× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আশা ভোঁসলের প্রয়াণ

সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া

মাহমুদা বিশ্বাস

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১২ পিএম

ভারতীয় সংগীতাঙ্গনের  কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে।

ভারতীয় সংগীতাঙ্গনের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে।

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নামÑ আশা ভোঁসলে। আট দশকেরও বেশি সময় ধরে যার কণ্ঠ ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, সেই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী গতকাল রবিবার ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তার মৃত্যুর খবরে শুধু ভারত নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যার গান শুনে বড় হয়েছে, সেই ‘চিরসবুজ কণ্ঠ’ থেমে যাওয়ায় এক যুগের অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন শিল্পী সমাজ।

শৈশব থেকে সংগীতজগতে যাত্রা

১৯৪০-এর দশকে সংগীতজগতে যাত্রা শুরু করেন আশা ভোঁসলে। শুরুটা সহজ ছিল না। তার বড় বোন লতা মঙ্গেশকর তখনই ভারতীয় সংগীতে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে প্রথমদিকে ছোট বাজেটের চলচ্চিত্রে গান গেয়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয় তাকে। সংগ্রামমুখর সেই সময়েই ধীরে ধীরে তিনি নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠশৈলী গড়ে তোলেন।

১৯৫০-এর দশকে সুরকার ওপি নায়ারের সঙ্গে কাজ তার ক্যারিয়ারে নতুন মোড় আনে। এরপর কিংবদন্তি সুরকার আরডি বর্মণের সঙ্গে তার যুগলবন্দি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে আধুনিকতা ও পরীক্ষাধর্মী সুরের এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে।

বহুমাত্রিক কণ্ঠের অনন্যতা

আশা ভোঁসলে ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি প্রায় সব ধরনের সংগীতে সমান পারদর্শী ছিলেন। ক্ল্যাসিক্যাল, গজল, লোকগীতি, পপ, ক্যাবারেÑ সব ক্ষেত্রেই তার স্বাচ্ছন্দ্য তাকে আলাদা করে তুলেছে। তার কণ্ঠে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইন আঁখো কি মস্তি’Ñ এই গানগুলো আজও কালজয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি শুধু হিন্দি নয়, বহু আঞ্চলিক ও বিদেশি ভাষাতেও হাজারো গান রেকর্ড করেছেন। সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ‘ভয়েস অ্যাডাপটেশন’, যেকোনো চরিত্র বা আবেগে নিজের কণ্ঠকে বদলে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতা।

স্বীকৃতি ও অর্জন

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন আশা ভোঁসলে। তিনি পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ। পাশাপাশি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড তার ঝুলিকে করেছে সমৃদ্ধ। সংগীত সমালোচকদের মতে, তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, বরং ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের বিবর্তনের এক জীবন্ত ইতিহাস।

আশা ভোঁসলের জীবনের অজানা অধ্যায়

মঞ্চে তিনি ছিলেন আলোঝলমলে এক কিংবদন্তিÑ আশা ভোঁসলে। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল দীর্ঘদিনের যন্ত্রণায় ভরা, যেখানে লুকিয়ে ছিল নির্যাতন, মানসিক চাপ এবং কঠিন সংগ্রাম।

রমা শর্মার বই ‘আশা ভোঁসলে : অ্যা লাইফ ইন মিউজিক’-এ তার দাম্পত্য জীবনের অন্ধকার দিকগুলো উঠে এসেছে। অল্প বয়সে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি। বয়সের বড় ব্যবধানের সেই সম্পর্ক শুরু থেকেই অস্থির ছিল বলে জানা যায়। জীবনী অনুযায়ী, তার স্বামী মদ্যপ ছিলেন এবং প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করতেনÑ গর্ভাবস্থার সময়ও, যার কারণে একাধিকবার হাসপাতালে যেতে হয় তাকে।

চরম মানসিক চাপে তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলেও উল্লেখ রয়েছে বইটিতে। তবে অনাগত সন্তানের প্রতি ভালোবাসা তাকে বাঁচিয়ে রাখে। পরবর্তীতে সেই দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে।

আজ তার মৃত্যুর পর আবারও সামনে আসছে সেই লুকানো অধ্যায়Ñ যা এক কিংবদন্তির জীবনের অন্ধকার বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

মৃত্যুর আগে শেষ দিনগুলো

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণের কারণে তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার নাতনি ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘দাদির অবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে, সবাই দোয়া করবেন।’

তবে শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন এবং জানান, মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

শোকের স্রোতে ভারতীয় সংগীতজগৎ

আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে বলিউড ও সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহশিল্পীরা সামাজিক মাধ্যমে আবেগঘন বার্তা দেন।

সুরকার এআর রহমান বলেন, ‘তিনি ছিলেন ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিভা। তার কণ্ঠের বহুমাত্রিকতা বিশ্ব সংগীতে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে।’

গায়িকা আলকা ইয়াগনিক বলেন, তিনি নারী প্লেব্যাক শিল্পীদের জন্য স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন। উদিত নারায়ণ তাকে প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন। সুরকার বিশাল দাদলানি বলেন, ‘এটি একটি যুগের অবসান।’ চলচ্চিত্র নির্মাতা করণ জোহর জানান, ‘বলিউড সংগীতের আবেগের ভিত্তি ছিলেন তিনি।’

শাহরুখ খান তার শোকবার্তায় বলেন, ‘তার কণ্ঠ ভারতীয় সিনেমার এক অমূল্য স্তম্ভ ছিল। তিনি সব সময় আমাকে ভালোবাসা ও আশীর্বাদে ভরিয়ে রেখেছেন।’

তিনি আরও লেখেন, ‘এমন প্রতিভা কখনও হারিয়ে যায় না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মে বেঁচে থাকে।’ এ ছাড়া ভারতের আরও গুণী অভিনয়শিল্পীও সংগীতশিল্পীরা শোক প্রকাশ করেছেন। 

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া

আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনেও নেমে আসে গভীর শোক। বরেণ্য শিল্পী রুনা লায়লা বলেন, ‘পৃথিবীর দুই কিংবদন্তি একের পর এক চলে গেলেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমার পৃথিবীটাই শূন্য হয়ে গেল।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা দুজনেই আমাকে মায়ের মতো স্নেহ করতেন। শেষ দেখা হয়েছিল একটি রেকর্ডিংয়ের সময়। এরপর আর কথা বলা হয়নিÑ এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’

গায়িকা বেবী নাজনীন বলেন, আশা ভোঁসলে ছিলেন সংগীতের একটি প্রতিষ্ঠান। তার সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।

সাবিনা ইয়াসমিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘কলকাতার একটি রেকর্ডিং সেশনে তিনি আমার গান শুনে প্রশংসা করেছিলেন, যা আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।’ এ ছাড়া আরও অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন।

এক যুগের সমাপ্তি

আশা ভোঁসলে ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যার সংগীতযাত্রা কেবল গান নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের বিবর্তনের সাক্ষী। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত তার গান প্রজন্মকে যুক্ত করেছে একই আবেগে।

সংগীত বিশেষজ্ঞদের মতে, তার মৃত্যু শুধু একজন শিল্পীর প্রস্থান নয়Ñ এটি ভারতীয় সংগীতের একটি সোনালি অধ্যায়ের সমাপ্তি।

তার কণ্ঠ হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু অসংখ্য কালজয়ী গান, অসংখ্য স্মৃতি এবং অসংখ্য অনুভূতির ভেতর দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা