পুনঃপ্রকাশ
ফারুক আহমাদ আরিফ ও মাহরিব বিন মহসিন
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:০৮ এএম
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:১৯ এএম
ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান।
জনদাবির কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তরিক বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। তিনি বলেন, এটা কেবল আর আমাদের বিষয় না, এটা জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। সারা দেশ ডাকসুর দিকে তাকিয়ে আছে।
গত মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেন তিনি।
ডাকসু নির্বাচনের আয়োজনীয়তা সম্পর্কে উপাচার্যের ভাষ্য, ডাকসু নির্বাচন ছাত্রদের একটি ব্যাপক দাবি। পরে দেখলাম সারা দেশ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই অর্থে এটি জনদাবি। আমি ব্যক্তিগত এজেন্ডা নিয়ে শখ করে ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করছি না। ডাকসু নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে ৭০টির বেশি বৈঠক করে ৯ মাস ধরে মানুষের সাথে কথা বলেছি। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন মিলে একটি পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেছি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছি।
তার ভাষায়, আমাদের প্রতি ছাত্রদের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। এটি আমাদের একটি বড় শক্তি। মানুষের শুভবুদ্ধির ওপরে আস্থা স্থাপন করেছি। বুকে সাহস নিয়ে মাঠে নেমেছি। আমি সুপারম্যান নই, ম্যাজিক-বুলেটসম্পন্ন কোনো লোক নই। আগামীকাল কী হবে তা জানি না। প্রতিদিন সমস্যায় পড়ছি যতটুকু সম্ভব সকলকে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, আমার পেছনে কোনো ক্ষমতাশীন শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন নেই। কোনো পুলিশ নেই। আমি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছি। তা ছাড়া নির্ভর করছি আমার নিজের আত্মবিশ্বাসের প্রতি। কেননা আমার ব্যক্তিগত ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই।
উপাচার্য বলেন, আমরা দুটি কারণে ডাকসু আয়োজনের দিকে যাচ্ছি। একটা হলো জনদাবি। আরেকটা ডাকসুর মাধ্যমে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চার একটা ক্ষেত্র তৈরি হবে। গণরুম-গেস্টরুম কালচারের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ডাকসু নিয়ে আমরা কোনো লুকোচুরি করব না। যে জায়গায় বাধার সম্মুখীন হবো, সেটা সবার কাছে পরিষ্কার করে দেব। গতকাল (সোমবার) যেটা দেখেছেন, সেটা তো পরিষ্কার। আমাদের শিক্ষার্থীরা আমাদের পাশে আছে। ছাত্র সংগঠনগুলো থেকেও যথেষ্ট সাপোর্ট আমরা পাচ্ছি। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের ডাকসু নিয়ে যে প্রত্যাশাÑ সেটা পূরণ করাই আমাদের দায়িত্ব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল লোকেরা মেরুদণ্ডবান হয়, তখন কেউ তাদের ওপর কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বিগত সময়ে যেটা হয়েছে, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ না করে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত। এখনকার প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। আশা করি, ভবিষ্যতে যারা আসবেন তারাও এমনই হবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থী নীল দলের শিক্ষকরা এখনও কীভাবে বহাল তবিয়তে আছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, যারা বিগত সময়ে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা আছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা খাতে কেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ছাত্র এবং শিক্ষকের সম্পর্কের মধ্যে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে। আগে প্রশাসন ছাত্রদের সাথে প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করত। বর্তমানে এটা অনেকাংশেই পরিবর্তন হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যেটাতে আগে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হতো।
ডাকসুতে ‘অপ্রতিরোধ্য ৭১, অদম্য ২৪’ প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী ফাহমিদা আলমকে গণধর্ষণের হুমকির বিষয়ে উপাচার্য বলেন, যা ঘটেছেÑ সেটা খুবই গুরুত্বর ঘটনা। এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এখানে আচরণবিধি সম্পর্কিত কোনো বিষয় থাকলে সেটা নির্বাচন কমিশন দেখবে।
তিনি বলেন, তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রক্টর অফিস এ বিষয়টি দেখছে। সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগে খুব দ্রুতই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন নেতৃত্বে বন্ধ হবে গেস্টরুম ও গলরুম সংস্কৃতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০তম উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি, ডাকসু নির্বাচন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সঙ্গে।
প্রবা : ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশা কী?
উপাচার্য : ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। এতে গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি বন্ধ হবে। এই নির্বাচনের আয়োজনে আমাদের প্রতি ছাত্রদের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। এটিই আমাদের বড় শক্তি। মানুষের শুভবুদ্ধির ওপরে আস্থা রেখে, বুকে সাহস নিয়ে মাঠে নেমেছি। আমি সুপারম্যান নই, তবে প্রত্যাশা করি সবাই সৎ থেকে যার যার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে।
প্রবা : ডাকসু নির্বাচনে প্রায় প্রতিটি প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। আপনারা কতটা স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করছেন?
উপাচার্য : আমরা তুলনামূলকভাবে অরাজনৈতিক বা কম রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আছি। এটি আমি বেশি ডিপেন্ড করতে চাই না। কেননা আমাকে সকালে জামায়াত-শিবির, দুপুরে বিএনপি ও রাতে আওয়ামী লীগ বলে কেউ কেউ প্রচার চালায়। এগুলো জনে জনে ব্যাখ্যার সময় ও সুযোগ নেই। আমি একটা মিশনে এসেছি। সেটি শেষ হলে চলে যাব। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আমার সম্পর্ক শূন্য। এখন রিটায়ার্ডের দ্বারপ্রান্তে আছি। অতীতে রাজনীতিতে জড়াইনি। নতুন করে রাজনীতিবিদ হওয়ার ইচ্ছাও নেই। আর এ সময়ে যেহেতু তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক প্রভাব কম আছে, তাই ভালো কিছু উদাহরণ তৈরি করতে চাই। যে কেউ রাজনীতি করতে পারেন, তাতে আপত্তি নেই। তবে তার মতাদর্শ অন্যের ওপর জোর-জবরদস্তি করে চাপিয়ে দিতে দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এ অবস্থায় আমরা যদি আর্থিকভাবে কিছুটা সচ্ছলতা অর্জন করতে পারি তাহলে সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। আমাদের লিডারশিপ থাকবে যাদের মেরুদণ্ড শক্ত। আর মেরুদণ্ড শক্ত রাখার প্রধান কাজ হচ্ছে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা।
প্রবা : ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শিক্ষা খাতে কী ধরনের পরিবর্তন বা অগ্রগতি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
উপাচার্য : অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট আমরা সবাই জানি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অবস্থানটা ছিল একটি সেলভেজ অপারেশন। ক্লাস, পরীক্ষা, একাডেমিক কর্মকাণ্ড এবং হলগুলো ভাসমান অবস্থায় ছিল। সেখানে কার্যত কোনো প্রশাসন ছিল না। এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রধান কাজ ছিল একাডেমিক কার্যক্রম চালু করা এবং প্রশাসনিক কাঠামো ফেরত আনা। সেলভেজ অপারেশন হিসেবে ২-৩ মাসের মধ্যে তা করা গেছে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি এক মাসের মধ্যেই করতে পেরেছি। অন্যরা কয়েক মাসের মধ্যে করেছে।
এই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, এটা এমন ছিল না যেÑ আমাদের কাছে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে। সবখানে রুটিনমাফিক কাজকর্ম হচ্ছে। বরং এটি হয়েছে মূলত একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে। সেখানে প্রথমত, একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই অল্প সময়ে সেখানে উচ্চমান অর্জন করেছি, এটা বলছি না, তবে আমরা আমাদের একটি মানে রেখেছি। দ্বিতীয়ত, এবার উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার পদগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম আছে। এসব পদগুলোতে তুলনামূলকভাবে পড়াশোনা জানাদের পদায়ন করতে দেখা গেছে। এটি আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন। তৃতীয়ত, ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে তুলনামূলক যোগাযোগ বেড়েছে। আমরা আগে দেখেছি, প্রশাসন সাধারণত শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করেছে। এবার প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মিলিয়ে যূথবদ্ধ প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এগুলোই বড় সফলতা।
প্রবা : তাহলে ব্যর্থতার বিষয়গুলো?
উপাচার্য : আমরা এখনও গবেষণায় যথাযথ ফোকাস করতে পারিনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটছে, সেটি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। শৃঙ্খলার ব্যাপারটি প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ভারসাম্যপূর্ণ রাখা যায়নি।
প্রবা : অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করেছিল, শিক্ষায় হয়নি। এ খাতে কমিশন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
উপাচার্য : শিক্ষা নিয়ে আমাদের এক ধরনের হতাশা আছে। শিক্ষা নিয়ে এর মধ্যে বেশকিছু একাডেমিক ও এডড্রেসিং সেমিনার হয়েছে। কমিশনের বাইরেও কাজ শুরু করার মতো উপাদান আমাদের রয়েছে। আলাদা কমিশন গঠন করা হবে কি না সেটি সরকারের এখতিয়ার। তবে শিক্ষায় কাজ করার সুযোগ এখনও আছে। সেটি অবশ্যই করতে হবে।
প্রবা : দেশে ১১ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠ্যক্রম পাল্টে যায়, এর সমাধান কী?
উপাচার্য : এক্ষেত্রে বিশেষায়িত বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে, এটি পৃথক থাকা দোষের কিছু নয়। সবাইকে একমুখী হতে হবে বিষয়টি এমনও নয়। তবে এর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য ও সক্রিয়তা বজায় রেখে একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় মূলনীতির সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হওয়া চলবে না, জাতীয় অগ্রাধিকার বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
প্রবা : বিজ্ঞান শিক্ষায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি, এক্ষেত্রে কী করা প্রয়োজন?
উপাচার্য : বাংলা ভাষা বা মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বইপত্র বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। বিজ্ঞানকে আনন্দের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে। এখন যেমন গণিত অম্পিয়ার্ড হচ্ছে সেভাবে। বিজ্ঞান ভয়ের কিছু না, এটি দৈনন্দিন বিষয়। হাসতে খেলতে বিজ্ঞানকে উদযাপন করা যায়Ñ এ অবস্থা তুলে ধরতে হবে। আমাদের ছেলেবেলায় পাড়ায় পাড়ায় বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে উঠেছিল। আমরা সেখানে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করেছি। এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।