যাব পুরানা পল্টন লেনের বটতলা মসজিদের সামনে। হাঁটছি। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা সড়ক ধরে।
প্রশস্ত রাস্তার ওপর দেখি সারি সারি ভ্যান, রিকশা, প্রাইভেট কার। চালকরা বিশ্রাম নিচ্ছেন। জনমানব আছে। কিন্তু উচ্চস্বরে কলরব হচ্ছে না। এর বিশেষ কারণ, রাস্তার উত্তর পাশে রয়েছে আবাসন। বাড়িগুলোও বেশ পুরাতন। আটপৌরে। গাছগাছালিতে ভরা। চালকরা কেউ ভ্যান রিকশার ওপর আয়েশি ভঙ্গিতে গা এলিয়ে বিশ্রাম করছেন। একটি বাড়ির ভেতর থেকে একটা গাছের এলানো দুটি ডাল রাস্তায় এসে পড়েছে। সেই গাছ ছাড়াও আরও কয়েকটি সুউচ্চ গাছের ছায়া চারপাশটা মায়াবী করে তুলেছে।
ফিরে আসি সেই এলানো ডালের গাছের ফিরিস্তিতে। সবুজ গোলাকার পাতার ফাঁক গলে থোকা থোকা সবুজ-সাদা-লাল-গোলাপি আভা ছড়ানো ছোট্ট ফলগুলো যেন উঁকি দিচ্ছে। ওই রাস্তায় যাদের নতুন যাতায়াত তারা একটু অবাকই হবেন প্রথমে দেখায়। ধাক্কা খাবেন। এত সুন্দর থোকা থোকা ফল ঝুলছে একদম ঠিক থামানো রিকশাটির ওপর। ক্রিচক্রযানের ওপর বসা থাকা মানুষগুলো চাইলেই তো চোখ জুড়ানো ওই ফলগুলো ছিঁড়তে পারেন। কিন্তু তারা অনেকটা নির্বিকার। ফলগাছটি দেখিয়ে বললাম, ‘আপনারা কি এই গাছটির নাম জানেন?’ এক চালকের ঝটপট উত্তর, ‘করমচা গাছ।’ লোকটি আপন মনে বললেন, ‘করমচা খুব টক। হায়রে টক রে। বেশি খাওয়া যায় না।’ মানুষটির বলার ভঙ্গিতে বুঝলাম তার মুখে জল এসে গেছে।
টক এ ফলটি কারও কারও প্রিয়। মুখে অরুচিতে বেশ উপকারী। পিপাসা, বারবার হাই তোলা, পিত্ত প্রদাহ ও বাতরোগে করমচা ওষুধের কাজ করে। স্বাদে টক হলেও গুণে বেশ কার্যকরী। শহরের বাসাবাড়িতে ফুলের বাগানের সঙ্গে একটি করমচা গাছ লাগানো যেতে পারে। এতে করে দেশের প্রাচীন একটি ফলের গাছকে টিকিয়ে রাখা যাবে। সেই সঙ্গে বাগানের শোভাবর্ধনও হবে।
বর্তমানে নগর ঢাকায় বসবাসকারীদের কাছে গাছটি কম দৃশ্যমান হলেও বয়সি ওই রিকশাওয়ালা গ্রামগঞ্জের বনে-বাদাড়ে এমন করমচা গাছের দেখা অহরহ পেয়েছেন। যে কারণে তিনি উত্তর দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি। কেননা এটি আমাদের দেশের প্রাচীন একটি ফল। কাঁচা, পাকা উভয় অবস্থাতেই টক। তবে দেখতে দৃষ্টিনন্দন। মোহনীয়। যা চোখের আরাম দেয়। ঠেকানো একটি ভ্যানের ওপর চড়ে করমচা ফলের কিছু ছবি তুললাম।
কমরচা গাছ লম্বায় ২০-২৩ ফুট লম্বা হয়। ঝোপালো পাতা সবুজ। ছোট-বড় দুই-তিন রকম করমচা দেখা যায়। এর পাতা ছিঁড়লে দুধের মতো আঠা বের হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে ফুল হয়। চার পাপড়ির ছোট্ট সাদা ফুল। ফল পাকে আষাঢ় মাসে। এবার জ্যৈষ্ঠের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কোথাও কোথাও বাজারে বিক্রি হতে দেখছি।
এই গাছটিকে বাংলায় করমচা, সংস্কৃতিতে করমর্দক, হিন্দিতে করন্ডা এবং ইংরেজিতে Bengal currant বলে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের নাম Carissa carndas linn, পরিবার Apocynaceae. এই গাছে ফল না থাকলে যে কেউ এর গাঁটে গাঁটে ও প্রশাখাতে কাঁটা দেখে প্রথম দেখায় ভুল করে বসবে। আরে এও বুঝি এক জাতের লেবুগাছ। এজন্য হয়তো কবি লিখেছেনÑ ‘নেবুর পাতায় করমচা, যা বৃষ্টি ঝরে যা।