সাক্ষাৎকার
মাহমুদা বিশ্বাস
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৭ এএম
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩০ পিএম
ছবি: বাঙলা,জীবন থেকে নেয়া ও ফাগুন হাওয়ায় সিনেমার পোস্টার।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন শুধু একটি অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল না; এটি ছিল বাঙালির জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। অথচ এই ঐতিহাসিক অর্জন নিয়ে আমাদের সিনেমাজগতে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের চল বহুদিনের। এসব সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, বরং দেশ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকে। এমনকি এসব সিনেমা বক্স অফিসেও সফল হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
মাত্র তিনটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র!
বিগত ৭৪ বছরে মাত্র তিনটি সিনেমায় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এসেছে। ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় ‘জীবন থেকে নেয়া’। জহির রায়হান নির্মিত এ সিনেমাটি একমাত্র চলচ্চিত্র যেখানে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এ ছবিতে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি ব্যবহৃত হয়, যা একুশের আবেগ পর্দায় জীবন্ত করে তোলে। ছাত্র আন্দোলন, একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পুলিশি নির্যাতন সবই ছিল এই গল্পের ভেতর।২০০৬ সালে মুক্তি পায় ‘বাঙলা’ সিনেমাটি। শহীদুল ইসলাম খোকনের পরিচালনায় ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। আহমদ ছফার উপন্যাস ‘ওঙ্কার’ অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমায় অভিনয় করেন হুমায়ুন ফরীদি, মাহফুজ আহমেদ ও শাবনূর।
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সালে নির্মিত হয় ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সিনেমা। তৌকীর আহমেদের পরিচালনায় নির্মিত এ সিনেমা টিটো রহমানের গল্প ‘বউ কথা কও’ অবলম্বনে তৈরি। এটি ৪৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্রসহ তিনটি বিভাগে পুরস্কৃত হয়।
এ ছাড়া সরকারিভাবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে ‘হৃদয়ে একুশ’ ও ‘বায়ান্নর মিছিল’ নামে দুটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।
কেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা হয় না?
এমন প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক তানিম নূর বলেন, ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষার মাস। একটা দেশের মানুষের ভাষা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় ছাত্ররা রাজপথে নেমে পড়ে এবং সাধারণ জনগণ ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলন করে আমাদের বাংলা ভাষা মাতৃভাষা রক্ষা করেছিল। এটি আমাদের জন্য খুবই গর্বের একটি মাস। ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক সাহিত্য, উপন্যাস বই লেখা হয়েছে। লেখক, সাহিত্যিকসহ সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে স্মৃতিচারণ করে রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনের অনেক বই পড়েছি। কিন্তু কখনও এভাবে ভেবে দেখিনি যে, ভাষা আন্দোলন নিয়ে কেন সিনেমা নির্মিত হচ্ছে না। অল্প কয়েকটা ছবিতে ভাষা আন্দোলনের গল্প থাকলেও পূর্ণাঙ্গভাবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কোনো সিনেমা নির্মিত হয়নি। ঐতিহাসিক গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমার। ভবিষ্যতে কখনও সুযোগ হলে অবশ্যই আমি ভাষা আন্দোলন বা এরকম ঐতিহাসিক গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে চাই। আমরা যারা পরিচালকরা আছি, সবারই পুরনো দিনের গল্প নিয়ে কাজ করা উচিত। ভাষা আন্দোলন নিয়ে অসংখ্য সিনেমা হতে পারে। শিল্পসাহিত্যে ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময় নিয়ে অনেক গল্প রয়েছে। এ ছাড়া সরকারের উচিত এ বিষয়ে একটু নজর দেওয়া।
এ ছাড়া পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি অনেক ছোট। আমার মনে হয় ভাষা আন্দোলন নিয়ে যে বই উপন্যাসগুলো আছে সবগুলো বইতে একই সামারি লেখা। অনেক তথ্য আমাদের অজানা আছে। এমন কোনো বই বা উপন্যাস নেই যেখান থেকে আমরা একটা সুন্দর সিনেমা নির্মাণ করব।
ভাষা আন্দোলনের মূল চরিত্রগুলো সম্পর্কে আমরা কম জানি। সেই সময়ের চরিত্রগুলোকে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য বাজেটের একটা বিষয় সর্বপ্রথম চলে আসে। কম বাজেটের মধ্যে কীভাবে এ ধরনের সিনেমা বানানো যায় সেই ইউনিকনেস আমাদের মধ্যে নেই। এমন অনেক সমস্যার কারণেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে নতুন কোনো সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে না। তবে যদি কখনও সুযোগ হয়, কোনো বই থেকে এমন গল্প যদি পাই, যেই গল্প দর্শক আগে কখনও শোনেনি বা দেখেনি অবশ্যই আমি সেই গল্পে সিনেমা নির্মাণ করতে চাই।