সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩ ১৬:৪৩ পিএম
আপডেট : ১০ মে ২০২৩ ১৭:১৩ পিএম
এস তাসাদ্দেক আহম্মেদ। ছবি : সংগৃহীত
পিএইচডি করেননি, অথচ চাকরি নিয়েছেন এই ডিগ্রি দেখিয়ে। এ অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এস তাসাদ্দেক আহম্মেদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন নামের আগে তিনি ‘ডক্টর’ উপাধি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ভুয়া ডিগ্রির অভিযোগ চাউর হওয়ায় হুট করেই সেটি আর ব্যবহার করছেন না। তবে অভিযোগ সামনে নিয়ে আসায় রেজিস্ট্রার নানাভাবে কোণঠাসা করে রেখেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে এক সহকারী অধ্যাপক তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ তুলে চাকরি ছেড়েছেন। এর আগে চাকরি হারাতে হয়েছে কয়েকজন শিক্ষককে।
অভিযোগ উঠেছে, তাসাদ্দেক আহম্মেদ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকার পরও তার জামাই রাবিব কামাল প্রিয়মকে সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং দুই ভাতিজিকে হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, পিএইচডি না করে কোনোভাবেই নামের আগে ডক্টর উপাধি ব্যবহার করা যায় না। আর এ ডিগ্রি জালিয়াতি করে নিয়োগ নেওয়া প্রতারণার শামিল।
‘পিএইচডি শেষ করেননি’ : তত্ত্বাবধায়ক
২০২০ সালের ১২ আগস্ট এস তাসাদ্দেক আহমেদকে গণ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দেয়। ওই নিয়োগপত্রে তার নামের আগে ‘ডক্টর’ লেখা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন চিঠিসহ ইউজিসির ওয়েবসাইটেও তার নামের আগে ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খবির উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে তাসাদ্দেক আহম্মেদ পিএইচডির জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। তার রোল নং ৬২ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১০৭৪। পিএইচডির থিসিসের বিষয় ছিল ‘Extent of Environment Friendly Agricultaral Practices and Farmers, Empowerment through Integrated pest Management (IPM)’। তবে ভর্তি হলেও ওই পিএইচডি তিনি শেষ করেননি।
এ ব্যাপারে তার তত্ত্বাবধায়ক ড. মো. খবির উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তাসাদ্দেক হোসেন আমার অধীনে পিএইচডি শেষ করেননি।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাসাদ্দেক হোসেনের একক আধিপত্যে প্রতিষ্ঠানটিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ক্লাস না থাকলেও তিনি তার ইচ্ছেমতো শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে বসিয়ে রাখেন। তার পিএইচডি জালিয়াতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসায় তিনি কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট উজ্জ্বল আকন্দের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে তাকে বরখাস্তও করা হয়। এরই মধ্যে ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনপ্রিয় শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিতভাবে রেজিস্ট্রার তাসাদ্দেক হোসেনের বিরুদ্ধে হয়রানি ও পিএইচডি জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ তুলে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক চিঠি যাচাই করে দেখা গেছে, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত তাসাদ্দেক আহম্মেদ নিজে পিএইচডি করেছেন বলে দাবি করতেন। বিভিন্ন চিঠিতে তার নামের আগে ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বিষয়টি ভুয়া চাউর হওয়ায় ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে তিনি আর সেটি ব্যবহার করছেন না। ইউজিসির ওয়েবসাইটেও তার নামের আগে ডক্টর পদবি বাদ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ দুর্নীতিতেও যুক্ত রেজিস্ট্রার
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগেও ছিল রেজিস্ট্রারের একক প্রভাব। কোনো বিজ্ঞপ্তি কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা না নিয়েই তিনি রেজিস্ট্রার অফিস, ভিসি অফিস, হিসাব বিভাগ ও ভেটেরিনারি বিভাগসহ নানা অফিসে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে ৩৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। তার ভাতিজা রুবেল মিয়াকে সহকারী হিসাব কর্মকর্তা ও ভাতিজি হুমায়রা আহমেদকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। শিক্ষকতার কোনো অভিজ্ঞতা না থাকার পরও জামাই রাবিব কামাল প্রিয়মকে সরকারি সহকারী অধ্যাপক ও বিবিএ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
এসব প্রসঙ্গে অভিযুক্ত এস তাসাদ্দেক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি পিএইচডি করেছি।’ কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অফিসে আসেন, পিএইচডির কাগজপত্র দেখাব।’ নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘নিয়োগ আমি দেই না। নিয়োগ দেয় ট্রাস্টি বোর্ড।’
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেনের কাছে বিষয়টি মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে এ নিয়ে কথা বলতে বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নলেজে আছে। শুরুতে তার (তাসাদ্দেক হোসেন) অনুরাগীরা ওনার নামের আগে ডক্টরেট লিখতেন। এখন তিনি আর তা লেখেন না।’
পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন না করে নামের আগে ডক্টরেট উপাধি ব্যবহার করা প্রতারণার শামিল কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এই প্রতারণা তিনি করেছেন, নাকি তার অনুসারীরা করেছেন, তা তদন্ত করতে গেলে একাডেমিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাবে না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
ইউজিসির পরিচালক (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) মো. ওমর ফারুখ বলেন, ‘পিএইচডি না করে নামের আগে ডক্টরেট ব্যবহার করা উচিত নয়। এটা তিনি কোনোভাবেই করতে পারেন না। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব।’