মাহমুদা বিশ্বাস
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
ডিজিটাল প্লাটফর্মে একের পর এক থ্রিলার সিরিজ এলেও সব গল্প যে একই ছন্দে এগোয়, তা নয়। রহস্য, সাংবাদিকতার অনুসন্ধান, অপরাধজগতের অন্ধকার আর হালকা হাস্যরসÑ এই চার উপাদানকে এক সুতোয় গেঁথে দর্শকদের জন্য ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে হইচই অরিজিনাল সিরিজ ‘হেডলাইন’। সালেহ সোবহান অনীম পরিচালিত আট পর্বের এই সিরিজে জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, ইয়াশ রোহান, আফসান আরা বিন্দু ও সারিকা সাবরিনের অভিনয় যেমন গল্পকে এগিয়ে নিয়েছে, তেমনই চিত্রনাট্যের গতি ও উপস্থাপনাও দর্শককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশে ফিরে আসে দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড এক অপরাধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ক্লিন্টন। এত বছর পর তার হঠাৎ দেশে ফেরার পেছনে যে বড় কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, সেটি শুরু থেকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় গল্প। এদিকে একটি গোপন সূত্রের মাধ্যমে ক্লিন্টনের ফেরার খবর পান অনুসন্ধানী সাংবাদিক জহির আহমেদ। বিষয়টি জনসমক্ষে আনতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এই মিশনে তার সঙ্গে যোগ দেন তরুণ সাংবাদিক সামিউল আলম। সত্য উদঘাটনের এই যাত্রা যত সামনে এগোয়, ততই উন্মোচিত হতে থাকে নতুন নতুন রহস্য, ষড়যন্ত্র এবং অপ্রত্যাশিত মোড়।
সাসপেন্স-থ্রিলার ঘরানার গল্পে সাধারণত গাঢ় ও গম্ভীর আবহ বজায় রাখা হয়। তবে ‘হেডলাইন’-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, নির্মাতা সালেহ সোবহান অনীম সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে গল্পকে তুলনামূলক হালকা মেজাজে এগিয়ে নিয়েছেন। রহস্যের পাশাপাশি সংলাপে ছড়িয়ে আছে রসবোধ, আর চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও গল্পকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ফলে সিরিজটি কখনোই অতিরিক্ত ভারী মনে হয় না; বরং রহস্যের সঙ্গে বিনোদনের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চোখে পড়ে।
চিত্রনাট্যের গতি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ ঝরঝরে। প্রতিটি পর্বেই নতুন তথ্য ও ঘটনার সংযোজন দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখে। বিশেষ করে কমিক মুহূর্তগুলো গল্পের টানটান আবহকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে পারিবারিক সম্পর্ককে ঘিরে যে উপকাহিনী রয়েছে, সেটি আরও গভীরভাবে উপস্থাপন করা গেলে আবেগের জায়গাটি আরও শক্তিশালী হতে পারত। একই সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ব্যাখ্যা কিংবা চরিত্রগুলোর পরিণতি আরও সময় নিয়ে দেখানো হলে সমাপ্তিটি আরও সন্তোষজনক হতে পারত।
অভিনয়ের জায়গায় বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। সাংবাদিক জহির আহমেদের চরিত্রে তিনি সংযত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি রেখেছেন। চরিত্রটির দায়িত্ববোধ, অনুসন্ধিৎসু মনোভাব এবং ব্যক্তিগত আবেগÑ সবকিছুই তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে জুনিয়র সাংবাদিক সামিউল আলম চরিত্রে ইয়াশ রোহান ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত। তার কমিক টাইমিং যেমন প্রশংসার দাবিদার, তেমনই অপূর্বর সঙ্গে তার রসায়নও সিরিজের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
অনেকদিন পর আফসান আরা বিন্দু ও সারিকা সাবরিনকে পর্দায় দেখে ভালো লাগে। দুজনই নিজেদের চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সাবলীল অভিনয় করেছেন। ফারহানা হামিদও তার চরিত্রে যথাযথ ছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি চমকে দেয় শিশু শিল্পী দুজনের অভিনয়। স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসী অভিনয়ের মাধ্যমে তারা গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। অন্যদিকে বিশেষ উপস্থিতিতে শ্যামল মাওলার চরিত্রটি সম্ভাবনাময় হলেও সেটিকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা যেত। ক্যামিও চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর উপস্থিতিও গল্পে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।
কারিগরি দিক থেকেও ‘হেডলাইন’ প্রশংসার দাবিদার। ক্যামেরার কাজ, সম্পাদনা, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং সামগ্রিক নির্মাণশৈলীতে একটি পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে রহস্যময় আবহ তৈরি এবং দৃশ্যান্তরের গতি সিরিজের টান বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে।
‘হেডলাইন’ নিখুঁত না হলেও এটি একটি উপভোগ্য ও ভিন্ন স্বাদের সাসপেন্স-থ্রিলার। রহস্য, সাংবাদিকতার অনুসন্ধান, হাস্যরস এবং পারফরম্যান্সÑ সবকিছুর সমন্বয়ে আট পর্বের এই সিরিজ দর্শকদের জন্য বিনোদনমূলক একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।