× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাতের দুইটা ভাত

ধ্রুব এষ

প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৬ ঘণ্টা আগে

রাতের দুইটা ভাত

তিনবেলা একা ভাত খাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খাই। ডিম সিদ্ধ করি, ভাত গরম করি। দরজার নিচ দিয়ে হকার পত্রিকা রেখে যায়। পত্রিকা দেখতে দেখতে ডিম ভাত খাই। সমস্যা হয় না। দুপুরে কার্যোপলক্ষে কেউ না কেউ থাকে। গল্প করতে করতে খেয়ে নিতে পারি। সমস্যা হয় রাতে। বা হয় না। রাতে এগারোটার দিকে ভাত খেতে বসি। তখন একা লাগে, বিমর্ষ লাগে। ড্রোন হামলা দিয়ে অ্যাটেনডেন্ট ধরতে হয়।

নিয়মনিষ্ঠ অধ্যাপক শুভংকর তালুকদার মান্না ঘুমিয়ে পড়ে রাত এগারোটার মধ্যে। এ সময় তাকে ফোন করে জ্বালাই না। খোকন মাস্টার ঘুমায় রাত বারোটা-একটায়। কিন্তু এই শালা একটা ছুচুন্দর বিশেষ। দশভুজা বলে আহ্লাদ বা আদেখলাপনা দেখায় বটে কিন্তু যমিনীর মতো ভয় পায় বউকে। যমের বউ যমিনী না, কিন্তু দশভুজা সাক্ষাৎ যমিনী। হারামজাদা! ঘরে যখন থাকে ফোন দিলে আড়ষ্টভাবে কেবল অ্যাঁ উঁ হ্যাঁ-হ্যাঁ করে যায়। বিরক্তির একশেষ।

সরোদকে ফোন দিতে পারি কেবল সরোদ আইলার ভিত্রে না থাকলে। সরোদের মিসেসের নাম আইলা আমি রাখি নাই। বাপি রেখেছে। আমি সিডরাতুল রেখেছিলাম। সিডর থেকে সিডরাতুল। ২০০৭ সালে দেশে সিডর ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। ২০০৯ সালে আইলা ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। প্রলয়ঙ্করী। সরোদের কোটার বন্ধু আছে সাউÑসিডরাতুল বা আইলার আপন ভাইসে। সাউ ভগিনী খোকন মাস্টারের বুবুজান ইয়োর ওনার। বোলো হরি। হরি বোলো।

শামীমের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, নিয়ম করে এখন খায় দায় ঘুমায়। রাত্রিজাগরণ নিষিদ্ধ হয়েছে। বাপি থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। আমাদের এখানে রাত এগারোটা মানে তার ওখানে ভোর রাত চারটা-পাঁচটা। মানবিকতা বলে একটা ব্যাপার আছে, ঘুমন্ত বাপিকে ফোন কী করে করি? অতএব, থাকে শুধু অন্ধকার/মুস্তফা মাকু আর তুষার। এদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাতে আমি দুইটা ভাত খাই। বুঝিয়ে পড়িয়ে শিখিয়ে নিতে হয়েছে। এই দায়িত্ব তারা না নিলে মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটবে। রাতে আমি ভাত খেতে পারব না, পানি খাব না, নিরম্বু উপবাস দিয়ে পানি ছাড়া ঘুমের ওষুধ ল্যাক্সোটামিল থ্রি চিবিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। সেই পর্যায়ের পাষণ্ড এখনও হয় নাই বলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তারা।

ভাই মাকু, কী করো তুমি?’

ওই তো। খেলা দেখি।

কী খেলা? প্রমিলা রেসলিং?’

প্রমিলা! প্রমিলারে কই পাইলি তুই?’

তোমার যৌবনের প্রমোদসঙ্গিনী প্রমিলার কথা আমি বলি নাই, ভাই মাকু। অনভ্যাসে বিদ্যা নাশ। প্রমিলা শব্দের অর্থ নারী, আমার ভাই।

অ। সেইটা বল। না, প্রমিলা রেসলিং দেখি না। ফুটবল খেলা দেখি। জার্মানি ভার্সাস চেক রিপাবলিক।

লাইভ?’

আরে না--আ। উনিশশ ছিয়ানব্বই সালের ইউরো কাপ ফাইনাল।

এই হলো মাকু।

অ। কত মিনিট খেলা হইছে?’

