রাফিক হারিরি
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৪ ১৩:৫৭ পিএম
পৃথিবীর রহস্যময় গ্রন্থ।
চীনা প্রবাদে বলা আছে- একটি ভালো বই পড়া মানে হলো সুন্দর একটি সবুজ বাগান পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। বই আমাদের শিক্ষা দেয়, তথ্য দেয়, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মাঝে বই হলো মজবুত সাঁকো। একটি ভালো বইয়ের শেষ বলতে কিছু থাকে না। বই নিয়ে দার্শনিক দেকার্ত বলেছেন, ‘ভালো ভালো বই পড়া মানে ফেলে আসা শতাব্দীর বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে কথা বলা আর সভ্যতার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো।’ বই আমাদের যেমন রহস্যের আঁধার থেকে বের করে নিয়ে আসে, একইভাবে বই আমাদের রহস্যের বেড়াজালে জড়িয়েও নিতে পারে। পৃথিবীতে এমন কিছু গ্রন্থ আছে যাদের পাঠ আমাদের অচিন কোনো রহস্যময় ভুবনের মুখোমুখি করে দেবে, আমাদের নিয়ে যাবে অন্য ভুবনে, দাঁড় করিয়ে দেবে অদৃশ্য এক রহস্যময় পর্দার সামনে; যে পর্দা এখনও কেউ তুলে ধরে তার রহস্য আবিষ্কার করতে পারেনি। সে রহস্যময় গ্রন্থের মধ্যে প্রাচীন সুমেরীয় অঞ্চলের কোডেক্স সিরাফিনাস, মধ্য ইউরোপের ভয়েনিক মেনুস্ক্রিপ্ট, রোহঙ্ক কোডেক্স এবং বুক অব সোয়েগা উল্লেখযোগ্য।
ভয়েনিক মেনুস্ক্রিপ্ট : পনেরো শতাব্দীর এ গ্রন্থটিকে দেখলে মনে হয় কোনো উদ্ভিদবিজ্ঞানসংক্রান্ত বই। এ গ্রন্থে লতাপাতা, উদ্ভিদরাজির যে ছবি দেওয়া আছে সেগুলোর উৎপত্তি কোথায় কেউ বলতে পারে না। গ্রন্থের প্রতিটি উদ্ভিদের নিচে অপ্রচলিত এমন ভাষায় কিছু লেখা আছে যার মর্মার্থ আজ পর্যন্ত কেউ উদ্ধার করতে পারেনি। গ্রন্থটির মধ্যে অসংখ্য নগ্ন নারীর দেহ, পাশাপাশি নানা রকম উদ্ভিদের ছবি দিয়ে হয়তো পুনরায় উৎপাদনসংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এসবের অর্থ কী হতে পারে তা এখন পর্যন্ত কেউ পুরোপুরি বলতে পারেনি। পেশাগত কোড উদ্ধারকারীদের ধারণা, এটা অনেক অনেক দূরের কোনো গ্রহ থেকে আগত চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা ভাষায় গ্রন্থটি লেখা। অসংখ্য কোড উদ্ধারকারী গবেষক কয়েক শতাব্দী ধরে নানাভাবে এর মর্মার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। গ্রন্থটি ১৯১২ সালে মধ্য ইউরোপের প্রাচীন ও দুর্লভ গ্রন্থ বিক্রেতা উইলফ্রিড এম ভয়নিকের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। তার নামের সঙ্গে মিল রেখে গ্রন্থটির নামকরণ হয়।

কোডেক্স সিরাফিনাস : ৩৬০ পৃষ্ঠার কোডেক্স সিরাফিনাস গ্রন্থটির উৎপত্তি খুব রহস্যপূর্ণ নয়। ১৯৮১ সালে এ বইটি প্রকাশ করা হয়। এ গ্রন্থটিকে কল্পনাশক্তির বিশ্বকোষ বলা হয়। ইটালিয়ান শিল্পী ও চিত্রকর লুইগি সিরাফিনি এ গ্রন্থটির রচয়িতা। তার মতে, তিনি যখন ছোট ছিলেন এবং লিখতে-পড়তে জানতেন না সে সময় তার চারপাশের জগৎ নিয়ে যে অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা ছিল তা তিনি পুনরায় আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন এ গ্রন্থে। বইয়ের প্রতিটি চিত্র ছোট একটা শিশুর কাছে খুব রহস্যপূর্ণ এবং যে ভাবত নিশ্চয়ই এর কোনো অর্থ আছে, কিন্তু সে অর্থটা কী তা জানত না। ২০০৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনায় তিনি গ্রন্থটির বিষয়ে বলেন, এ গ্রন্থের টেক্সটগুলোর আসলে কোনো অর্থ নেই। তবে গবেষকদের মতে, এ গ্রন্থের ভেতর দিয়ে সিরাফিনি কিছু বলতে না চাইলেও তার অবচেতনে বিশ্বজগৎ সম্পর্কে অতিকল্পনার ভেতর দিয়ে আশ্চর্যরকম অনেক কিছুই বলা হয়েছে। গ্রন্থটির মধ্যে লতাপাতা, উদ্ভিদ, পশুপাখি, খাবার, যন্ত্রপাতি, মানবীয় চর্চাসহ নানা রকম বিষয় নিয়ে আসা হয়েছে।
রোহঙ্ক কোডেক্স : ৪৪৮ পৃষ্ঠার রোহঙ্ক কোডেক্সের রহস্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ তেমন কিছু বলতে পারেনি। উনবিংশ শতাব্দীতে হাঙ্গেরি থেকে নানা রকম চিত্রের এ গ্রন্থটি আবিষ্কার করা হয়। তখন থেকেই মানুষ এ গ্রন্থটি নিয়ে রহস্যের বিভ্রান্তের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ জানে না গ্রন্থটি কে লিখেছে বা কোন ভাষায় লেখা। ২০০ প্রতীকের রহস্যপূর্ণ অক্ষর দিয়ে গ্রন্থটি লেখা হয়েছে। বইয়ের চিত্রের মধ্যে সামরিক যুদ্ধ, ধর্মীয় প্রতীক, খ্রিস্ট, ইসলাম এমনকি হিন্দু ধর্মেরও নানা রকম প্রতীকী চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রন্থটির প্রাচীন উদ্ভব ধারণা করা হয় ভারত কিংবা সুমেরীয় অথবা হাঙ্গেরিতে। তবে এ গ্রন্থের কোড উদ্ধার পর্যন্ত এর রহস্যের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না।

বুক অব সোয়েগা : এলিজাবেথিয়ান গণিতবিদ জন ডি ষোড়শ শতাব্দীতে জাদুবিদ্যার ওপর এ গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন। তারপর দীর্ঘদিন গ্রন্থটি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে। ১৯৯৪ সালে ব্রিটিশ লাইব্রেরি আর্কাইভের এক গবেষক গ্রন্থটি পুনরায় উদ্ধার করেন।
২০০ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটিতে কীভাবে ভূতপ্রেত বশে আনা যায়, কীভাবে জাদু করা যায়, জ্যোতির্বিদ্যার নানা রকম দুর্বোধ্য সূত্রসহ আর অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে গ্রন্থটির মর্মার্থ এখন পর্যন্ত পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ১৫৫১ সালে জন ডি যখন সর্বপ্রথম গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন তখন তিনি অনেক চেষ্টা করেও এর মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারেননি। গ্রন্থটিতে ৩৬টি টেবিলে ৪০ হাজার বর্ণমালা বেশ রহস্যময়ভাবে সাজানো ছিল। ধারণা করা হয় সেগুলো কোনো গোপন কোড রাশিমালা। গ্রন্থটি নিয়ে একটা ভৌতিক কথা প্রচলিত আছে। কেউ যদি এ গ্রন্থটির গোপন কোড উদ্ধারের চেষ্টা করে তাহলে সে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে মারা যাবে। গ্রন্থটির গোপন রহস্য উদ্ধারের জন্য ভাষাবিজ্ঞানের ওপর দক্ষ শক্তিশালী কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে।