মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬ ২০:০৭ পিএম
আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬ ১৩:০৮ পিএম
বনের কথা মনে পড়লে সে বনের ভেতরে থাকা কোনো জলাশয়ের কথা মনে আসে।
বনের ভেতরের জলাশয়গুলো যে কত জীবের তেষ্টা মেটায়! কথায় বলে বাঘে-মহিষে একঘাটে জল খায়।
সেটা সুন্দরবনের কটকা গিয়ে জঙ্গল আর তৃণভূমি পেরিয়ে জামতলা সৈকতের দিকে যাওয়ার সময় টের পেয়েছিলাম। সুন্দরবনে মহিষ নেই, তবে বাঘ ও হরিণ আছে। যাওয়ার পথে একটা ছোট্ট জলাশয়ের পাড়ের মাটিতে দেখলাম বাঘ আর হরিণের পায়ের ছাপ। জানি না ওরা এক সাথে আসে কি না, হয়তো না। আবার এমনও হতে পারে যে, হরিণ জল খেতে আসে। বাঘ তা জানে। তাই হরিণ শিকারের লোভে বাঘ সেখানে যায়।
অরণ্যের ভেতরে জলাশয়কে আমার কাছে যেন প্রকৃতির মৌনী সন্ন্যাসীর এক
ঔন্দ্রজালিক রহস্য বলে মনে হয়। কটকার আশপাশের খাল-নদী-সাগরের জল যেখানে লোনা, সেখানে
ওই পুকুরের মতো ছোট্ট জলাশয়ের জল লোনাহীন হলো কেমন করে! সে দৃশ্য দেখে কিশোর বয়সে প্রথম
পড়া বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসের সরস্বতী কুণ্ডির কথা খুব মনে পড়ে। সে উপন্যাসে নাঢ়া-বইহার-লবটুলিয়া-আজমাবাদের
অরণ্য বহু বৈচিত্র্যময় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কখনও ছোট ঝাউবন, কাশবন আবার দিগন্তব্যাপী
বনপ্রান্তর, কোথাও কোনো কোনো স্থান উঁচু পাহাড় ঘেরা, কোথাও বা শীর্ণ জলাশয়। সরস্বতী
কুণ্ডি যেন সে অরণ্যের বুকে এক রহস্যময় নির্জন জলাশয়, যা ধু-ধু ঝাউবন ও কাশবনে ঘেরা।
প্রখর রোদে তৃষ্ণার্ত বন্য মহিষের দল এসে সে কুণ্ডির জল খায়। জল খাওয়ার সে স্থানটিকে
লেখক কী যে মুন্সিয়ানায় তার নির্জন ও রোমাঞ্চকর রূপটি তুলে ধরেছেন, বারবার পড়েও তার
তৃষ্ণা মেটেনি। বুড়ো বয়সে এসেও আরণ্যক মাঝে মাঝে পড়ি। আরণ্যক উপন্যাসে উল্লেখ করা গাছপালাগুলোকে
নিয়ে শেষে একটা বইই লিখেছি, নাম দিয়েছিলাম আরণ্যকের তরুলতা।
যুবক বয়সে এসে গ্রিক পুরাণের একটি চরিত্র আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল।
সেটিও ছিল অরণ্যের এক জলাশয়ের ধারে বসে থাকা যুবক নার্সিসাসের করুণ কাহিনী। নার্সিসাস
ছিল বিওশিয়ার থেসপি শহরের এক পুরুষ শিকারি যে নিজ সৌন্দর্য বা রূপের জন্য বিখ্যাত ছিল।
সে ছিল জলপরী লিরিওপি ও নদীর দেবতা সেফিয়াসের পুত্র। তার রূপে অনেকেই মুগ্ধ হয়ে প্রেম
নিবেদন করত আর নার্সিসাস সেসব প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করত। নিজের রূপে সে এতটাই
গর্বিত ছিল যে অন্য কারও রূপকে তার পছন্দ হতো না। তার ওপর বর ছিল যে, সে ততদিন বেঁচে