সাতচল্লিশ মিনিট।

গোউল হইছে?’

এখনও হয় নাই।

কী সর্বনাশ! এখনও গোউল হয় নাই?’

হবে। জার্মানি ২-১ গোউলে জিতবে। এই খেলা আমি আগেও দেখছি।

মাকুর মাকুর মাকু! তোর আর কোনো কাজ নাইরে? যখনই ফোন করি তুই উনিশশো ছিয়াশি সালের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতেছিস, দুই হাজার বারো সালের ইউরো কাপ কোয়ালিফায়িং রাউন্ড দেখতেছিস? সমস্যা কী তোর?’

মর যন্ত্রণা! সমস্যা কী আর? রিটায়ার করছি, করার কিছু নাই।

কেন?’

টেলিভিশনে আর কিছু দেখায় না? নাচগান দেখ। তামিল ছবি দেখ। নাইলে তোর কাকার (খোকন মাস্টার) মতো ন্যাট জিও দেখ।

আমার কাকা ন্যাট জিও দেখে! আমার তো মনে হয় মোবাইল ফোনে বিডি** ছাড়া এই গোলামের বাচ্চা আর কিছু দেখে না।

তোর কাকা, দেখতেই পারে। শত হইলেও তার ভাতিজা তুই হইলি টাউনের পর্নো সম্রাট।

কী? আমি?’

পর্নো সম্রাট, দ্য পর্ন কিং।

ওই তো। আমি পর্ন কিং?’

টাউনের আর একটা মানুষের নাম প্রস্তাব কর তুই। পারভিন বুক হাউস, সোলেমান ভাই, রসময় গুপ্ত তোর মনে নাই মাকু? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি? বয়স তিরাশি এখনও হয় নাই।

ও বাবা। সেইসব বই মনে হয় আমি একলাই পড়ছি?’

তোর মতো কেউ পড়ে নাই। বেগমের রত্নভান্ডারের মতো তোর পর্ন ভান্ডারের বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকার কথা টাউনের হিস্ট্রিতে। মুশকিল হইলো টাউন হিস্টেরিয়ানরা হিস্টোরিয়ায় আক্রান্ত হইছে। তোরে পর্ন কিং লিখতে গিয়া তারা বাংলাদেশের প্রথম পর্নস্টার লিখে দিতে পারে। বিশ্বাস নাই।

বুঝছি। তুই কি ভাত খাইতে বসছিস?’

এতক্ষণে অরিন্দম!

না।

কেন? আরে এগারোটা বাজে তো মনে হয়।

এগারোটা ছাব্বিশ বাজে। সরোদের লগে তোর কথা হয় নাই?’

হইছে তো।

সরোদ তোরে বলে নাই আমি রাইতে আর ভাত খাই না? শুকনা শুকনা চিড়া খাই আর খাঁটি গরুর দুধ বা গরুর খাঁটি দুধ খাই এক গ্লাস। তাও সন্ধ্যায়। সাতটার পর আর দানাপানি গ্রহণ করি না।

তাইলে তুই এখন কী করিস?’

সেলেস্তে : মেইড অ্যাট ইয়োর সার্ভিস দেখি। ফরাসি অ্যাডাল্ট কমেডি। তোর জন্মের কিছুদিন পরে বানানো। সেভেনটি টু-তে। সেলেস্তে ধর হাওয়াপাড়ার সাবিকুন আপা। খুবই ঘরোয়া স্বভাবের মেয়ে। যে ডাকে তার ঘরে যায়। এখানে অবশ্য সেলেস্তের ঘরেই সবাই আসে। বাড়িঅলা, বাড়িঅলার ছেলে, বাড়িঅলার মামা, বাড়িউলিÑ

বাড়িউলি?’

যাজক ঢুকছে এই! সেলেস্তের ঘরে ঢুকছে! রাখ তুই এখন!’

খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, আর কথা বলে কী করব?

