ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ
দীপক দেব
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১১:৪৯ এএম
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৩:১০ পিএম
ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ শাখার বহিষ্কৃত নেত্রীরা রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয় থেকে বের হয়ে ক্যামেরা দেখে মুখ লুকানোর সেষ্টা করেন। প্রবা ফটো
চলতি বছরের মে মাসে ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তামান্না জেসমিন রীভাকে সভাপতি ও রাজিয়া সুলতানাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৪৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এই কমিটিতে ৩০ জনকে সহসভাপতি, ৫ জনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৭ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয় সেই সময়। এরপর থেকেই বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সমস্যা শুরু হয় ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ নিয়ে। মূলত ঘোষিত কমিটির অনেকে সভাপতি-সম্পাদকের মতো শীর্ষপদে আসতে না পারার কারণেই গত শনিবার দুপক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত বাধে।
ঘটনার সূত্রপাত সভাপতির একটি ফোনকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়ে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ। নতুন কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়, যা চূড়ান্ত রূপ নেয় কয়েক দিন ধরে চলা অস্থিরতা ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, গত শনিবার রাতের মারামারির ঘটনার পর বহিষ্কৃত ১৬ নেতাই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। শীর্ষপদ না পেয়ে তারাই সংগঠনের অন্যদের ‘উসকানি’ দেন।
ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের একাধিক নেতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইডেন কলেজ শাখা কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই সদ্যবহিষ্কৃত অংশটি বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু বহিষ্কৃতদের অধিকাংশই ক্যান্ডিডেট ছিলেন তাই তারা এই কমিটির শীর্ষ নেতাদের বিতর্কিত ও সমস্যায় ফেলতে তৎপর, যা তদন্তেও উঠে এসেছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর রীভা ও রাজিয়ার বিরুদ্ধে ‘সিট বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি’র অভিযোগ এনে সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসের গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর থেকেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এরপর শনিবার রাতে জান্নাতকে ছাত্রীনিবাসের একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করার অভিযোগ ওঠে। এর জেরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একাংশের বিক্ষোভে ইডেন কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা রীভা ও রাজিয়ার বহিষ্কারের দাবি জানান। এরই ধারাবাহিকতায় দুই পক্ষের সংঘর্ষের জেরে রবিবার মধ্যরাতে কমিটি স্থগিত ও ১৬ জনকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।
জানা গেছে, এর আগে ইডেনের সংঘাত নিয়ে তদন্ত করতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তিলোত্তমা শিকদার ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেনজির হোসেন নিশিকে দায়িত্ব দিয়েছিল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। তবে নিশি তদন্ত কমিটিতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে দাবি করেন।
বেনজির হোসেন নিশি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই দফায় আমি তদন্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালন করতে পারব না বলে আগেই কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জানিয়ে দিই। এরপর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে তথ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাই করে ১৬ জনকে বহিষ্কার করেছেন।
সাংগঠনিকভাবে ইডেন কলেজের দায়িত্বে থাকার কারণে অতীতের কিছু ঘটনা নিয়ে তদন্ত করে অনেক কিছু পেয়েছেন দাবি করে নিশি আরও বলেন, অতীতের তদন্তের সময়ও এই গ্রুপটা (বহিষ্কৃত) কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। বিভিন্ন ঘটনার পেছনে এদের সবার একটা যোগসাজশ তখনও পাওয়া যায়। সেগুলো কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জানানো হয়। মূলত কমিটি গঠনের পর থেকেই যারা শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি, তারাই অন্তঃকোন্দল সৃষ্টি করে আসছেন।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন আসন্ন হওয়ায় অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি নন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, পলিটিক্যাল রুমের ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তার হচ্ছে এর পেছনের প্রধান কারণ। ১৬ জনকে এভাবে বহিষ্কার করায় তারা জয় ও লেখকেরও সমালোচনা করেন। তারা বিষয়টাকে আগেই থামাতে পারতেন বলে মনে করেন ওই দুই নেতা।
এদিকে কেন্দ্রের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলন করে আমরণ অনশনের ঘোষণা দেন সদ্যবহিষ্কৃতরা। দুপুর সাড়ে ১২টায় অনশনের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান ১২ নেত্রী। এ সময় ফটকে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে তারা কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর বের হয়ে আসেন।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, এটা আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, ছাত্রলীগের নয়। দলীয় সভাপতির কার্যালয়ের পবিত্রতা রক্ষা করার দায়িত্ব সকলের। এজন্য এখানে কোনো ধরনের হট্টগোল না করার পরামর্শ দিয়ে তাদের চলে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
এরপর ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেত্রীদের সঙ্গে সেখানেই কথা বলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আবদুল আউয়াল শামীম। তিনি বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করবেন বলে আশ্বস্ত করলে তারা অনশনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ও ধানমন্ডি অফিস ত্যাগ করেন।
জানতে চাইলে আবদুল আওয়াল শামীম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তাদের বলা হয়েছে এটা ছাত্রলীগ অফিস না, এটা দলীয় সভাপতির কার্যালয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বলে সমাধান করার চেষ্টা করা হবে বলে তাদের বোঝানো হয়েছে। এরপরেই তারা চলে যান।
আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসার সময় অনশনের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমরা অনশন বাতিল করেছি। এখন আমাদের নতুন কোনো কর্মসূচি নেই।
এদিকে কমিটির কার্যক্রম স্থগিত ও ১৬ জনকে বহিষ্কারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এক সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানানো যাচ্ছে যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ইডেন মহিলা কলেজ শাখার সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করা হলো। সেই সাথে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার অপরাধে প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোনালি আক্তার, সুস্মিতা বাড়ৈ, জেবুন্নাহার শিলা, কল্পনা বেগম, জান্নাতুল ফেরদৌস, আফরোজা রশ্মি, মারজানা উর্মি, সানজিদা পারভীন চৌধুরী, এসএম মিলি, সাদিয়া জাহান সাথী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা খানম বিন্তি ও সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার বৈশাখী এবং কর্মী রাফিয়া নীলা, নোশিন শার্মিলী, জান্নাতুল লিমা, সূচনা আক্তারকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হলো।
সেই সঙ্গে জানানো যাচ্ছে, অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে এই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের যারা জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’