বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১১:৫৮ এএম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ পিএম
ইবি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমান। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে তার নিজ অফিস কক্ষেই গলা কেটে হত্যা করে একই বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমান। হত্যাকাণ্ডের পর একই কক্ষে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন নিজেও।
বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতির কক্ষে এসব ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসে শোক ও উদ্বেগের ছায়া, একই সঙ্গে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কীভাবে একজন কর্মচারীর হাতে নিজ অফিস কক্ষেই প্রাণ হারালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক- এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবার মনে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জানা যায়, বুধবার ছিল সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমন্বিত ইফতার আয়োজন। সে লক্ষ্যে অনেকেই বিভাগে এসেছিলেন। সময় আনুমানিক সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষ থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে ভবনের নিচে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা অফিস কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা রুমের মেঝেতে আসমা সাদিয়াকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এসময় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলু নিজের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন।
খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়কে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসক আসমা সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সময় ভবনের নিচে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য আসমত আলী বলেন, “আমরা এখানে চারজন মিলে গল্প করছিলাম। হঠাৎ ‘বাঁচাও বাঁচাও’ শব্দ শুনতে পাই। এরপর আমরা দ্রুত ভবনের ওপরের দিকে যাই এবং চেয়ারম্যানের কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করি। দরজা না খুললে সেটি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। ভেতরে গিয়ে দেখি ম্যাডাম রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। আর কর্মচারী নিজেই নিজের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন। পরে আমরা প্রশাসনকে খবর দেই।”
ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), সিআইডি ও র্যাবের একটি দল।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বেতনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়ার সঙ্গে কর্মচারী ফজলুর রহমানের কথা চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী কর্মচারী না হয়ে ডে-লেবার ভিত্তিতে নিয়োগ পেলেও দীর্ঘদিন আগে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিভাগের সভাপতির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন ফজলু। প্রায় এক মাস আগে নিহত শিক্ষকের সঙ্গে ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে’ কর্মচারী ফজলুর রহমানকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। তবে সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে কর্মরত ফজলু এই বদলির আদেশ মেনে নিতে পারেননি। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বলেন, “বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে প্রায় দেড় মাস আগে বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। তবে শুধুমাত্র বদলির কারণে হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে- এটি আমরা ভাবতেও পারিনি।”
অপর শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, “প্রায় আট বছর আগে ফজলু এই বিভাগে যোগ দেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন কারণে মাঝে মাঝে সবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। কখনো নথিপত্র ফেলে দিতেন, অকারণে চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন। এজন্য তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। তবে তিনি দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের কথা বলে সমাজকল্যাণ বিভাগেই থাকতে চাইতেন।”
বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদ বলেন, “ঘটনার সময় আমরা একটি প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। বিভাগের একজন শিক্ষক তখন ডরমিটরিতে চলে যান। বিকাল ৫টায় আমাদের প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার কথা ছিল। তখন বিভাগে অন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী ছিলেন না। সম্ভবত এই সুযোগেই ঘটনাটি ঘটে। ম্যামের রুম আগে থেকে লক করা ছিল না, কর্মচারী ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দেন।”
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ রানা বলেন, “ঘটনার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে পাঠাই। সেখানে চিকিৎসক শিক্ষককে মৃত ঘোষণা করেন। অপরজন চিকিৎসাধীন। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। সেখানে শিক্ষক রুনাকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশের উপস্থিতিতে দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন অভিযোগ ছিল।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পুলিশ ও পিবিআই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত ছাড়া এ ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।”
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, “এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা। ঘটনার সময় কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। চিৎকার শুনে লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দুজনকে উদ্ধার করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কক্ষে থাকা দুজনের একজন অপরজনকে হত্যা করেছেন। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।”