ঢাবিতে বিশ্বকাপ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে বড় পর্দায় খেলা দেখতে উপচে পড়া ভিড়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবল বড় পর্দায় উপভোগের লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের পাঁচটি ভেন্যুতে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা এই কর্মসূচি ঘিরে সামনে এসেছে একাধিক বিতর্ক।
স্পন্সর হারানোর আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা মানতে আপত্তি জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ভিড় বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। একইসাথে যথাযথ নিয়ম না মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভিযোগও উঠেছে। বিপরীতে, মাঠভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গত ১৪ জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠ, কবি জসীম উদ্দীন হল মাঠ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল এবং জগন্নাথ হল উপাসনালয়ে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ প্রদর্শনী শুরু করে অ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার। আয়োজনে সহযোগিতা চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সহযোগী হিসেবে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের নোটিশ বাস্তবায়নে আপত্তি
অনিয়ন্ত্রিত বহিরাগত প্রবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা স্বার্থে গত ২৪ জুন বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে বহিরাগত প্রবেশ ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি নোটিশ জারি করে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। নোটিশ মতে, জরুরি সেবা ছাড়া গণপরিবহন ও ভারী যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। খেলা চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে।
তবে নোটিশ জারির পরও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ গ্রুপে সমালোচনাও করছেন তারা। বহিরাগতদের কারণে বিশৃঙ্খলা, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, মাদকসেবন, শব্দদূষণ, শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও তুলেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আয়োজক প্রতিষ্ঠানের একজন জানান, বহিরাগত প্রবেশ সীমিত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল অ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার। তাদের আশঙ্কা ছিল, বহিরাগত প্রবেশ বন্ধ হলে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা প্রত্যাহার করবে। আগামী ৫ জুলাই থেকে ভেন্যুগুলোতে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সেজান মাহমুদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের নোটিশ জারির পরই তিনটি স্পন্সর প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা প্রত্যাহারের কথা জানায়”।
তিনি বলেন, “যেদিন নোটিশ দেওয়া হয়, সেদিনই আমার তিনটা স্পন্সর উইথড্র হয়ে যায়। তারা বলেছে, বাইরের লোক ঢুকতে না পারলে ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। পরে কিছু স্পন্সর ম্যানেজ করা হয়েছে”।
তিনি আরও বলেন, “আমরা তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো টাকা দিব না। নোটিশ বাস্তবায়ন না করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতাদের কাছেও অনুরোধ করেছিলাম। আমার কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। নোটিশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার না হলেও সেটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আয়োজন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। পরে কিছু স্পন্সরকে আবার রাজি করানো গেছে। তারা ৫ তারিখ থেকে ব্র্যান্ডিং করবে”।
এ বিষয়ে ঢাবি শাখা ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক মো. সাইফ উল্লাহ বলেন, “স্পন্সরের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমরা সবসময় বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলাম। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আমি নিজেই প্রক্টরকে ফোন করে অতিরিক্ত তৎপরতার অনুরোধ জানিয়েছিলাম”।
অন্যদিকে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি। তবে তিনি বলেন, “বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে আমাদের চেষ্টা চলমান রয়েছে”।
মাঠ ভাড়া ও বিদ্যুৎবিল পাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
প্রদর্শনী ভেন্যুগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ, বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, স্টল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। বিপরীতে মাঠের ভাড়া বা বিদ্যুৎ বিল পাচ্ছে না ঢাবি।
কবি জসীম উদ্দীন হলের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী, একদিনের জন্য মাঠ ভাড়া ১০০০ টাকা এবং অর্ধবেলার জন্য ৫০০ টাকা। অন্যদিকে টিএসসির পায়রা চত্ত্বরের মাঠের জন্য দিন প্রতি গুনতে হয় ১৫ হাজার টাকা। বর্তমান আয়োজকরা এই নিয়ম অনুসরণ করছে না, সেই হিসেবে বড় অংকের অর্থ হারাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়।
কবি জসীম উদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এস. এম. আরিফ মাহমুদ বলেন, “আয়োজকেরা হলের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেননি। প্রশাসনের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিও হয়নি। শুরু থেকেই অনুমতি ও চুক্তির প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে এত বিতর্ক তৈরি হতো না”।
টিএসসির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ফারজানা বাশার জানান, ছাত্রদল মাঠ ভাড়া নিয়েছে। কোনো ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি। তারা বলেছে আয়োজন শেষ হলে দিবে।
তবে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের প্রাধ্যক্ষ শাহ শামীম আহমেদ জানান, তাদের হল মাঠ ব্যবহারের ভাড়া ইতোমধ্যে আদায় করা হয়েছে এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি অর্থে চুক্তি হয়েছে। তবে পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত বলতে অপারগতা জানান।
বিশ্বকাপ প্রদর্শনীর অনুমতি নিয়ে বিতর্ক
বিশ্বকাপ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। গত ২৬ এপ্রিল কবি জসীম উদ্দীন হলসহ হলপাড়ার পাঁচটি হলের ছাত্রদল নেতারা বড় পর্দায় খেলা প্রদর্শনের অনুমতি চেয়ে প্রক্টর বরাবর আবেদন করে। প্রক্টর আবেদনটি সংশ্লিষ্ট হল কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। আবেদন পত্রটি ছাত্রদল সংবাদ সম্মেলনে প্রদর্শন করে।
তবে সেখানে উল্লেখ রয়েছে জসীম উদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ আবেদনটি গ্রহণ (রিসিভ) করেছেন। অনুমতি সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু বলা নেই। এছাড়া ওই আবেদনে কোনো বেসরকারি আয়োজক প্রতিষ্ঠান বা স্পন্সর কার্যক্রমের উল্লেখও ছিল না।
পরবর্তীতে আয়োজক হিসেবে অ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ার গত ১৪ জুন প্রক্টরের কাছে পৃথকভাবে আবেদন করে। প্রক্টর 'স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে' অনুমোদন করেন। তবে হল প্রশাসনের দাবি, বর্তমান আয়োজক প্রতিষ্ঠান হল প্রশাসনের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ না করেই ১৪ জুন থেকে খেলা প্রদর্শন শুরু করে। ২৮ জুন পরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি আসে। এ্যাথলেট স্পোর্টস গিয়ারকে আয়োজক হিসেবে অনুমোদন দিলে ছাত্রদলের প্রাথমিক আবেদনটি অকার্যকর হয়ে যায় বলে জানায় হল প্রশাসন।
এ বিষয়ে ঢাবি ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক মো. সাইফ উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা স্যারকে জানিয়ে উনার অনুমোদন নিয়েই খেলা দেখানো শুরু করেছি। উনি এখন মিথ্যা বলছেন। উনার অনুমতি না থাকলে তিনি আমাদের আবেদনপত্র অনুমোদন দিয়েছেন কেন? বিষয়টা নিয়ে যখন হল সংসদের সাথে ঝামেলা শুরু হলো, এখন তিনি দায়সারা জবাব দিচ্ছেন”।
চাঁদাবাজির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
কবি জসীম উদ্দীন হল মাঠে বিশ্বকাপ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি ও নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়েছে কবি জসীম উদ্দীন হল সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। গত ১ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসী তামী অভিযোগ করেন, হল সংসদের ভিপি আয়োজকদের কাছে চাঁদা দাবি করেছেন।
তবে অভিযুক্ত স্টাফ আশরাফ উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার কাছে কোনো চাঁদা দাবি করেনি। তবে আমাকে কল করে জানায় হল মাঠের ভাড়া ও চারপাশে হল থাকায় শব্দদূষণ হয় এগুলো নিয়ে হল সংসদ ও হল প্রশাসন আলোচনায় বসতে চায়”।
পরদিন পৃথক সংবাদ সম্মেলনে হল সংসদ পাল্টা অভিযোগ করে জানায়, ছাত্রদল হল প্রশাসনের অনুমতি ও নিয়ম না মেনে মাঠ ব্যবহার করেছে এবং মাঠ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে কোনো সমঝোতা করেনি। একই সাথে প্রদর্শনীস্থলের দোকান বসিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও তোলে তারা।
এ বিষয়ে দোকানি রতন জানান, টিএসসির একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দোকান বসিয়েছেন তিনি। সে ভাড়া বাবদ দৈনিক তিন হাজার টাকা দাবি করে। তবে তিনি এক হাজার টাকা করে পরিশোধ করেছেন। তবে ওই ব্যক্তি কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।
যা বলছে প্রশাসন
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমুজাদ্দেদি আলফেসানীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়গুলো প্রক্টরের অফিস থেকে দেখভাল করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রক্টর ভালো জানবেন”।
প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন বলেন, “ছাত্রদল আমার কাছে আবেদন দিলে আমি সেখানে লিখে দেই যে স্ব স্ব হল কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে অনুমোদিত। আমি তো অন্যের জিনিস ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারিনা”।
বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের ক্যাম্পাস এমন একটা জায়গায় অবস্থিত, যেখানে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব ব্যাপার। ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা গেছে। এখন আমরা চাইলে সে রাস্তা বন্ধ করতে পারবো না। এখানে কার স্পন্সর থাকলো গেলো সেটা আমাদের দেখার বিষয় না। আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি”।