শাসকের গুলিতে খুন হওয়া কবি
ভূমিকা ও অনুবাদ: নিজাম বিশ্বাস
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
হোসে রিজাল
হোসে রিজাল (১৮৬১-১৮৯৬) ফিলিপাইনের রাজনৈতিক ইতিহাসের আবশ্যিক পাঠ।
তিনি ছিলেন একাধারে কবি, লেখক, চিকিৎসক এবং বিপ্লবী। উনিশ শতকে স্প্যানিশ শাসনের অধীনে ফিলিপিনো জনগণ যখন সামাজিক বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছিল; রিজালের কলম তখন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের জোরালো কণ্ঠস্বর।
তার দুটি
উপন্যাস নোলি মে টাঙ্গেরে
এবং এল
ফিলিবুস্তেরিসমো ফিলিপাইনের সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় গভীর
প্রভাব ফেলে। এ গ্রন্থ দুটি কেবল সাহিত্যই নয়, একটি জাতির আত্মজাগরণের ভিত্তিস্তম্ভ
রচনা করে; যেখানে রিজাল ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার অন্যায়, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক
ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তার
লেখা ফিলিপিনোদের মাঝে জাতীয় চেতনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্রতর করে তোলে।
স্প্যানিশ ভাষায় রচিত আ লাস ফ্লোরেস দে হাইডেলবার্গ কবিতাটি তার মানবিক ও
সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি সাহিত্য নিদর্শন। জার্মানির হাইডেলবার্গে
অবস্থানকালে রচিত এ কবিতায় তিনি বিদেশি ফুলের মাধ্যমে নিজ দেশের মানুষের কাছে
ভালোবাসা, শান্তি ও শুভকামনা প্রেরণ করেন; এতে বিচ্ছেদের বেদনা, মাতৃভূমির প্রতি
গভীর প্রেম এবং মানবিক সম্পর্কের অনুভূতিগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে।
হোসে রিজাল বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা-সাহিত্য একটি
জাতির মুক্তির পথ। তিনি সরাসরি কখনও সশস্ত্র আন্দোলনে অংশ নেননি, তবে তার চিন্তা ও
লেখনী ফিলিপাইনের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
১৮৯৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ম্যানিলায় স্প্যানিশ শাসকরা
তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু এ মৃত্যু কবিকে নিঃশেষ করতে
পারেনি, বরং একটি জাতির চেতনার প্রতীকে পরিণত করেছে।
নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফিলিপাইনের সরকার হোসে রিজালকে স্মরণ করেছে। তার নামে নামাঙ্কিত হয়েছে অসংখ্য স্থাপত্য, নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য, প্রকাশিত হয়েছে ডাকটিকিট; এমনকি ফিলিপাইনের ধাতব ও কাগুজে মুদ্রায়ও ঘটেছে রিজালের রাজকীয় আবির্ভাব।
হাইডেলবার্গের ফুল
যাও ফুল, যাও মোর দেশে,
ভিনদেশি পুষ্প, উড়ে যাও, উড়ে যাও
আমার বাড়ির মেঠো পথে, যে পথে
হাঁটছে পথিক তুমি তার হাতে গেঁথে যাও,
গেঁথে যাও তার চুলের খোঁপায়,
পথ দেখিয়ে নিয়ে যাও তারে
সেই নীল আকাশের নিচে,
যেখানে আমার সজনেরা থাকেÑ
তাদের বলো এই পথিকের কথা
যে দূর পরাবাসে, ভালোবাসে স্বদেশকে,
তার মন প্রতিক্ষণ জপে সজনেরই নাম।
যাও ফুল, ভিনদেশি পুষ্প হে,
উড়োফুল, যাও যাও উড়ে, গিয়ে বলো
সেদিন প্রত্যুষে তুমি যখন ফুটেছিলে
কোমল পাপড়ি মেলে নেকার নদীর তীরে,
তখন এ বিভুঁইয়ে পথিক
নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল তোমার পানে চেয়ে,
ভাবছিল তার স্বদেশের কথা, সজনের কথা,
বলো তারে, যখন সুবেহের হাওয়া
তোমার সুগন্ধ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল,
তখন সে পথিক তার ভাষায়
গুণগুনিয়ে গাইছিল ভালোবাসার গান।
আরও বলো তারে, মোর সজনেরে,
যখন সূর্য উঠেছিল হাইডেলবার্গের পাহাড়ে,
ঠিক পাহাড়ের চূড়ায় ঝলমলিয়ে,
তার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল উপত্যকায়,
রোদে ঝলমল করছিল বন, মাঠ, লোকালয়;
তখন সেই পরবাসী পথিক সূর্যের দিকে চেয়ে
ভাবছিল এ সুরুজ তার দেশেও বিলায় রোদ।
বলো, মোর সজনেরে এ কথাও বলো তুমি
তোমাদের সে তুলেছে সংগোপনে
পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষের পাশ থেকে,
হাইডেলবার্গ দুর্গের জীর্ণ দেয়ালের
পাশ থেকে।
তোমরা কেউ কেউ ফুটেছিলে নেকার নদীর তীরে
কোনো নীরব বনে দোল খাচ্ছিলে বাতাসে,
তোমাদের তুলে এনে যত্ন করে
বইয়ের পাতার ভাঁজে ভাঁজে আমি রেখেছি।
যাও ফুল, উড়ে যাও যেমন প্রজাপতি ওড়ে,
পাপড়িতে গেঁথে নিয়ে যাও এ প্রেম
আমার দেশের মানুষের তরেÑ
দেশের লাগি শান্তি বয়ে নিয়ে যাও,
মানুষের কাছে বিশ্বাস বয়ে নিয়ে যাও,
নারীর জন্য পবিত্রতা বয়ে নিয়ে যাও,
সজনের লাগি সুস্বাস্থ্য বয়ে নিয়ে যাও।
যাও হে ভিনদেশি ফুল, যাও উড়ে,
আমার একটি চুমো তুমি সঙ্গে নিয়ে যাওÑ
যখন পৌঁছবে ঠিক আমার বাড়ির মেঠোপথে,
সেই ভেজা মাটির গন্ধভরা বাতাসে
ছড়িয়ে দিয়ো এ চুম্বন, যেন বহুদূর থেকে
আমিও ছুয়ে যেতে পারি তাদের রুক্ষ অধর।
মনে রেখো, ফুল, হাইডেলবার্গের ফুল,
যখন পৌঁছবে মোর দেশে, সহস্র ক্রোশ দূরেÑ
তোমাদের পাপড়ি হয়ে যাবে বিবর্ণ ফ্যাকাশে,
থাকবে না সুগন্ধÑ জন্মভূমি থেকে দূরে গেলে
সুগন্ধি হারিয়ে যায় শরীর থেকে।
(ইংরেজি থেকে
অনুবাদ)