মাহরিব বিন মহসিন, ঢাবি
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:২৫ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী সামি আহমেদের জীবনে ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর দিনটি ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো। সেদিন এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। এরপর দীর্ঘ দশ মাস তাকে পায়ে রড বসানো অবস্থায় কাটাতে হয়েছে—ব্যথা, চিকিৎসা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। বন্ধুদের সহায়তা, পরিবার ও চিকিৎসকদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
২০২৫ সালের আগস্টে শারীরিকভাবে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের টাকা পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনতে হয় ভিন্ন কথা—এক অর্থবছরের চিকিৎসা ব্যয়ের দাবি অন্য অর্থবছরে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। সামির ভাষায়, “তখন আমার কাছে বেঁচে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিষয়। এত ভোগান্তির পরও যদি বীমার সুবিধা না পাই, তাহলে এই বীমার প্রয়োজন কী?”
সামির মতো এমন অভিযোগ অসংখ্য শিক্ষার্থীর। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প চালু হওয়ার কয়েক বছর পরেই প্রশাসনিক জটিলতা, বীমা কোম্পানির গড়িমসি ও বিলম্বে ক্লেইম না পাওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনে বীমার টাকা না পেলে এই প্রকল্প কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে।
জানা যায়, ২০২১ সালে ঢাবি প্রশাসন নিয়মিত সব শিক্ষার্থীকে একটি স্বাস্থ্য ও জীবনবীমা প্রকল্পের আওতায় আনে। সে সময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ভর্তি হওয়ার সময় এককালীন ২৭০ টাকা প্রিমিয়াম প্রদান করে শিক্ষার্থীরা তালিকাভুক্ত বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বীমা সুবিধা পাবেন। তবে কোনো শিক্ষার্থীর বয়সসীমা ২৮ বছর অতিক্রম করলে কিংবা ছাত্রত্ব শেষ হলে এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
উল্লেখ্য, ঢাবিতে স্বাস্থ্যবীমা কার্যক্রমের সূচনা হয় ২০১৮ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদের উদ্যোগে প্রথমে ওই ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হয়। পরে এর ইতিবাচক ফলাফল দেখে আরও কয়েকটি বিভাগে এটি চালু করা হয় এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়।
বর্তমানে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চুক্তিবদ্ধ রয়েছে। প্রতি বছর প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক ৩৩০ টাকা প্রিমিয়াম প্রদান করতে হয়। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বছরে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বীমা সুবিধা পাওয়ার কথা। এর মধ্যে কেবিন বা ওয়ার্ড ভাড়া, হাসপাতাল সেবা, অস্ত্রোপচারজনিত ব্যয়, চিকিৎসকের পরামর্শ ফি, ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিল অন্তর্ভুক্ত।
হাসপাতালে অবস্থানকালীন চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়ার বিধান রয়েছে। এছাড়া বহির্বিভাগে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ দশ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ফি অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি ব্যবস্থাপত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি বাবদ সর্বোচ্চ আটশো টাকা দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে বাস্তবে এই সুবিধা কতটুকু পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বীমার টাকা তোলার আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আবার যে টাকা দেওয়া হয়, সেটা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ইশরাত জাহান নামে এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি তিনবার ক্লেইম করার চেষ্টা করেছেন। প্রথমবার আবেদনই বাতিল করা হয়। দ্বিতীয়বার জমা দেওয়া কাগজপত্রের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “আমার প্রোফাইলের কোনো তথ্যই খুঁজে পাওয়া যায়নি—না বিভাগে, না প্রশাসনিক ভবনে। সবাই একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে।” তৃতীয়বার জমা দেওয়া আবেদনটি এক বছর ধরে ‘প্রসেসিং’ অবস্থায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জয়ন্ত রায় নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, চিকিৎসার কাজে তার প্রায় পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তাকে মাত্র এক হাজার টাকা দেওয়া হয়। তার ভাষ্যে, “ইন্স্যুরেন্স ফি নেওয়ার সময় তো এক টাকাও কম নেয়নি, কিন্তু টাকা দেওয়ার সময় এত কাটছাঁট কেন?”
জে এইচ ইমন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, "পাঁচ মাস আগে ক্লেইম জমা দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো আপডেট পাইনি। বীমা কোম্পানি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ না করায় তারাও শিক্ষার্থীদের অর্থ প্রদান করতে পারছে না।"
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাবির সহকারী হিসাব পরিচালক (স্বাস্থ্য বীমা) মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, আমরা যমুনা লাইফ ইন্সুরেন্সের সাথে যখন স্বাস্থ্যবীমার চুক্তিতে যাই, তখন তারা মোটামুটি ভালোই রেসপন্স করেছিলো। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের চারজন পরিচালকের তিনজনই আটক হয়ে কারাগারে যায়। এরপর থেকে তারা স্বাস্থ্যবীমার টাকা পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে।
তিন বলেন, তারা ঠিকমতো টাকা পরিশোধ না করায় আমরা ২০২৫ এর আগস্টে তাদের প্রিমিয়াম দেওয়া বন্ধ করে দেই। এরপর তারা আমাদের জানায় যে তারা ২০২৫ এর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দাবীকৃত সকল বীমার টাকা পরিশোধ করবে। কিন্তু এখনো তারা সেই টাকা পরিশোধ করেনি।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী ৮ এপ্রিল বীমা কোম্পানির সাথে আমাদের মিটিং আছে। ওই কোম্পানি জানিয়েছে তারা চুক্তি বাতিল করতে চায়। মিটিংয়ে এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ বলেন, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির রিজার্ভ মানি নেই। কোন বীমা কোম্পানির রিজার্ভ মানি না থাকলে তারা বীমার টাকা ঠিকঠাক দিতে পারে না। এটা জানা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত বছর তাদের সাথে চুক্তি রিনিউ করেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, "বীমা কোম্পানি শিক্ষার্থীদের ক্লেইম ঠিকঠাক না দিলেও কতিপয় শিক্ষক ও অথোরিটিকে বিশেষ সুবিধা দেয়। এজন্য রিজার্ভ মানি না থাকা সত্ত্বেও তারা এই কোম্পানির সাথে চুক্তি রিনিউর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।"
স্বাস্থ্যবীমার যাবতীয় প্রক্রিয়া অনলাইন ভিত্তিক করার ক্ষেত্রে ডাকসুর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমরা এটা নিয়ে 'ওয়ান স্টপ মেথড' প্রক্রিয়ার প্রস্তাবনা দিয়েছি। বীমা কোম্পানি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সেলের কাছে শিক্ষার্থীদের তথ্য চেয়েছে। তারা তথ্যগুলো এখনো দিতে না পারায় এটি অনলাইন করা যাচ্ছে না।"
এ বিষয়ে জানতে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা সুশান্ত বাবুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে, তাদের অফিসের নাম্বারে যোগাযোগ করে জানতে চাইলে "ঢাবির সাথে আমাদের চুক্তি স্থগিত আছে, এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না" বলে ফোন কেটে দেওয়া হয়।
সার্বিক বিষয়ে ঢাবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে আমরা যে কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ আছি তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে। এজন্য আমরা তাদের প্রিমিয়াম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এজন্য শিক্ষার্থীদের সাময়িক অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। তাদের সাথে চুক্তি বাতিল করে শীঘ্রই নতুন কোম্পানি নিয়োগ দেওয়া হবে। তখন এ সমস্যা সমাধান হবে।