জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার -২০২৩
মাহমুদা বিশ্বাস
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৫ পিএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:০৪ পিএম
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে ২০২৩ সালটি ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি গল্প বলার ভাষা, নির্মাণশৈলী ও অভিনয়ের গভীরতায় এই বছরটি নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেÑ বাংলাদেশি সিনেমা এখন আর কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে নেই, বরং নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে। সেই সৃজনশীল অভিযাত্রার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২৩ হাজির হয়েছে শিল্পী, নির্মাতা ও নেপথ্যের কারিগরদের সম্মিলিত অর্জনের দলিল হয়ে।
এই আয়োজনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় ছিল আজীবন সম্মাননা। যৌথভাবে এই সম্মাননা পেয়েছেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আবুল লতিফ বাচ্চু। তারেক মাসুদ বাংলা চলচ্চিত্রে মানবিক বয়ান, রাজনৈতিক সচেতনতা ও নান্দনিকতার যে মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন, তা আজও প্রেরণার উৎস। অন্যদিকে আবুল লতিফ বাচ্চু ক্যামেরার ভাষায় গল্প বলার যে গভীরতা দেখিয়েছেন, তা আমাদের চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এই দুই গুণীর স্বীকৃতি যেন পুরো শিল্পের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ‘সাঁতাও’ নির্বাচিত হওয়া ২০২৩ সালের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি। একই ছবির জন্য খন্দকার সুমন পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার। বিষয়বস্তুর সাহস, নির্মাণের সংযম এবং আবেগের গভীরতায় ‘সাঁতাও’ প্রমাণ করেছেÑ বাংলাদেশি সিনেমা আন্তর্জাতিক ভাষায় কথা বলতে পারছে। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ‘মরিয়ম’ এবং প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে ‘লীলাবতী নাগ : দ্য রেবেল’ পুরস্কৃত হওয়ায় বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রচর্চাও শক্ত অবস্থান নিয়েছে।
অভিনয় বিভাগে এ বছর ছিল তারকাখচিত উজ্জ্বলতা। ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (প্রধান চরিত্র) হয়েছেন আফরান নিশো। টেলিভিশন ও ওটিটি থেকে বড়পর্দায় এসে তার এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে, দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি অভিনয়শিল্পেও তিনি পরিণত। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েছেন ‘সাঁতাও’-এর আইনুন পুতুলÑ সংযত অথচ গভীর অভিনয়ে তিনি ছবির আবেগকে বহন করেছেন। পার্শ্বচরিত্রে মনির আহাম্মেদ শাকিল (সুড়ঙ্গ) এবং নাজিয়া হক অর্ষা (ওরা সাত জন) তাদের চরিত্রে আলাদা ছাপ রেখেছেন। খলচরিত্রে আশীষ খন্দকার (অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন) এবং কৌতুক চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিম (সুড়ঙ্গ) পুরস্কৃত হয়ে দেখিয়েছেন, সহায়ক চরিত্রও গল্পের প্রাণ হতে পারে।
শিশুশিল্পী বিভাগে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ ছবির মো. লিমন শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর পুরস্কার পেয়েছে। একই ছবির আরিফ হাসান ও আনাইরা খান পেয়েছেন বিশেষ পুরস্কারÑ যা শিশুদের অভিনয়চর্চাকে আরও উৎসাহিত করবে।
সংগীত ও নৃত্যে ছিল সমান উচ্ছ্বাস। ইমন চৌধুরী (অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন) শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক, হাবিবুর রহমান (লাল শাড়ি) শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক হয়েছেন। গান বিভাগে বালাম (ও প্রিয়তমা : প্রিয়তমা) এবং অবন্তি সিঁথি (গা ছুঁয়ে বলো : সুড়ঙ্গ) কণ্ঠের মাধুর্যে পুরস্কার জিতেছেন। গীতিকার সোমেশ্বর অলী ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদ (ঈশ্বর : প্রিয়তমা) প্রমাণ করেছেন ভালো গান এখনও ছবির শক্তি।
গল্প ও চিত্রনাট্যে ফারুক হোসেন (প্রিয়তমা), নিয়ামূল মুক্তা (রক্তজবা) এবং সংলাপে যৌথভাবে রায়হান রাফী ও সৈয়দ নাজিম উদ দোলা (সুড়ঙ্গ) পুরস্কার পেয়ে দেখিয়েছেন শক্ত লেখাই শক্ত সিনেমার ভিত্তি। কারিগরি বিভাগে সম্পাদনা থেকে চিত্রগ্রহণ, শব্দ, পোশাক ও মেকআপÑ সবখানেই পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি মিলেছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২৩ কেবল প্রাপ্তদের তালিকা নয়; এটি বাংলাদেশের সিনেমার বর্তমান অবস্থান, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার একটি শক্ত ঘোষণা।