ধন্যবাদ হে পর্ন কিং মাকু। রেস্ট ইন পিস। মানে আজকে রাতে তুই শান্তিতে ঘুমা।

পর্ন কিং হলেও মাকু শান্তশিষ্ট গৃহপালিত প্রাণী। রাত-বিরাতে ঘাট আঘাটায় থাকে না। মুস্তফা থাকে। পৌরসভার পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সুপাইভাইজার হিসাবে থাকে। নাইট ডিউটি। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা অধিকাংশ বাংলা মদ খায়। প্রাণ আইঢাই করে মুস্তফার। অর্থাভাব কী অর্থাভাবরে! সুইপার কলোনিতে শেষ কবে গেছে বিস্মরণ হয়েছে মুস্তফার। সুইপার কলোনির ছামুলালের খাঁ খাঁ ঘর নীরবে-নিভৃতে কাঁদে তার জন্য। ছামুলালের ঘরে মদের ড্রাম আছে। হলুদ রঙের ড্রাম। আমি বলেছিলাম মুস্তফাকে সেই হলুদ ড্রামের ভেতর যে কোনো একদিন মৃত অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে। অর্থাভাবে যাহোক সেই সম্ভাবনা রহিত হয়েছে।

মুস্তফা?’

বল রে দাদা।

তুই কই?’

লঞ্চঘাট আসছি। আমি আর জহুর ভাই।

জহুর ভাই! তারে এত রাইতে পাইলি কই তুই? তরংশ্রীপুরের মানুষ না সে?’

সেই জহুর ভাই না রে দাদা, মাথা স্ট্রং জহুর ভাই। নে কথা বল।

জহুর ভাই বলল, ‘ভাই?’

জহুর ভাই! কতদিন পর তোমার গলা শুনলাম। তুমি কেমন আছ? সব ঠিক আছে?’

ঠিকাছে ভাই।

ভেরি গুড! মুস্তফারে দেও।

জহুর ভাই সিজনাল পাগল। গরমের দিনে ভালো মানুষ থাকে, শীতের দিনে পাগল হয়ে যায়। বিএ পা পাগল। মোক্তার পাড়ার ঢালী উকিলের ভাতিজা। ঢালী উকিলও আধপাগল। ফি বার মোটর গাড়ি মার্কা নিয়ে মেয়র ইলেকশন করেন এবং গোহারা হারেন। টাউনের পোলাপান যদিও ফ্রি-তে মিছিল করে দেয়, স্লোগান দিয়ে গলা ফাটায়, ‘এই--, মার্কা আছে রে?’

আছে! আছে!’

কী মার্কা?’

মোটর গাড়ি!’

কী মার্কা?’

মোটর গাড়ি!’

এই-ই বল, উভয় পক্ষের ঝামেলা!’

মোটর গাড়ির ফয়সলা!’

উভয় পক্ষের ঝামেলা!’

মোটর গাড়ির ফয়সলা!’

উভয় পক্ষের ঝামেলা মিটে যায়, মোটর গাড়ির ফয়সলা কোনোদিন হয় না। ইহজনমে হওয়ার না। দেশের এক তরুণ বিখ্যাত কবি, আমাদের টাউনের ছেলে, স্কুলে যখন পড়ত কবিতা লিখে ঢালী উকিলের দাবাড় খেয়েছিল।

মেয়র পদপ্রার্থী ঢালী

ভোট পেয়েছেন আড়াই হালি

তরুণ কবির নাম বলছি না, দাবাড় খেয়ে টাউনের পশ্চিম বাজার পার হয়ে আফ্রিকাচলে গিয়েছিল সে। আমাদের টাউনে আফ্রিকাআছে। নিরীহ মানুষজন আর কি আফ্রিকা বলে টাউনের বিশেষ একটা অঞ্চলকে। চুপেচাপে বলে।

লঞ্চঘাটে জেটি আছে এখনও?’

মুস্তফা বলল, ‘আছে।

লঞ্চ ছাড়ে?’

মাঝে মইধ্যে ছাড়ে। সাচনা বাজার যায়, মোহনগঞ্জ যায়।

দোকান পাট সব আছে।

না। চা-নাস্তার দোকান আছে চাইর-ছয়টা। মমিনের কথা মনে আছে তোর? আমরা মমিনের দোকানে বসছি। পরোটা, ভাজি আর ডিম মামলেট খাইলাম। এখন চা খাই।

খা।

তোর খাওয়া শেষ?’

শেষ।

অ। তোর ফোনে তো বিকাশ নাই, হ্যাঁ?’

না, নাই।

এত রাইতে বিকাশের দোকানও খোলা নাই?’

