প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৫ ২০:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৫ ২০:৪৫ পিএম
দেশে সরিষা, সূর্যমুখি, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও তিলসহ তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। গত ৪ বছরে এসব ফসল আবাদের জমির পরিমাণ বেড়েছে ৫.১৬৬ লাখ হেক্টর ও উৎপাদন বেড়েছে ৮.৭১৭ লাখ মেট্রিক টন। তবে এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন বাড়লেও বীজ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক। কেননা তারা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজে নিয়ে ঠকছেন। এসব বীজে থাকে মিশ্রণ ও তাতে দ্বিতীয় বছর ফলন কমে যায়।
তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প (১ম সংশোধিত) এর জাতীয় কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালক আব্দুর রহিম।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. মাহবুবুল হক চৌধুরী, বিশেষ অতিথি ছিলেন ডিএইর পরিচালক ও অর্থ উইংয়ের মো. হাবিবউল্লাহ, ক্রপস উইংয়ের পরিচালক ড. মো. হযরত আলী, পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের পরিচালক মো. আব্দুস সাত্তার, প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালক বেলাল উদ্দিন, মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলাম জানান, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে সরিষা, সূর্যমুখি, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও তিলসহ তেলজাতীয় ফসলের আবাদের জমির পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৫২৪ লাখ হেক্টর। সেখানে তেলের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৯৭৭ মেট্রিক টন। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৬৯০ লাখ হেক্টর। তেলের উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৬৯৪ লাখ মেট্রিক টন। এই হিসেবে ৪ বছরে আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৫ দশমিক ১৬৬ লাখ হেক্টর এবং উৎপাদন বেড়েছে ৮ দশমিক ৭১৭ লাখ মেট্রিক টন।
তিনি শুধু সরিষা আবাদ ও উৎপাদনের হিসেবে বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে সরিষার আবাদ হতো ৫ দশমিক ৯০০ লাখ হেক্টর ও ফসল উৎপাদন হতো ৭ দশমিক ৮৭ লাখ মেট্রিক টন। এটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪০ লাখ হেক্টর। অর্থাৎ ৫ বছরে জমির পরিমাণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন ছিল ৭ দশমিক ৮৭ লাখ টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ টন। সে হিসেবে ৫ বছরে সরিষার উৎপাদন বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৭ লাখ টন।
কর্মশালায় মুক্ত আলোচনা পর্ব পরিচালনা করেন মো. আব্দুর রহিম। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা বিএডিসির বীজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেন ও সমালোচনা করেন। সেখানে সরিষার বীজে মিশ্রণ থাকে বলে জানান, মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের এক কৃষক। বিএডিসির বীজে ফলন ভালো হলেও সেগুলো সংরক্ষণ করলে পরের বছর উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এজন্য আঞ্চলিক বীজ সংরক্ষণাগার তৈরির দাবি জানান রাঙামাটির কৃষি কর্মকর্তা। সুনামগঞ্জের আরেক কৃষি কর্মকর্তা বিএডিসির বীজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। তিনি সরকারিভাবে সরিষা সংগ্রহ করে বাজারজাত করার পরামর্শ দেন। বলেন, প্রতি বছর ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি করতে হয় ও ভেজাল তেলে খেয়ে চিকিৎসায় ব্যয় হয় আরো ২০-৩০ কোটিসহ ৬০ হাজার কোটি টাকা। নিজেদের তেল বীজ ব্যবহার করলে এসব অর্থ বেঁচে যাবে। চলনবিল অঞ্চলের কর্মকর্তা ড. মনির হোসেন বলেন, বছরে ৯-১০ হাজার টন সরিষার বীজ দরকার। কিন্তু বিএডিসির বীজে মিশ্রণের কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ডিএইর প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক মুরাদ হাসান বলেন, কৃষক পর্যায়ে ধান, গম, পাট বীজ উৎপাদন প্রকল্প বন্ধ রয়েছে। শুধু বিএডিসির উপর নির্ভর করলে কৃষককে মান সম্পন্ন বীজ দেওয়া সম্ভব না। কেননা ৮-২০ শতাংশ বীজ উৎপাদন করতে পারে বিএডিসি।চলনবিল অঞ্চলের এক বাসিন্দা বলেন, চুয়াডাঙ্গায় বিএডিসির বীজ উৎপাদন কেন্দ্রে মান সম্পন্ন বীজ উৎপাদন হচ্ছে না। ল্যাবে লেগে এসব বীজকে তারা সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বিএডিসির সততা বাড়াতে হবে। চুয়াডাঙ্গায় বাজার থেকে ধান কিনে বীজ ভান্ডারে ঢুকানো হয়ে থাকে।
মো. মাহবুবুল হক চৌধুরী বলেন, প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ভোজ্যতেলের ৪০ শতাংশ আমদানি কমানো। সেটি অর্জন না হলেও অনেক কিছু অর্জন হয়েছে। সরিষা, সয়াবিন, বাদাম ও তিলের আবাদ বেড়েছে। তিনি বলেন, মানহীন বীজের সমালোচনা করেন। বলেন, আমরা মান সম্পন্ন বীজ দেওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করবো।
তিনি বলেন, আমার পরিবারে শুধু ভাজাপোড়া ছাড়া বাকি খাবারে সরিষার তেল ব্যবহার করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
বেলাল উদ্দিন বলেন, ৩০ শতাংশ ক্যালরি আসে তেল ও ফ্যাট থেকে। সেখানে আমরা পেয়ে থাকি মাত্র ৯ শতাংশ। তা ছাড়া কৃষির আবাদ আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে ফসলের সময়ে পরিবর্তন হচ্ছে। সেজন্য বছরের শুরুতেই পরিকল্পনা মাফিক অগ্রসর হতে হবে।মো. হাবিবউল্লাহ বলেন, সরিষার উৎপাদন ও সুনাম নষ্ট করতে নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়। সরিষার তেল খাওয়া ভালো না বলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রচার চালানো হচ্ছে। বর্তমান চিকিৎসকরাও সরিষার তেল নিয়ে নেতিবাচক প্রচার চালাচ্ছে এটি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ড. মো. হযরত আলী বলেন, দানা জাতীয় ফসলের মধ্যে ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও অন্যান্য ফসলে এ পর্যায়ে আমাদের যাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে সরিষা নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু সরিষার জাত উদ্ভাবন হয়েছে যা কয়েকদিন পানিতে টিকে থাকতে পারে। এ পর্যায়ে বিজ্ঞানীদের কাজ বাড়াতে হবে। দেশে সয়াবিন উৎপাদন হচ্ছে অথচ মেঘনা, সিটিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ বাইরে থেকে এনে তেল নিষ্কাশন করে। সেখানে সরকারি গাইডলাইন দরকার। যাতে দেশিয় তেলবীজ তারা ব্যবহার করে।
আব্দুর রহিম বলেন, তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন করে পুষ্টি নিশ্চিতের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহযোগিতা করছে। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।