সমু সাহা
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২২ ০০:২৮ এএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২২ ১৪:৩১ পিএম
কনসার্টের দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে বাংলা খেয়াল পরিবেশন করেন কবীর সুমন (ছবি : ফারহান ফয়সাল)
ঢাকায় চলছে কলকাতার জনপ্রিয় গায়ক, গীতিকবি, সুরকার কবীর সুমনের তিন দিনব্যাপী কনসার্ট। গেল ১৫ অক্টোবর প্রথম দিনে বাংলা আধুনিক গান শুনিয়ে শ্রোতাদের মন ভরিয়েছেন তিনি৷ ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে কনসার্টের ২য় দিন ছিল মঙ্গলবার। এ পর্বের নাম রাখা হয়েছে 'সুমনের বাংলা খেয়াল'।
সাধারণত বাংলা ভাষার গানে খেয়াল খুব একটা শোনা যায় না৷ তাই বলা চলে, এদেশের শ্রোতাদের জন্য গতকালের আয়োজন ছিল সুমনের বিশেষ উপহার।
বিকাল ৫টায় মঞ্চে আসেন কবীর সুমন৷ পরনে তার প্রথম দিনের মতোই জলপাই রঙের ফতোয়া আর সাদা ধুতি। শ্রোতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও স্বাগত জানিয়ে বৈঠকী মেজাজের কনসার্ট শুরু করেন সুমন৷ তিনি প্রথমেই বাংলা খেয়াল নিয়ে আলোচনা করেন। জানান, আচার্য সত্য কিংকর বিষনপুরি ঘরানায় বাংলা খেয়াল শুরু করেন। পরবর্তীতে আজাদ রহমান এই ঘরানা নিয়ে কাজ করেন।
খেয়াল আরবি শব্দ। যার বাংলা কল্পনা। অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে আরব রাজ্যে এর উদ্ভাবন হয়। এটি এক ধরনের রাগ বা তাল। দিজেন্দ্রনাথ রায়ের বাবা খেয়ালের চর্চা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই ঘরানার চর্চা করেছিলেন বলে জানান কবীর সুমন।
সুমন বলেন, '৭৩ বছর বয়সে বেঁচে থাকার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো দুই বাংলায় খেয়াল প্রতিষ্ঠা করা।'
১৮ বছর বয়সে আকাশবাণীতে সুমন প্রথম পেশাদার গানের চর্চা শুরু করেন। আজকাল বেশ আনন্দ নিয়ে বাংলা খেয়াল প্রসঙ্গে কাজ করছেন তিনি। এখন পর্যন্ত বাংলা খেয়ালের ওপর লেখা তার দুইটি বইও প্রকাশ পেয়েছে।
আলোচনা শেষে শ্রোতাদের হৃদয়ে খেয়ালের নৌকা ভাসান সুমন। একে একে বেশকিছু গান তিনি পরিবেশন করেন। তার ভারী গলায় খেয়ালের সুর নানা সংটের যাপিত জীবনে ক্লান্ত শ্রোতার অন্তরে যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরল। সুমন প্রথমে গাইলেন, 'এই মোহ আবরণ খুলে দাও/ সুন্দর মুখ তব দেখি নয়ন ভরে'। রবীন্দ্রনাথের গানটি ইমন রাগে বিলম্বিত লয়ে গেয়ে শোনান তিনি।
এরপর তিনি 'দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে' গানটি তিন তালে গেয়ে শোনান। কনসার্ট উপভোগ করতে আসা হাজারো শ্রোতা তখন সুমনের তাল-লয় আর ভরাট কণ্ঠের মায়ায় নিমজ্জিত।এরপর 'অস্তাচলে শেষ হয়' গানটি পূর্ব রাগে পরিবেশন করেন সুমন। তিনি আজাদ রাগে গেয়েছেন গানটি।
যারা সুমনের কণ্ঠে বাংলা খেয়াল শুনবেন বলে এসেছিলেন, তাদের প্রত্যাশা মিটিয়ে দিলেন সুমন গানে গানে। আবার দেখা হবে সেই কথা দিয়ে তিন দিনের আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব শেষ করেন তিনি। আয়োজন শেষ হওয়ার পরও যেন কাটছিল না ঘোর।
আগামী ২১ অক্টোবর আবার একই মঞ্চে উঠবেন গায়ক। সেদিন তিনি গাইবেন আধুনিক বাংলা গান।
৩০ বছর আগে ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামের মাধ্যমে বাংলা গানের জগতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। সেই ধারারা পুরোধা সুমন ১৩ বছর পর ঢাকায় এসেছেন। বিখ্যাত অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ এর তিন দশক পূর্তিতে ‘সুমনের গান’ শিরোনামের এই আয়োজন। যার আয়োজক পিপহোল। শুরু থেকেই বাংলাদেশে তার অগুনতি ভক্তের মধ্যে এই কনসার্ট নিয়ে তৈরি হয় তুমুল আগ্রহ। মাত্র দুদিনেই শেষ হয়ে গিয়েছিল সব টিকিট।
তবে এই গানের আসর বসার কথা ছিল জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে। কিন্তু পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় ভেন্যু নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। অবশেষে জাতীয় জাদুঘরের বিকল্প হিসেবে নির্বাচিত হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তন। সেখানে অনুষ্ঠিত সুমনের গানের এই আসর অনলাইনেও উপভোগ করা যাচ্ছে। টিকিট কেটে দেখা যাচ্ছে প্রতি পর্বের লাইভ স্ট্রিমিং।
এর আগে কবীর সুমন শেষবার ঢাকায় এসেছিলেন ২০০৯ সালের অক্টোবরে। তখন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গান পরিবেশনে বাধা পেয়ে কলকাতায় ফিরেছিলেন তিনি। মধ্যে এক যুগ কেটে গেলেও আর ঢাকায় আসেননি। এক সাক্ষাৎকারে অভিমানের সুরে বলেছিলেন, বাংলাদেশে আর কখনও আসবেন না তিনি। অবশেষে মান ভুলে আবারও ঢাকায় গাইতে এলেন। আর গাইতে গিয়ে শ্রোতাদের মন মজিয়ে দিয়েছেন এই কিংবদন্তি।
প্রবা/এসএস/এলএ/আআ