বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:২৫ পিএম
কিডনিজনিত সমস্যায় ভুগছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তর সাহা। তিনি ২০১৫ সাল থেকে এ সমস্যায় ভুগছেন। তার কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে বর্তমানে প্রয়োজন ৩০-৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে কিছু টাকা বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে সংগ্রহ করা হলেও সব টাকা এখনও সংগ্রহ হয়নি। শেষ ভিটেমাটি বিক্রি করে চিকিৎসার চিন্তা করছেন তিনি। শুধু অন্তর নয়, এরকম আরও অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে চাঁদা তুলে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করছেন। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু থাকত, তাহলে শিক্ষার্থীদের আরও উন্নতমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যেত।
এ বিষয়ে অন্তর সাহা বলেন, ‘চিকিৎসার পুরো টাকার ব্যবস্থা এখনও হয়নি। ভিটেমাটি বিক্রির চিন্তা করছি, সেটা করতে পারলে ভারতে চিকিৎসা করাতে যাব। চিকিৎসার টাকা ব্যবস্থা করতে আমাকে আমার বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা করেছে। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু থাকত, তাহলে আর্থিকভাবে এত চাপে পড়তে হতো না।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ১৭ বছর পেরিয়েছে। এ ১৭ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে আর্থিক সহযোগিতাও তেমন পাওয়া যায় না প্রশাসনের তরফ থেকে। তবে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-র্কমচারীদের জন্য গত বছরের ১০ নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেড সাময়িক জীবন বীমার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
সম্প্রতি গুগল ফর্মের মাধ্যমে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয় তারা স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আসতে চান কি না? এর মধ্যে ৯৮% শিক্ষার্থী মতামত দিয়েছেন তারা স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আসতে চান।
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাইকুল ইসলাম বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিরভাগ স্টুডেন্টস আছে যারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসে বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল। পড়ালেখা ও থাকা-খাওয়া খরচের পাশাপাশি তাদের ক্যারিয়ারের ডেভেলপমেন্টের জন্য আলাদা কিছু টাকা খরচ করতে হয়। যেটার কারণে আলাদা করে কোনো টাকা তারা ফিজিক্যাল হেলথ বা মেন্টাল হেলথের চেকআপের জন্য রাখতে পারেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অসুখ হলে ভালো ডাক্তার দেখাতে পারে না শিক্ষার্থীরা। ডাক্তার দেখানো ছাড়া ওষুধ নিতে হয়। যেটাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেশি থাকে এবং পাশাপাশি বড় কোনো রোগ হওয়ার শঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ক্যানসার বা বড় কোনো অপারেশনের জন্য যদি বেশি টাকার প্রয়োজন হয় তখন পরিবার থেকে তা বহন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নিয়ে আসা।’
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে শিক্ষার্থী শান্তা মজুমদার বলেন, ‘সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের শতকরা ৮০ ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে। পরিবার ছেড়ে দূরে চলে আসার পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিজে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এমতাবস্থায় তাদের যদি কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা হয় তখন খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।’
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাতুল দাশ বলেন, ‘অনেকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার পরিবারের সামর্থ্য নাও হতে পারে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠানো। কেউ কেউ অনেক বড় রোগে আক্রান্ত হলে সব বিভাগে গিয়ে সাহায্য চাওয়া হয়, কিন্তু সেরকম কোনো বড় অঙ্কের টাকা পাওয়া যায় না। তাই বীমাটি চালু করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর ভর্তির সময় এককালীন ২৭০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন হাসপাতালে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা বীমা সুবিধা পান শিক্ষার্থীরা। তবে কোনো শিক্ষার্থীর বয়সসীমা ২৮ বছর অতিক্রম করলে কিংবা ছাত্রত্ব শেষ হলে এ সুবিধা পাবেন না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ বিভাগে ভর্তিকালীন সময়ে বাৎসরিক ২৫০ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে এই বীমার অন্তর্ভুক্ত হতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য এ বীমা বাধ্যতামূলক। অধ্যয়নরত অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে অথবা ছাত্রত্ব শেষ হলে এ বীমা শেষ হবে।
তবে ঢাবি ও রাবির পর তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবীমা চালু করে, দাবি শিক্ষার্থীদের।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এ ব্যাপারে প্রশাসন ইতিবাচক এবং কাজ চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীরা খুব দ্রুতই সুখবর পাবে বলে আশা করছি। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা চুক্তির জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট কমিটি এবং উপাচার্য স্যারের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া যায়।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন বলেন, ‘এটা নিয়ে আমাদের ইতোমধ্যে কাজ চলছে। আমরা এর মধ্যে প্রপোজাল সংগ্রহ করেছি। আমরা খুব দ্রুত কাজ শুরু করব।’