না।

আইচ্ছা তুই এত চিন্তা করিস না, বিকাশের দোকান সকালে খুলব।

আইচ্ছা, সকালেই কত, চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা তোরে বিকাশ করে দিতেছি।

ষোল্লো হাজার কোটি টাকা দিসরে দাদা। কাটারির নাম হইছে এখন ইন্টেরিম। সেরা জিনিস। টান দিলে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী-নোবেল বিজয়ী লাগে নিজেরে। রোল দুই হাজার কোটি টাকা রাখে।

এইটা কোনো ব্যাপার? আমি বিকাশের দোকান খুলে তোরে বিকাশ করে দিতেছি এখনি। নাকি বিট কয়েনে নিবি? ঢগা সিদ্দিক বিট কয়েন রাখে?’

আমি দিলে রাখব।

কারণ তুই হইলি ...

ডন মুস্তফা ডিং ডিং।

সে হলো ডন মুস্তফা। ডিং ডিং হলো ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর।

ঢগা সিদ্দিক মাদক বিক্রেতা। ভিটাবাড়ি আছে কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থে হয়তো জগন্নাথবাড়ি রোডের আল হেরা বোর্ডিঙে থাকে। পশ্চিম বাজার পার হয়ে তেঘরিয়ায় এক বউ আছে। লম্বাহাটিতে এক বউ আছে। দুই বউ মাসান্তে একবার সম্মিলিতভাবে ধরে ঢগা সিদ্দিককে। আল হেরায় হানা দিয়ে খাবলে খুবলে যে যা পারে নিয়ে যায়। বিপর্যস্ত ঢগা সিদ্দিক তার দুঃখের কথা বলে মামাকে, ‘বেটিমানুষ! তারা আমার আন্ডারপ্যানের ভিত্রে হাত দেয় মামা!’

কত বড় অপমান। ঢগা সিদ্দিকের মামা দুঃখে জর্জরিত হয়, ‘তোমার আন্ডারপ্যান্টে পকেট আছে, মামা?’

কসম মামা! পকেটঅলা আন্ডারপ্যান আমি পরি না!’

কত বড় দুঃখ। ঢগা সিদ্দিকের মামা মুস্তফা দুঃখে বাকরহিত হয়ে থাকে। মুস্তফার একটা লাল আন্ডারপ্যান্ট আছে। সেটারও পকেট নাই।

আচ্ছা, আমি এখন ওষুধ খাব। তুই রাখ।

খা রে দাদা। ওষুধ খা। মরে যাইস না।

এভাবে। যদি মন মুড ভালো থাকে মুস্তফার। যদি মন মুড ভালো না থাকে?

মুস্তফা?’

পরে কথা বলি রে দাদা।

তুই কই?’

পৌরসভা অফিসে।

অ। থাক।

তুষারের এত জায়-ঝামেলা নাই। তুষার না বলে মার্কামারা বলি। বলতে সুবিধা। মাকুর পর মার্কামারাও রিটায়ার করেছে। মাস দুয়েক হলো। এখন তারও কিছুই করার নাই।

এই তুই কী করিস রে?’

চুল রং করিরে দাদা।

চুল রং করিস মানে?’

এই তো চুলে রং লাগাই। লাল রং লাগাই। কী করব, করার কিছু নাই।

করার কিছু নাই বলে তুই চুলে রং লাগাবি নাকি? আবার লাল রং! তোর মাথায় চুল কয়টারে, এই? সতেরো-আঠারোটা। এই কয়টা চুলে তুই লাল রং লাগাইতেছিস? ঘরে লাগানোর আর কিছু নাই?’

এহ্! আমি তাকে ভিডিও কল দিতে যাই নাই। তার অবতার কল্পনা করেই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। ওদিকে সুদূর আমাদের টাউনে সেই রাতে সে ঘুমিয়েছিল পরম শান্তিতে। স্বপ্ন দেখেছিল কি না পরদিন সকালে উঠে আর মনে করতে পারে নাইÑসেই সময় পায় নাইÑচোখ খুলে দেখে তার এগারো বছর বয়সী পুত্র গোল গোল চোখ করে তাকে দেখছে।

কী বাবা?’

তুমি এইটা কী করছো বাবা? তোমারে তো মুরগির মতো লাগতেছে।

হলো?

