মাহরিব বিন মহসিন, ঢাবি
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬ ১৮:৪৪ পিএম
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৮:৫৭ পিএম
বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলের পানিতে মানদন্ডের চেয়ে ৯৭ গুণ বেশি মাত্রার ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিত পাওয়া গেছে।
হল সংসদের প্রকাশিত ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, হলের ডাইনিং সংলগ্ন খাবার পানির ট্যাংকে প্রতি মিলিলিটারে ৪৮ হাজার ৫০০ ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে, যেখানে নিরাপদ মানদণ্ড অনুযায়ী এ সংখ্যা ৫০০-এর নিচে থাকার কথা।
বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে শুক্রবার এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত প্রায় দুই সপ্তাহে হলের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পানিবাহিত সংক্রমণে অসুস্থ হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত ৮৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথমে হল প্রশাসনের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান ল্যাবে বিভিন্ন পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সেখানে ডাইনিং হলের পাশের খাবার পানির ট্যাংকের পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ৩২০০ ব্যাকটেরিয়া, ১৬টি টোটাল কলিফর্ম এবং ৮টি ফিকাল কলিফর্ম পাওয়া যায়, যা পানের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে একই ট্যাংক পরিষ্কার করার পর পুনরায় পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৫০০-এ। যদিও ফিকাল কলিফর্ম শূন্য পাওয়া যায়, তবুও টোটাল কলিফর্ম ও অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে পানিটিকে আবারও অনিরাপদ ঘোষণা করা হয়। পরে ওই ট্যাংক সিলগালা করে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে হল সংসদের পক্ষ থেকে আইসিডিডিআরবিতে পাঠানো পরীক্ষায় হলের নিজস্ব পানির পাম্পের সোর্স ওয়াটারে কোনো ক্ষতিকর কলিফর্ম, ই-কোলাই বা সিউডোমোনাস পাওয়া যায়নি। তবে ইউভি ফিল্টার স্থাপনের পর সংগৃহীত পানির নমুনায় সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়ে।
এছাড়া হল প্রশাসনের পাঠানো আইসিডিডিআর’বির আরেক প্রতিবেদনে ছাদের ট্যাংকের ট্যাপ ওয়াটারে টোটাল কলিফর্ম, ফিকাল কলিফর্ম এবং অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে কলেরা, সালমোনেলা ও শিগেলা জীবাণু পাওয়া যায়নি।
হল সংসদের দাবি, মূল পানির উৎসে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলেও ফিল্টারেশন ব্যবস্থা ও পাইপলাইনের দূষণের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ফিল্টার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণেই শিক্ষার্থীদের এ ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংকট মোকাবিলায় হল সংসদ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তা, ডাক্তার ও ওষুধের ব্যবস্থা, পানির নমুনা পরীক্ষার উদ্যোগ, ফিল্টার পরিষ্কার ও ইউভি ফিল্টার স্থাপন, মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন এবং আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের জরিপ পরিচালনা।
এদিকে পরিস্থিতির দায় নিয়ে প্রশাসনের পদত্যাগ দাবি করেছে হল সংসদ। একইসঙ্গে তারা তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলো হলো— হলের ফিল্টারেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিরাপদ করা, অসুস্থ শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পরীক্ষা ও টিকা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
এ বিষয়ে জানতে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানাকে ফোন দেওয়া হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরে ফোন করতে বলেন। পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, এটা হলো যখন দূষিত পানি খেয়ে ছাত্রীরা অসুস্থ হয় তখনকার রিপোর্ট।
আমরা এর পরপরই ফিল্টারগুলো পরিবর্তন করা, ইউভি ফিল্টার ব্যাবহার এবং পানির ট্যাংকিগুলো পরিস্কার করা সহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। এর পরে আমরা পানি আবার ল্যাবে পাঠিয়েছি। ওই রিপোর্ট পেলে আমরা বুঝতে পারবো পরিস্থিতি কতটা উন্নত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রছাত্রীদের জীবন এই পানির সাথে জড়িত। এটাকে অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইবেই পানি খাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তা অবশ্যই নেবো।
উপ-উপাচার্য বলেন, আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের মাধ্যমে বিএসটিএর সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলগুলোর পানিও আমরা পরিক্ষা করছি। যাতে অন্য কোথাও এমন ঘটনা ঘটার আগেই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারি।