সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:০৯ পিএম
আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ২০:৪৩ পিএম
দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের বহুমূখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিচালিত উড়িরচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রবা ফটো
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়িরচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায় ২১ মাস ধরে কোনো বেতন পাচ্ছেন না। বিদ্যালয়টি উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন উড়িরচরের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রনালয়ের বহুমূখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিচালিত বিদ্যালয়টির নেই নিজস্ব ভবন, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমে এসেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই চরে শিক্ষার অগ্রযাত্রা কার্যত থমকে গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হাসান বলেন, ২১ মাস ধরে শিক্ষকরা বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। এতে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭৫ জন, যেখানে করোনা-পূর্ব সময়ে ছিল ৫০০-এর বেশি।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, করোনার সময় সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। চলতি বছর প্রথমবারের মতো ১৪ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ছয়জন।
বীর প্রতীক কর্নেল মোহাম্মদ দিদারুল আলম ফাউন্ডেশ ২০১২ সালে ‘বীর প্রতীক কর্নেল মোহাম্মদ দিদারুল আলম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এবং এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয়টির সার্বিক উন্নয়নকাজ পরিচালনা করে আসছিলেন।
এ প্রসঙ্গে দিদারুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তার প্রচেষ্টায় প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার অনুদান সংগ্রহ করে স্কুলটির অবকাঠামো উন্নয়ন, পাঠদান ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং পরিবেশগত মানোন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০০-তে। স্থানীয়দের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং স্কুলটি এলাকায় একটি আলোর দিশা হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, শুধু পাঠদান নয়, বিদ্যালয়ের পুকুর ও পাশ্ববর্তী জলাভূমি সংস্কার করে সেখানে মাছ চাষ চালু করা হয়। এর ফলে স্কুলটি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। ভর্তি ফি ও বেতন থেকে প্রাপ্ত আয় এবং মাছ চাষের আয়ের সংমিশ্রণে একটি টেকসই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছিল স্কুলটি।
কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম অভিযোগ করেন, এই স্বনির্ভরতাই হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক সংঘাতের কারণ। তৎকালীন সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন স্কুলের উন্নয়নে তার অনুমতি ছাড়া আমার সহযোগিতা নেওয়া হলো এবং কেন স্কুলটির তার বাবার নামে নামকরণ করা হয়নি। এই প্রসঙ্গে হেডমাস্টারকে তিনি কঠোর ও অপমানজনক ভাষায় তিরস্কার করেন বলে জানতে পারি।
তিনি আরও বলেন, স্কুল অফিসে রক্ষিত ভর্তি ও বেতন বাবদ দুই লক্ষ টাকা রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যায়। স্থানীয় অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে,তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের কিছু দুর্বৃত্ত এই চুরির সঙ্গে জড়িত। হেডমাস্টার চুরির মামলা করতে চাইলেও স্কুল কমিটির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর এতে বাধা দেন। এমনকি থানায় গিয়েও মামলা রুজু করা যায়নি।
শিক্ষা উন্নয়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং সমাজের ধনাঢ্য ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্কুলটির এডহক কমিটির সভাপতি নাজিম উদ্দিন। স্থানীয়রা মনে করেন, এখনই উদ্যোগ না নিলে একটি প্রজন্ম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বে।
এই সংকট নিরসনে উপজেলা প্রশাসন থেকে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারও তাকে এ বিষয়ে জানায়নি। তবে তিনি জোড় দিয়ে বলেন, ‘এই সংকট নিরসনে যে দপ্তরেই যাওয়া লাগুক, আমি সর্বোচ্চ সহায়তা করব।’