মার্কামারা চুলের রং পরিবর্তন করে কলপ দিয়েছে। আমি এটা নিয়ে অনেক চিন্তা করে দেখেছিÑহোয়াই লাল রং? মার্কামারা আর কোনো রং পায় নাই? নীল রং দিলে কি মার্কামারাকে ময়ূরের মতো লাগত? হলুদ রং দিলে কি ধনেশ পাখির মতো লাগত? অথচ এত চিন্তার কিছু ছিল না। টাউন-কূটনা খোকন মাস্টার যথাসময়ে কূটনামী করেছে, মার্কামারার বউ চুলে লাল রং করে। বৃদ্ধ মার্কামারা তার বিউটিকুইন তরুণী ভার্যাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে।

মার্কামারা বৃদ্ধ? তুই কী রে?’

শুন রে মূঢ়, আমরা বৃদ্ধ না আমরা চ্যাম্পিয়ান।

তোরা কারা? তুই আর তোর দশভুজা? মাকু তো আফসোস করে বলল তার কাকী ডিফিট খাই গেছে। মার্কামারার বউয়ের মতো টাইট-টুইট থাকতে পারে নাই। ঝুলছে বেলুন গাছের ডালে হয়ে গেছে নাকি। কোলবালিশ মনে করে তুই সেই বেলুন ধরে ঘুমাস।

দুরো খাটাশ!’

চার মাস পর রিটায়ার করবে খোকন মাস্টারও। এগারো মাস পর তার দশভুজা। মান্না ও মার্কামারা যৌথভাবে মোবাইল ফোনের ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বলেছে অষ্টাশি লক্ষ টাকা পাবে জামাই বউ। আমি বলেছি আমি এটা ইখতিয়ারের ভাই বখতিয়ারকে বলে দেব।

ইকতিয়ারের ভাই বখতিয়ার? কে এইটা?’, খোকন মাস্টার দিনদুপুরে আমাকে ফোন দিয়েছিল।

আমি, ‘কে এইটা মানে, ইখতিয়ারের ভাই।’

‘ওই তো। কে এইটা?’

‘বখতিয়ার। টেন পার্সেন্ট নেয়। কোনোরকম দরকষাকষি করার সুযোগ নাই। টেন পার্সেন্ট ইজ টেন পার্সেন্ট। নো এইট, নো সেভেন পার্সেন্ট। বখতিয়ার টেন পার্সেন্ট।’

‘তা তো বুঝলাম। আমার সাথে কী সম্পর্ক তার?’

‘টেন পার্সেন্টের। অষ্টআশি লক্ষ টাকার টেন পার্সেন্ট কত?’

‘কিসের অষ্টআশি লক্ষ টাকারে হারামজাদা?’

‘কেন? তুই আর তোর দশভুজা, রিটায়ার করে তোরা অষ্টআশি লক্ষ টাকা পাবি না? মার্কামারা আর ভাই আমারে যৌথ বিবৃতি দিয়া বলছে।’

‘যৌথ বিবৃতি দিয়া বলছে! সেই অষ্টআশি লক্ষ টাকা কি তোর ভাই আর মার্কামারার বাপে দিব রে শালা?’

‘তারা তো আর নাই। হলধর বাবু, সুরেশ বাবু। আছে শুধু টেন পার্সেন্ট অন্ধকার। আর ইখতিয়ারের ভাই বখতিয়ার।’

খোকন মাস্টার ভীতুর ডিম এবং নরমসরম ভীতুর ডিম বিশেষ। মানুষ আর পায় নাই, প্রাণের ভাতিজা মাকুর সঙ্গে গোপনে শেয়ার করেছিল ব্যাপারটা।

‘ও ভাতিজা, বখতিয়ার কে?’

‘বুদ্ধিমান’ মাকু দিনদুপুরে আমাকে কল দিয়েছিল। নিরীহ জিজ্ঞাসা, ‘বখতিয়ার কে রে?’

‘ইখতিয়ারের ভাই।’

‘ওই তো, সে কে?’

‘বখতিয়ার।’

‘মর যন্ত্রণা। বখতিয়ারের আর কোনো পরিচয় নাই?’

‘তোর আর কোনো পরিচয় আছে? তুই আমাদের অতি আদরের মাকু। টাউনের আবালবৃদ্ধবনিতা জানে তুই কে। দেশে লাগছে আকাল/তাও হাসে মাকাল। তুই হলি সেই মাকাল। দ্য মাকু।’

‘বুঝলাম। ইখতিয়ারের ভাই বখতিয়ার কি থ্রেট দিছে নাকি কাকারে?’

‘সেটা কি তোর অনুমতি নিয়া দিলে ভালো হতো মনে করিস?’

‘মর যন্ত্রণা! আমি কি এই কথা বলছি?’

‘বলিস নাই? অ শোন, ইখতিয়ারের ভাই বখতিয়ার থ্রেট দেয় না, টেন পার্সেন্ট বুঝে নেয় শুধু। তোর নাম নাই, মার্কামারার নাম নাই, তোর কাকা আর তার দশভুজার নাম আছে শর্ট লিস্টে। ইখতিয়ারের ভাই বখতিয়ারের কম্পিউটারে সেই শর্ট লিস্ট আছে। আর কিছু?’

চলছে এভাবে। চলবে এভাবে।

আজ ১১ই এপ্রিল শনিবার।

বার কখন যায়। জিরো আওয়ারে? রাত বারোটায় শনিবার রবিবার হয়ে যায়? এখনও তবে রবিবার হয় নাই। ১১টা ১১ বাজে। খেতে বসতে সামান্য দেরি হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে বাপি পাগলা ফোন করেছিল নয়টা চল্লিশে। পাক্কা এক ঘণ্টা সাতাশ মিনিট কথা বলেছে। সরোদের গোষ্ঠী উদ্ধার করেছে নয় বার, আমার আদ্যশ্রাদ্ধ করেছে আটবার।

মাইক্রোওয়েভ ওভেন আছে ঘরে, ভাত তরকারি গরম করে বসলাম। মার্কামারাকে কল দিলাম। রিং হলো, বেয়াদব ধরল না। করে কী সে? কিসে রং দেয়? কল ব্যাক দিল, ‘খাইতে বসছো দাদা?’

‘বসলাম। তুই খাইছিস?’

‘আমি আজ সন্ধ্যায় খাইছি রে দাদা।’

এর কিছুর কোনো টাইম টেবিল নাই। একদিন রাতের খাবার খায় রাত একটায়, একদিন সন্ধ্যায়, একদিন রাত আটটায়।

‘সন্ধ্যায় খাইছিস আর ক্ষুধা লাগে নাই?’

‘এই তো, স্যান্ডউইচ বানিয়ে খাইলাম।’

‘বানিয়ে খাইলি? লাভলী কই?’

‘তারা তো আজ বাসায় নাই রে দাদা। মেজদার বাসায় হরিনাম সংকীর্তন দিছে। অষ্টপ্রহরব্যাপী সংকীর্তন। উনি সেই সংকীর্তনে গেছেন ছেলেমেয়ে নিয়া।’

‘তাইলে তো তোর পোয়াবারো। সাবিত্রীরে কল দিছিস?’

‘হে হে হে! না রে দাদা।’

‘রাইস মিলের মরফিয়ারে?’

মার্কামারা আবার হাসল। আমি যাদের কথা বলছি তাদের অস্তিত্ব বহুকাল আগে ছিল টাউনে। সময় যেহেতু স্থির এখনও আছে।Ñ সাবিত্রী, মরফিয়া কোচিং সেন্টার। সাবিত্রী দশ টাকা। মরফিয়া বিশ টাকা। ঘরের কাপপিরিচ চুরি করে বিক্রি করে মুস্তফা দুইবার বিশ টাকা জোগাড় করেছিল। পরবর্তীকালে কাজী স্যারের মেয়ে টুইটির সঙ্গে একবার প্রেম হয়েছিল মুস্তফার, তারও পরবর্তীকালে মার্কামারার। মার্কামারা আর একটু হলে বিয়ে করে ফেলছিল টুইটিকে। এহ্! মার্কামারার সে কী রোমান্টিক মকারি। মোকাদ্দেম ভাই হস্তরেখা বিশারদ, মার্কামারার হাত দেখা মাত্র আঁতকে উঠে বলে দিয়েছিল, ‘সাতাইশ থেকে একত্রিশ বছর বয়েসের মধ্যে তোমার বিরাট ফাঁড়া আছে ভাই। মহাশনি, মহারাহু তোমারে খাবল দিয়া ধরছে দেখতে পাইতেছি।’

