সুহিতা সুলতানা
প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৭ ঘণ্টা আগে
চিত্রকর্ম: মাহমুদুর রহমান দীপন
এই দ্বিপ্রহরে বসে ভাবছি গৃহের তপ্ত হাওয়া ডিঙিয়ে নিঝুম অরণ্যের ভেতরে গিয়ে অচেনা সবুজ বৃক্ষের নিচে ডানা মেলে বসি।
এ রকম রহস্যঘেরা নিঃসঙ্গ দুপুরও কম রোমাঞ্চকর নয়! মানুষ বড় রহস্যময় প্রাণী স্বার্থের বাইরে যেতে চায় না! দেশ, কাল, সময়, সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে বসলে মাথা বড্ড ভারী হয়ে ওঠে আজকাল! বরং অসহ্য বিষয়াদি পাশ কাটিয়ে একটু প্রশান্তির জন্য দূর-বহুদূর চলে যেতে ইচ্ছে করে। মন চায় কখনও কখনও বিশাল সমুদ্রের ওপর দিয়ে হেঁটে ওপারে পৌঁছে যাই! সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় বসে কেউ বাঁশি বাজালে সেটাও শুনতে ইচ্ছে করে।
দেশের
অভ্যন্তরে
ঢুকে
পড়েছে
অসংখ্য ধর্ষক! শিশুদের নিরাপত্তা চরম
অনিরাপত্তার মধ্যে মুখ
থুবড়ে
পড়েছে! মানবতার
আর্তনাদ কেউ শুনতে পারছে
না কেন?
‘একজন শিল্পীর কাছে শিল্প
তকলিফ ছাড়া আর কিছু
নয়,
যেই যন্ত্রণার মধ্য
দিয়ে তিনি আরও যন্ত্রণা
পাওয়ার জন্য নিজেকে মুক্ত
করেন। তিনি কোনো
দানব নন, তিনি শুধু
নিজের অস্তিত্বের মধ্যে
বন্দি কমবেশি উজ্জ্বল পালকযুক্ত
একটি পাখি।’
পাখিরও
কাব্যময়
প্রেমের ইতিহাস থাকে।
বৃষ্টিভেজা
সবুজ পাতার ওপর যুগল পাখির
যাপনও কম দৃষ্টিনন্দন নয়!
কীভাবে বেঁচে আছি আমরা?
আমরা বেঁচে আছি সেইসব উলঙ্গ
মানুষের ভিড়ে!
মানুষ মূলত মানুষের সাথেই
থাকতে
চায়।
বিধিবাম! আমরা
যা ভাবি তা
কি হয়? শহরের হট্টগোল
ডিঙিয়ে
গ্রামের গাছপালা নদী, নৌকা, ধানক্ষেত, সবই
মনের
প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন। বীজ যেমন নতুন
জীবনের
মাটি
খুঁজে ফেরে তেমন
মানুষও একটু শান্তির জন্য
বাঁচার জন্য অরণ্যের
কাছে
ফিরে
যেতে
চায়।
খুব অশান্তি আর
বিরক্তিকর মুহূর্তের মধ্যে
বসে
আমরা আশ্চর্যের
দিকে
তাকিয়ে
থাকি...।
কখনও কখনও মুহূর্তগুলো কষ্টে
মোড়ানো থাকে, যা
নিজেকে
ছাড়া কাউকে বোঝানো যায় না!
কোনো যুক্তি দিয়ে
মানুষের স্মৃতি-চিহ্ন-মায়া
অপেক্ষা
যেমন মুছে ফেলা
যায় না তদ্রূপÑ
‘যুক্তির
পেছনে
থাকে
মুক্তির
স্বপ্ন আর এই মুক্তির
স্বপ্নই মানুষকে মানুষ
বানায়।’
কিছু অমানুষ নিজ স্বার্থ
চরিতার্থ
করার জন্য সহজ-সরল
মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে
চাপ সৃষ্টি করে ভয়ংকরভাবে! এ
থেকে
মুক্তির উপায় খুঁজতে খুঁজতে
মুক্তির
আশায় মানুষ নির্জনতা খোঁজে! তখন
বৃক্ষ, মাটি, পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্যের কাছে
আমরা আশ্রয় প্রার্থনা করি! জীবনযাপনের
গদ্যময়তার
উপলব্ধি মুখে
বর্ণনা করা না গেলেও
মনের
ওপর ছাপ পড়ে! কখনও মনে
হয় খুব নিঃসঙ্গ সময়ের
ভেতরে
বরফের নিঃসঙ্গতা,
কষ্ট অনুভব করি! এই যে
বুট পরে বরফের
বুক যারা ঝাঁজরা করে দর্পের
সাথে
হেঁটে যায় তারাও একধরনের
মানুষ!
আগের দিনগুলো ছিল অন্যরকম
মায়ের
আদরে
সত্যের ওম!
এখন যাদের মুখোমুখি
দাঁড়াই তারা কি মানুষ
না, অসত্যের যম? কারেও প্রতি
আমার কোনো ঈর্ষা কাজ
করে
না। শুধু বলবে, বাঁচার জন্য
কারেও
চাকর হয়ো না! সোজা
হয়ে
দাঁড়াও ... ফিরে যাও অরণ্যের
কাছে!
নাগরিক
সংস্কৃতি তৈরি করে
বিভাজন আর দৃষ্টিভঙ্গির অতি ব্যবহারিক কটাক্ষ! সময়টা
বড় অদ্ভুত!
নির্জনতাই যেন স্বস্তি!
সংকটময় মুহূর্তও চরমভাবে অস্থিরতা
বাড়িয়ে
দেয়!
ক্রমশ ঘেরাটোপ, টানাপড়েন অস্তিত্ব ধরে
টান দেয়! তখন জঙ্গলও
আর আশ্রয় দিতে চায়
না!
তারপরও গৃহদাহ বড় বিস্ময়কর!
আগুনে
পুড়ে
ঝলসে
যাওয়া মন কী পেতে চায়? নির্জন
পথ ধরে হাঁটতে
হাঁটতে জলের ভেতরে পা
ডুবিয়ে
বটের
শেকড়ের
ওপর বসে থাকতে
মন চায়! যখন এ
লেখাটি... সাহিত্য সম্পাদকের
অনুরোধে
লিখতে শুরু
করেছি
তখন দেশজুড়ে অসংখ্য
শিশুহত্যার বিচারের দাবিতে
সোচ্চার দেশের মানুষ! বিশেষ
করে
মাত্র কদিন আগে ৮ বছরের শিশু
রামিসার
নৃশংস হত্যার বিচার
যেন দ্রুততর
সময়ের
মধ্যে
প্রকাশ্যে দোষী ব্যক্তিদ্বয়ের ফাঁসি কার্যকর হয় দেশের
মানুষের এক দাবি!
এ রকম নানাবিধ সমস্যা
নিয়ে
আমাদের
যাপিত জীবন!
‘আমি
বুঝতে পারছি, খুন করা
হয়েছে আমাকে।
তারা ক্যাফে,কবরখানা আর
গীর্জাগুলো তন্ন তন্ন করে
খুঁজছে।
তারা সমস্ত পিপে আর
কাবার্ডগুলো তছনছ করছে।
তিনটে কঙ্কালকে লুট করে
খুলে নিয়ে গেছে সোনার
দাঁত!
আমাকে তারা খুঁজে পায়নি।
কথনোই কি পায়নি তারা?
না,
কখনোই নয়।’
ফেদেরিকা গারসিয়া লোরকার এই
কবিতা
জীবন এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়!
লেখকের
জীবন এ রকমই সংবেদনশীল! আর চিন্তামগ্নতা
ভর করে থাকে
সমগ্র জীবনজুড়ে! মানুষের সাথে
মানুষের চেনাজানা, জানাশোনা আর
হলো
না!
এই তুমুল নিঃসঙ্গতা থেকে
মানুষ বিবাগী হয়ে ঘরসংসার
ফেলে
নিঃসঙ্গ পাতার ওপর লগ্ন
হয়ে থাকতে চায়।
এই নিভৃতচারী আমি, অনবরত
অরণ্য, পাহাড়
আর সমুদ্রের
মুখোমুখি
বসে
থাকতে
চাই!
স্পর্শ করতে চাইÑ কুয়াশা-শিশির, বৃক্ষরাজি, পত্রালী, বনফুল, মেঘপুঞ্জ!
কখনও কখনও নীরবতা শব্দের
চেয়ে
সুরক্ষা দেয়। মধ্যদুপুরে
নৈঃশব্দ্যের অপরূপ সৌন্দর্য
জীবনকে শ্রীমণ্ডিত
করে
তোলে। স্বল্পায়ুর জীবনে নির্মোহ
থেকে
বেঁচে থাকার মধ্যেও আত্মতৃপ্তি
থাকে। যদিও আমরা সব
সময় পৃথিবীর
চমৎকার মানুষটির সঙ্গ
পেতে
চাই!
বাস্তবে তা কি হয়? নিসর্গের
মতো মানুষও বড় রহস্যময়। অনন্তকাল নিঃসঙ্গতা সাথে
নিয়ে
পৃথিবীর
পথ ধরে হাঁটতে
হাঁটতে পৌঁছে যেতে
চাই অরণ্যের কাছে...।