প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১১:২৭ এএম
দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টসে অনুষ্ঠিত দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুনা লায়লাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়
উপমহাদেশের সংগীত আকাশে উজ্জ্বল এক নক্ষত্র রুনা লায়লা। তার কণ্ঠ শুধু গান নয়, বরং সময়ের স্রোতে ভেসে আসা এক আবেগময় ইতিহাস, যেখানে মিশে আছে প্রেম, বিরহ, আনন্দ আর গভীর মানবিক অনুভূতি। বাংলা, হিন্দি, উর্দুসহ একাধিক ভাষায় তার অসংখ্য গান বহু দশক ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
প্রজন্ম বদলালেও তার গানের আবেদন একটুও কমেনি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। সংগীতকে তিনি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের হৃদয়কে মানুষের সঙ্গে যুক্ত করার এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই কিংবদন্তি শিল্পীকে সম্প্রতি সম্মানিত করা হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘মিনার-এ-দিল্লি’ পুরস্কারে। গত সোমবার সন্ধ্যায় ভারতের দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টসে অনুষ্ঠিত দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। আয়োজকদের মতে, উপমহাদেশীয় সংগীতে রুনা লায়লার অবদান অনন্য এবং তা আন্তর্জাতিক পরিসরেও সমানভাবে সমাদৃত। দীর্ঘ সংগীতজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার তাকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে, যা তার ভক্তদের জন্যও গর্বের এক মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
পুরস্কার গ্রহণের পর মঞ্চে দাঁড়িয়ে রুনা লায়লা তার বক্তব্যে সংগীতের সার্বজনীন শক্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংগীত এমন এক ভাষা, যা কোনো সীমান্ত, জাতি বা ধর্মের ভেদাভেদ মানে না। এটি মানুষে মানুষে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার বন্ধন তৈরি করে। তার মতে, সংগীতের প্রকৃত শক্তি এখানেই-এটি মানুষের মনকে একত্র করে, বিভাজনের দেয়াল ভেঙে দেয় এবং নতুন করে একে অপরকে বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
অনুষ্ঠানে রুনা লায়লার সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ভারতের আরেক প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ঊষা উথুপ। দুই কিংবদন্তির উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও বিশেষ করে তোলে। পরে তারা একসঙ্গে পরিবেশন করেন জনপ্রিয় গান ‘ইস্টিশনের রেল গাড়িটা’, যা মুহূর্তেই দর্শক হৃদয়ে আবেগের ঢেউ তোলে। দুই ভিন্ন ধারার শিল্পীর এই যৌথ পরিবেশনা শুধু সংগীত নয়, বরং দুই সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। পুরো হলজুড়ে তখন করতালির শব্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ, যা অনেকের কাছেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এই পরিবেশনা যেন প্রমাণ করে দেয়, সংগীতের কোনো সীমা নেই। ভাষা, দেশ বা সংস্কৃতির পার্থক্য থাকলেও সুর মানুষকে একই অনুভূতির ভেতর নিয়ে আসতে পারে। রুনা লায়লা ও ঊষা উথুপের এই মঞ্চ ভাগাভাগি তাই শুধু একটি পারফরম্যান্স ছিল না, বরং ছিল এক সাংস্কৃতিক সংলাপ-যেখানে সুর হয়ে উঠেছিল হৃদয়ের ভাষা।
তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তের মাঝেই হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে রুনা লায়লার মৃত্যুর গুজব। মুহূর্তের মধ্যেই খবরটি ছড়িয়ে পড়ায় ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ, বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে তার খোঁজ নিতে শুরু করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে।
তবে এই খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি নিজেই।নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “ আমার চমৎকার ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে, আমার মৃত্যু নিয়ে কিছু অদ্ভুত গুজব ছড়াচ্ছে, কিন্তু আমি স্পষ্ট করে জানাতে চাই যে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ ও ভালো আছি!! আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, এই ধরনের পোস্ট শেয়ার করার আগে তথ্য যাচাই করে নেবেন, কারণ এটি আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। আপনাদের সকলের জন্য রইল অনেক ভালোবাস”।
রুনা লায়লার এই সাম্প্রতিক ঘটনা একদিকে যেমন তার সংগীতজীবনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে তেমনি ডিজিটাল যুগে গুজবের দ্রুত বিস্তারের বাস্তবতাকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। তবে সবকিছুর মাঝেও তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন-সংগীতের মতোই তার উপস্থিতিও মানুষের হৃদয়ে অটুট ও অমলিন।