থাকবে যতদিন সে নিজের চেহারা না দেখবে। নেমেসিস তার এ অহংকার দেখে একদিন তাকে অরণ্যের
মধ্যে একটি জলাশয়ের দিকে আকৃষ্ট করে। সে জলাশয়ে নার্সিসাস নিজের প্রতিবিম্ব বা ছায়া
দেখে তার প্রেমে পড়ে যায়। আয়নার মতো স্বচ্ছ জলের ভেতরে হওয়া সেটি যে ছায়া তা সে বুঝতে
পারে না। সে হাত বাড়িয়ে প্রতিবিম্বটি ধরতে চাইলে তা জলে হারিয়ে যায়। নিজের সৌন্দর্যের
মায়া কাটাতে না পেরে একসময় নার্সিসাস বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সেই জলাশয়ের পাড়ে
বসেই তার দিনগুলো কেটে যেত, জলের ভেতরে নিজের ছায়ার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবশেষে
একদিন তার মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পর সেখানে একটি গাছ জন্ম নেয়। সে গাছে একদিন সুন্দর
ফুল ফোটে। সে ফুলের নাম রাখা হয় নার্সিসাস, যাকে এখন আমরা ড্যাফোডিল ফুল নামে চিনি,
বাংলায় বলি নার্গিস ফুল। সেই নার্গিস ফুলের সাথেও কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও রয়েছে নার্সিসাসের
মতো বেদনার সম্পর্ক। নার্সিসাসের সে সৌন্দর্যমণ্ডিত রূপটা কেমন ছিল তা জানার খুব আগ্রহ
ছিল। পৌরাণিককালে কোনো ছবি তোলার ব্যবস্থা ছিল না, তাই শিল্পীরা তাদের কল্পনা দিযে
নার্সিসাসের বেশকিছু ছবি এঁকে রেখে গেছেন। সেসব শিল্পীর মধ্যে আছেন দালি, জন উইলিয়াম
ওয়াটারহাউস, গুইলো কার্পিওনি, লুই জঁ ফ্রাঁসোয়া লাগরিনি, জ্যান রুজ, কারাভাজ্জিও প্রমুখ।
গ্রিক পুরাণের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের এক প্রাচীন সাহিত্য শকুন্তলা।
কালিদাস রচিত সে বইয়ে যে বনে শকুন্তলারা থাকত সেই তপোবন ও জলাশয় ঘিরে এক মনেরাম দৃশ্যচিত্রের
বর্ণনা দেখে চোখের সামনে যেন যুবক বয়সে মনের মধ্যে আকুলি-বিকুলি খেলে যেত। কী সুন্দর
রূপবতী শকুন্তলা আর প্রকৃতির অপরূপ শোভায় শোভিত তপোবন! প্রাচীনকালে বনে শুধু বন্য প্রাণীরাই
থাকত না, অরণ্যের লতাগুল্ম বৃক্ষের ছায়ায় বসে তপস্যা তথা ধ্যানমগ্ন হতেন অনেক মুনিঋষিরা।
শকুন্তলার তপোবনেও জলাশয় ছিল। বিশেষ করে মালিনী নদীর জলকে কালিদাস স্বচ্ছ ও পবিত্র
বলে উল্লেখ করেছেন। জলাশয়ের সে জল দিয়েই আশ্রমকন্যা শকুন্তলা ও তার সখীরা আশ্রমের গাছপালা
ও লতাপাতায় জলসেচন করত। জলাশয়ের তীরে ও স্বচ্ছ জল কেটে সাঁতরে বেড়াত সাদা রাজহাঁসের
দল। নাটকটির শুরুতেই রাজা দুষ্মন্তের তপোবনে প্রবেশের সময় তিনি সেই পবিত্র জলাশয় ও
তীরবর্তী লতাপাতায় শোভিত অপরূপ নৈসর্গিক রূপ দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন। সেটা কম করে হলেও
এখন থেকে ষোলশ বছর আগে কালিদাস সে কথা লিখেছিলেন। এসব পড়ার সময় মনে হতো, সেকালের বনগুলোতে
আহা কী শান্তিময় স্নিগ্ধ এক পরিবেশ বিরাজ করত। প্রায় পৌনে দুশ বছর আগেও প্রকৃতিবিদ
যোসেফ ড্যাল্টন হুকার প্রায় তিন বছর ধরে হিমালয়ের উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর সন্ধানে ঘুরে
বেড়িয়েছেন। জীবাশ্ম, শিলাপাথর ও খনিজ দেখেছেন। ডায়রি লিখতেন রোজ, ফিরে আসার পর সে ডায়রির
পাতাগুলোই বইয়ের আকারে রূপ নেয়, প্রকাশিত হয় তার হিমালয়ান জার্নাল নামে বই। সে বইতেও
হিমালয়ের বনে-জঙ্গলে তিনি অনেকবারই জলাশয়ের দেখা পেয়েছেন, সাথে পার হয়েছেন খরস্রোতা
অনেক পাহাড়ি নদী। ঝিলের মতো সেসব জলের চাতালে যখন তুষারের মুকুটপরা পর্বতশৃঙ্গের ছায়া
পড়ত, তিনি মুগ্ধ হয়ে সে দৃশ্য দেখতেন আর ছবি আঁকতেন, মেঠো খাতায় সব টুকে রাখতেন। সেসব
তথ্যের মধ্যে শুধু উদ্ভিদ প্রাণীই নয়Ñ বাদ পড়ত না দিনের তাপমাত্রা ও স্থানের উচ্চতার
মাপামাপি, তার হিসাব লেখা। এসব যতই পড়ি ততই নিজেকে বড় কাঙাল মনে হয়, কিছুই পারি না।
তবুও গাছপালা দেখতে দেখতে অরণ্য থেকে অরণ্যে ঘুরে বেড়াই। বেড়াতে বেড়াতে
বিভিন্ন উদ্যান থেকে অরণ্যের ভেতরে কিছু জলাশয়ের সাথে দেখা হয়। মৌলভীবাজারে কমলগঞ্জ
উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে একটি চা বাগানের পাদদেশে থাকা মাধবপুর লেকের জলের চাতালে আকাশে
হেলান দেওয়া সবুজ পাহাড়ের গল্প অনেককেই বলেছি। দেখেছি ঝিলের চারপাশে ফুটে থাকা নীল
শাপলা ফুল। কোনো উদ্যানই জলাশয় ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। বলধা উদ্যানেও আছে শঙ্খনিধি পুকুর,
রমনায় লেক আর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে আছে মিরপুর সিরামিক লেক, জালিয়াডাঙ্গা লেক, শাপলা
ও পদ্ম পুকুর।
এ বছর বৈশাখের এক সকালে গিয়েছিলাম জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। স্বচ্ছ স্ফটিক
সে জলের ওপর দেখলাম পাড়ের জারুল বৃক্ষে ফোটা বেগুনি ফুলের ছায়াময় পদ্য, জলের ওপর একটা
মরা গাছের পড়ে থাকার দৃশ্যটি যেকোনো চিত্রশিল্পীকে ছবি আঁকতে প্রলুব্ধ করার জন্য যথেষ্ট।
পদ্ম পুকুরে ফুটে আছে অসংখ্য ফুল। প্রকৃতিতে নিমগ্ন না হলে এসব ঐশ্বরিক দৃশ্য সবাই
দেখলেও তার মধুরতা উপলব্ধি করতে পারবে না। আটপৌরে মানুষ আমি, মোটেই পারি না দীর্ঘ জলসাঁতার
দিতে অথবা দীর্ঘকাল ধরে প্রকৃতিতে নিমগ্ন থাকতে। সাদামাটা মানুষের মতো সাদা চোখে বনের
গাছপালা ও জীবগুলোর দিকে তাকাই, প্রকৃতিবিদ লেখকদের বই পড়ি আর বিস্ময়ে মাথা নত করে
বসে থাকি।