প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৩ ১৩:০৫ পিএম
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে তাকে সেভাবে দেখা যায়নি। কিন্তু তিনি ছিলেন সিনেমার অন্যতম অংশ। গৌণ চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি দর্শকদের কাছে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন। তিনি খ্যাতিমান অভিনেত্রী রওশন জামিল। ২০০২ সালের আজকের এই দিনে (১৪ মে) মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি। রওশন জামিল ছিলেন একাধারে নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী।
১৯৩১ সালের ৮ মে ঢাকার রোকনপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় লক্ষ্মীবাজার সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারি স্কুলে। পরে তিনি ইডেন কলেজে পড়াশোনা করেছেন।
শৈশবেই রওশন নাচের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নৃত্যানুশীলন শুরু করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে নাচের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণকালে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যকলার শিক্ষক প্রয়াত গওহর জামিলের সঙ্গে তার পরিচয় থেকে প্রেম হয়। গওহর ধর্ম বদলে মুসলিম হওয়ার পর ১৯৫২ সালে তাকেই বিয়ে করেন রওশন জামিল। তারা ছিলেন ২ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক-জননী।
এদেশে নৃত্যশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে এই শিল্পিযুগল অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই দম্পতি মিলে ১৯৫৯ সালে রাজধানীর স্বামীবাগে প্রতিষ্ঠা করেন নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘জাগো আর্ট সেন্টার’। সেটি এখনও চলমান। প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী এখানে নাচের ওপর শিক্ষা নিচ্ছে।
নৃত্যশিল্পী হলেও একজন অভিনেত্রী হিসেবেও রওশন জামিল সর্বজনশ্রদ্ধেয়। এ দেশে যখন ছেলেদের মেয়ে সেজে মঞ্চে অভিনয় করতে হতো, সেই তখনই (১৯৫২ সালের দিকে) রওশন জামিল জগন্নাথ কলেজে মঞ্চায়িত শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নাটকে অভিনয় করেন। তিনি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেরও মডেল হন।
আর ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনে ‘রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রওশন জামিলের অভিনয় জীবন শুরু হয়। বিটিভির ‘ঢাকায় থাকি’ এবং ‘সকাল সন্ধ্যা’ ধারাবাহিক নাটকের অভিনয় তাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে।
অন্যদিকে ১৯৬৭ সালে আরব্য রূপকথা ‘আলি বাবা চল্লিশ চোর’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা করেন রওশন জামিল। বাকিটুকু ইতিহাস। চলচ্চিত্রে অভিনয়ে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। অভিনেত্রী হিসেবে তিনি নতুন একটি স্টাইল নির্মাণ করেন। তাই সবার মধ্য থেকেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। কোমল কঠিন সব চরিত্র দিয়েই তিনি দর্শকের মন মাতিয়েছিলেন।
তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে গোরী, গীত কাঁহি সংগীত কাঁহি (উর্দু), মনের মত বউ, জীবন থেকে নেয়া, তিতাস একটি নদীর নাম, সূর্য সংগ্রাম, গোলাপী এখন ট্রেনে, আবার তোরা মানুষ হ, ওরা ১১ জন, মাটির ঘর, সূর্য দীঘল বাড়ী, দেবদাস, রামের সুমতি, জননী, নয়নমণি, জীবন মৃত্যু, মিস ললিতা, নদের চাঁদ, মাটির কোলে, বাঁধনহারা, দহন ইত্যাদি এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী, পোকামাকড়ের ঘরবসতি ও লালসালু অন্যতম।
রওশন জামিল একমাত্র অভিনেত্রী, যিনি একাধারে জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, শেখ নিয়ামত আলী, আমজাদ হোসেনের মতো কিংবদন্তি পরিচালকদের ছবিতে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।
সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য রওশন জামিল দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার ও তারকালোক পুরস্কার। আর নৃত্যে তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
আজীবনের এই সংস্কৃতি কর্মী আজ দেহ নিয়ে আমাদের মাঝে না থাকলেও তার জীবন ও কর্ম রয়ে গেছে অনুপ্রেরণার বিরাট মানচিত্র হয়ে। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন তিনি। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নাচ, আমাদের অভিনয় এবং চলচ্চিত্রে অমর হয়ে থাকবেন তিনি।