মহাশনি মহারাহুর ফিমেল ভার্সন নিমফো টুইটি। মোকাদ্দেম ভাইয়ের ভাষ্যমতো, ‘খাবল’ দিয়ে ধরেছিল মার্কামারাকে। মার্কামারা একরকম গ্রহশান্তি করিয়ে রক্ষা পেয়েছে সেই ‘খাবল’ থেকে। সম্বন্ধ করে বর্তমান শ্রীমতীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছে। এক মেয়ে, এক ছেলে তাদের। সুখের সংসার। এবং এটা সব মুখপোড়া জানে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। সামান্য মুশকিলÑ এক হাতে সংসার সামাল দেয়, সহকর্মী লাগে শ্রীমতীর। শ্রীমতী সেই সহকর্মী নিয়োগের ক্রাইটেরিয়া ঠিক করে রেখেছে। তাকানো যায় না এমন দেখতে হতে হবে। মাজাভাঙা হতে হবে। বয়স ষাট প্লাস-মাইনাস হতে হবে। মার্কামারা বুঝিয়ে পারে নাই, ‘বুড়াধুরা মানুষ, কাজ কী করবে? শরীরে কুলায়? অল্পবয়স্ক কত মেয়ে টাউনের কত বাসায় কাজ করে।’

মার্কামারা চায় উপকার করতে, শ্রীমতী তাতে যে হাসিটা দেয়, কহতব্য নহে। মার্কামারার নানাপদের আকথা কুকথা মনে আসে। উকিলপাড়ার ভানু বাবু, বনু বাবুর কথা মনে আসে। দুই বাবু, দুই ভাইÑ কত যুবতীকে গৃহকর্মী রেখে সমাজের উপকার করে গেছেন।

‘তুমি কী দিয়া খাইতেছো ভাই?’ মার্কামারা বলল।

‘হিঁদল ভর্তা!’

‘হিঁদল ভর্তা! হিঁদল ভর্তা কে দিয়া গেল ভাই?’

‘বরইফুল। দুপুরে দিয়া গেছে।’

‘বরইফুল দিয়া গেছে! ওরে বাবা! তবে তো ভর্তা বিশাল স্বাদ হইছে।’

‘তা হইছে। তোরে পাঠাব?’

‘কী?’

‘হিঁদল ভর্তা? অনলাইনে তোরে পাঠাই?’

‘হে হে হে। আজকে লিখনের বাসায় গেছিলাম বিকালে। আমি আর ভাই। মুস্তফা শয়তানটারে দেখলাম বহু দিন পর।’

‘নেংটি তোরার লগে যায় নাই?’

‘না। নেংটি তো এখন সকাল বিকাল ফরিদের দরবারে পড়ে থাকে।’

‘অ। তিন ছিনালের মিল এখনও হয় নাই?’

‘বাদ দেও রে, দাদা। যে না থাকার সে এমনেই থাকে না। ** ধরে টেনে রাখলেও থাকে না।’

‘ওরে বাপরে! তোরা কি সতীন? তবে এইটা ভালো আইডিয়া। দেখতে পাইলাম। তুই আর ভাই নেংটির ** ধরে হেইয়ো হেইয়ো করে টানতেছিস।’

‘হে হে হে। নেংটির ** তো ছিঁড়ে যাবে।’

‘ছিঁড়ে গেলে দশভুজা সিলাই করে দিব।’

মার্কামারা হেসে মরে যায়। হরিহর আত্মা এই তিনটা। মার্কামারা, মান্না, খোকন মাস্টার। ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কে একটা সুক্ষ্ম ফাটল ধরেছে ইদানীং। মার্কামারা ও মান্না একজোট আছে, খোকন মাস্টার জোট ছেড়ে ‘বিরোধী শিবিরে’ যোগদান করেছে। ফরিদের দরবারে গিয়ে বসে থাকে। ফরিদের দরবারে ‘সাউ’ যায়, এজন্য পরিত্যাজ্য মনে করে মার্কামারাÑ মান্না জোট।Ñ সেটা আমিও মনে করি। সাউয়ের প্রতি তৃণমূল লেভেলে রাগক্রোধ আছে মার্কামারার। সাউ বিল্ডিং বানিয়েছে, সেই বিল্ডিংয়ে ফ্ল্যাট কিনে তারা একদল মানুষ প্রতারিত হয়েছে। আমি মার্কামারাকে একদিন বলেছি সাউ চুপাকাবরার মতো দেখতে। চুপাকাবরা কী জিনিস মার্কামারা বুঝতে পারে নাই। চুপাকাবরা নেটিভ আমেরিকান কাল্পনিক প্রাণী। গুগলে ইমেজ আছে। মার্কামারাকে সেই ইমেজ শেয়ার করে নিশ্চিত করা গেছে যে, সাউ সেই চুপাকাবরার থ্রি ডি ফটোকপি বটে। সাউয়ের ছবি এআই দিয়ে বানিয়ে ভয় দেখানো যেতে পারে শিশুদের :

হাউ মাউ খাউ

আইলোরে সাউ

‘দশভুজা কিন্তু বিটল আছে রে দাদা। ময়না-দুলালের বউরে বলছে, তালা দিয়া রাখছি তোমাদের দাদারে। চাবি ফেলে দিছি গার্লস স্কুলের পুকুরে।’

‘ভুল করছে।’

‘ভুল করছে? কেন? ভুল করছে কেন বলতেছো তুমি?’

‘ভুল করে নাই? গার্লস স্কুলের পুকুর। গার্লস স্কুলের পুকুরে। গার্লস স্কুলের। গার্লস। নট বয়েজ। হারামজাদা এইদিকে আমারে বলে সে রন জারেমি হইছে। সকালে বিকালে দুপুরে সন্ধ্যায়, দশভুজারে ধরে **য়।’

ভিএইচএস ক্যাসেটের সেই যুগটা। ভিসিআরের যুগ। তার ঘরে ব্লু ফিল্মের শো দিত সাউ। সদলবলে আমরা দেখতাম। রন জারেমি সেই সময়ের স্টার।

মার্কামারা বলল, ‘দশভুজারে ধরে **য়? দশভুজা না দুই বছর আগেই বাতিল করে দিছে হারামজাদারে। ধান্দা-মান্দা না করে বয়েস হয়ে গেছে ইষ্ট দেবতার নাম নিতে বলছে।’

‘অ। আমার এখনও সেই বয়স হয় নাই। তোর হইছে?’

‘উনি তো দীক্ষা নিছেন রে, দাদা।’

‘লাভলী? সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য।’

আমার খাওয়া শেষ হয়ে গেছে।

মার্কামারার ফ্ল্যাটের কলবেল বাজল।

‘দাদা, একটু ধরো।’

মার্কামারা দরজা খুলল।

চিকন পুরুষ কণ্ঠ হতে পারে, নারী কণ্ঠ হতে পারে, মার্কামারাকে কিছু বলল। মার্কামারা নিচুগলায় কিছু বলল। আমার এসব নিয়ে কোনো কৌতূহল নাই। মাকুর আছে। আমি এখন মাকুকে কল দিয়ে বলে দিতে পারি, বউ ছেলে মেয়ে হরিনাম সংকীর্তনে গেছে, মার্কামারা এই সুযোগে মেয়েমানুষ ঢুকিয়েছে ঘরে। নিশ্চিন্ত মাকু তৎক্ষণাৎ তদন্ত কমিটি গঠন করে ফেলবে। এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। কমিটি ফোন করবে সরোদকে, সরোদ সিডরাতুলের ভিত্রে না থাকলে ধরবে। মাকু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দিয়ে বলবে, ‘সমাজ সামাজিকতা গেছে টাউনের।’

মাকুর মাকু!

‘সিকিউরিটি গার্ড ছেলেটারে, দাদা।’ মার্কামারা বলল।

‘অ।’

‘কালকে পানির লাইনে কাজ করবে। সারা দিন পানি থাকবে না, ড্রামে পানি ভরে রাখতে বলল।’

‘ভরে রাখ।’

‘তোমার খাওয়া শেষ?’

‘শেষ। এখন ওষুধ খাব। তুই ড্রামে পানি ভরে রাখ।’

‘আচ্ছারে, দাদা।’

মার্কামারা রাখল। জয়স্তু।

আর কী বলব, এইভাবে রাতে আমি দুইটা ভাত খাই।

কোনো প্রকার রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা আমরা করি না।
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা