ডাকসু নির্বাচন
মাহরিব বিন মহসিন, ঢাবি
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৪৬ এএম
প্রবা ফটো
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস।
গতকাল মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) থেকে শুরু হয়েছে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা, যা চলবে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রচারণার প্রথম দিনই জনসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ, ছাত্র পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা। ভোটারদের হাতে হাতে বিলি করেছেন নিজেদের লিফলেট। এদিন শিবিরের ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এদিকে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সেনা মোতায়েনসহ তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই সঙ্গে সিসিটিভির সামনে ভোট গণনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গতকাল বিকালে ঢাবির ভিসি চত্বরে অবস্থিত স্মৃতি চিরন্তনে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসুর প্রচারণা শুরু করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এ সময় ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি নয় বরং পরিবর্তনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আগামী ডাকসু বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, আমরা সব সময় মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করি। একইভাবে জুলাইকেও আমরা ধারণ করি। আমরা প্যানেল ঘোষণার পর সর্বপ্রথম জুরাইন কবরস্থানে জুলাই শহীদ আনাসের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। একইভাবে আজ আমরা মুক্তিযুদ্ধের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমাদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করছি।
এদিন দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে ডাকসুর প্রচারণা শুরু করে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। এ ছাড়াও সকালেই ক্যাম্পাসে নির্বাচনী ব্যানার-ফেস্টুন টানায় সংগঠনটি।
বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিরোধ পর্ষদের ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস প্রার্থী মো. জাবির আহমেদ জুবেলের নেতৃত্বে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে পর্ষদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। এরপর তারা চারুকলা অনুষদ ও কার্জন হল এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালান।
এ ছাড়া দুপুরের দিকে জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা, জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়াসহ প্যানেলের অন্য সদস্যরা।
সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ নামে একটি স্বতন্ত্র প্যানেল সকালে ক্যাম্পাস এলাকায় প্রচার-প্রচারণা শুরু করে। এই প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী হয়েছেন মো. জামাল উদ্দীন খালিদ।
দুপুর ১২টায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাকসু নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। তাদের মধ্যে আছেন এজিএস প্রার্থী তাহমীদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী জহিন ফেরদৌস জামি ও স্বতন্ত্র সদস্য প্রার্থী সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ।
শিবিরের ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ
গতকাল সকালে শিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ব্যানার টানানোর মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করে ছাত্রশিবির। তবে চারুকলা অনুষদে শিবিরের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের ছবি সংবলিত ফেস্টুন টানানোর পরে সেটা ফেলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ফেস্টুনে শিবির নেতাদের ছবি বিকৃত করে দানব রূপ দেওয়া হয়।
ডাকসুর আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের ক্ষতিসাধন করা যাবে না। তবে এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা এখনও জানা যায়নি।
এ বিষয়ে ঢাবি শাখা শিবির সভাপতি ও প্যানেলের জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদ বলেন, আমরা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাব। এটা ছাত্রলীগের কাজও হতে পারে আবার অন্য কারও কাজও হতে পারে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এটা কারা করছে তা নির্বাচন কমিশনকে খুঁজে বের করতে হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, আমরা এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ : ডাকসুতে প্রার্থী ৪৭১ জন
আসন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী এবারের ডাকসু নির্বাচনে মোট ৪৭১ জন প্রার্থী ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। গতকাল বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. জসীম উদ্দিন এ তালিকা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, নির্বাচনে ২৮ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। এ ছাড়া প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ১০ জন প্রার্থী আপিল না করায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে চূড়ান্তভাবে ৪৭১ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এ ছাড়াও তালিকায় পদভিত্তিক প্রার্থী সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। এবারের ডাকসুতে ভিপি পদে মোট প্রার্থী রয়েছেন ৪৫ জন। এ ছাড়াও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী সংখ্যা ১৯ জন সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রার্থী সংখ্যা ২৫ জন। ডাকসুর সম্পাদক পদগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে নির্বাচন করবেন ১৭ জন। এ ছাড়া কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ১১, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ১৪, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১৯, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ১২ এবং গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ ছাড়াও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১৩, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১২, সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৭, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ১৫, মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক পদে ১১ ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক পদে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পাশাপাশি ডাকসুর ১৩টি কার্যকরী সদস্য পদে সর্বমোট ২১৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা রয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হবে সেনা মোতায়েন
ডাকসুকে কেন্দ্র করে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭টি প্রবেশমুখে থাকবে সেনা পাহারা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশর (ডিএমপি) বরাতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানান, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ভোট গ্রহণের দিন ৮টি ভোটকেন্দ্রে তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে।
সেখানে প্রথম স্তরে থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি সদস্য ও প্রক্টরিয়াল টিম। দ্বিতীয় স্তরে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন থাকবে। তৃতীয় স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশমুখে সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে অবস্থান করবে। এ ছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে এবং ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র সেনা সদস্যরা কর্ডন করে রাখবেন। ভোট গণনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।
পাশাপাশি নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না। নিয়মিত টহল পরিচালনার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। তবে ছাত্রীদের হলগুলোতে কখনোই বহিরাগতরা থাকতে পারেন না। নির্বাচনের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুরোপুরি সিলগালা থাকবে। বৈধ শিক্ষার্থী, অনুমোদিত সাংবাদিক ও নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। যেসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন, তাদের ভোটদানের জন্য বিভিন্ন রুটে বাসের অতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করা হবে। এসব বাস নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
ভোট গণনা হবে সিসিটিভির সামনে
ডাকসু নির্বাচনে সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে ভোট গণনা হবে। বুথ ছাড়া পুরো কেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় থাকবে। গতকাল নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের কনফারেন্স কক্ষে এক বৈঠক শেষে এ তথ্য জানায় ডাকসুর নির্বাচন কমিশন। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনাররা ছাড়াও ঢাবি প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল তুষার, ডিএমপির রমনা জোনের ডিসি মো. মাসুদ আলম, এনএসআইয়ের পরিচালক ফারুক আহমদ, শাহবাগ ও নিউমার্কেট থানার ওসি, বিএনসিসির প্রতিনিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুথ ছাড়া পুরো ভোটকেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে। ভোট গণনাও সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে সম্পন্ন হবে। পাশাপাশি সাইবার বুলিং বা অনলাইনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থিত আইবিএ হোস্টেল, লেদার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, কবি সুফিয়া কামাল হলসহ প্রশাসনিক ও আবাসিক এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ।