কাটে দিন বসন্ততালাশে। প্রচ্ছদ: নাজিব তারেক
নব্বইয়ের দশকের কবি মতিন রায়হানের সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘কাটে দিন বসন্ততালাশে’। এখানে বসন্ত কেবল প্রকৃতির ঋতুচক্রের অংশ নয়; এটি কবির অন্তর্লোকেরও হালহকিকত। কবি বসন্তকে পুনর্জন্ম, নবায়ন, সম্ভাবনা এসবের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলেও একই সঙ্গে এটি অপূর্ণতা ও অন্বেষণেরও স্মারকচিহ্ন হয়ে উঠেছে। ‘তালাশে’ শব্দটির মধ্যেই একটি অন্তহীন খোঁজের ইঙ্গিত রয়েছে, যা কখনও সম্পূর্ণ হয় না। এই অনুসন্ধানই গ্রন্থটির অন্তর্নিহিত দার্শনিক সুরকে শক্তিশালী করেছে। মোট বিয়াল্লিশটি কবিতা স্থান পেয়েছে এ কাব্যগ্রন্থে। তার এ গ্রন্থের কবিতাসমূহে চিরবসন্তের দিনলিপি, যুদ্ধ-বিগ্রহের চালচিত্র, কবিতাযাপনের একান্ত সুর, গ্রাম্যজীবন, সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের ইতিবৃত্ত, প্রেম-প্রকৃতি ও জীবন-জিজ্ঞাসার বিচিত্র অনুষঙ্গ ধ্রুব সত্যের মতো উদ্ভাসিত হয়েছে। তবে চলুন, এর কিছুটা পাঠে পাঠে উন্মোচন করি।
কবি মতিন রায়হানের এ কাব্যগ্রন্থটি আধুনিক বাংলা কবিতার ভুবনে সংবেদনশীল ও আবেগঘন একটি সংযোজন। এ কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে গভীর সাহিত্যিক বিশ্লেষণে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এটি কেবল বিষয়ভিত্তিক কবিতার সংকলন নয় বরং একটি সুসংহত নন্দনচিন্তার পরিসরও এখানে বর্তমান। যেখানে ‘বসন্ত’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক হয়ে বহুমাত্রিক অর্থবাহী রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এই গ্রন্থে ‘বসন্ত’ কেবল একটি ঋতু নয় এটি হয়ে উঠেছে জীবনের প্রতীক, প্রেমের রূপক, স্মৃতির উন্মোচন এবং কখনও কখনও বিরহের বেদনাময় ছায়া। কবি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকৃতি, মানবমন এবং সময়ের সম্পর্ককে একসূত্রে গেঁথে কবিতাগুলো নির্মাণ করেছেন। মূলত কবি ঋতুকে অতিক্রম করে একধরনের অস্তিত্ববাদী ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার দিকে যাত্রা করেছেন।
বসন্তবন্দনায় কবি বসন্তকে এক নবজীবনের দূত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে জেগে ওঠে। ফুল, পাখি, রোদ, বাতাস সবকিছু এক উচ্ছ্বাসময় সুরে বাঁধা। কবিতায় কবির ভাষা চিত্রধর্মী এবং সুরেলা, যা পাঠকের মনে বসন্তের প্রাণময় উপস্থিতির জন্ম দেয়। কবি বসন্ত-প্রকৃতির রূপমাধুর্যের মধ্য দিয়ে জীবনের ইতিবাচক দিককে উদযাপন করেছেন। ‘আমার বসন্ত’ কবিতায় এমন ভাবনারই দেখা মেলে। কবির ভাষায়, ‘আমি প্রাণপণে বাঁচার জন্য লড়াই করছি!/আমি কবিতার জন্য, আসন্ন বসন্তের জন্য,/জীবনবাজি রেখে ছুটছি.../কবিতা আমার হৃদয়ঘেঁষা অনন্ত প্রিয়তমা।’ কিংবা এ গ্রন্থের নামকবিতায় পাই, ‘যাই যাই শীতে শুনি আজ বসন্তের আগমন ধ্বনি/এই বুকে প্রেম আলোদীপ্ত দ্রিমিদ্রিমি প্রেমের সিম্ফনি!’ সত্যিই কী অসাধারণ বসন্তযাপন।
এই কাব্যগ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বসন্ত ও প্রেমের আন্তঃসম্পর্ক। কবির দৃষ্টিতে বসন্ত মানেই দারুণ প্রেমের সময়, হৃদয়ের উন্মোচন। প্রেম এখানে কখনো কোমল, কখনও তীব্র, কখনও আবার নিবিড় স্বপ্নময়। কবি প্রেমকে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন মনে হয় ফুলের প্রস্ফুটন আর হৃদয়ের ভালোবাসা একই স্রোতে প্রবহমান। ভাষার কোমলতা ও চিত্রকল্পের মাধুর্য কোনো কোনো কবিতাকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ‘প্রেমের কবিতা’ শীর্ষক কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি এমন, ‘ময়ূরের পেখমতোলা প্রেম, বৃষ্টির গন্ধে কী যে উতরোল!/জলপাই বনে নাচে স্বপ্নবাজ হৃদয়েরা; ডুমুরের গল্পে যদি/ডুবে যায় ত্বিন ফল তবে সোনালি দাদুরের লাফে/ব্যগ্র জীবনও হয়ে ওঠে শ্রাবণের এক অর্থবহ নদী...।’ কিংবা ‘এই প্রেম, পাঠ্যক্রম’ কবিতায় ‘আত্মায় আত্মায় কথা বিনিময়, ফোটে ফুল ইশারায়/পান করি সুধা সঞ্জীবনী তীব্রতর পিয়াসায়...।’ এই অংশে প্রেম কেবল বিমূর্ত অনুভূতি নয় বরং দেহাত্মক ও মানসিক আকর্ষণের অপূর্ব সমন্বয়। কবি প্রেমকে কখনও ফুলের প্রস্ফুটনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, আবার কখনও তা হয়ে উঠেছে এক অস্থির, অনিশ্চিত অভিজ্ঞতা। প্রেমের এই দ্বৈততা আনন্দ ও আশঙ্কা কবিতাগুলোকে দিয়েছে গভীরতর ব্যঞ্জনা।
এই গ্রন্থের কতিপয় কবিতায় ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের ছোঁয়া রয়েছে। এখানে কবি নিজের জীবনের অতীত মুহূর্তগুলোকে একান্তভাবে স্মরণ করেছেন। এ যেন সময়ের স্রোতে নিজেকে ফিরে দেখা। শৈশব, কৈশোর, হারানো সম্পর্ক সবকিছুই একধরনের নস্টালজিয়ার মোড়কে আবৃত। এই অংশে কবির কণ্ঠস্বর আরও ব্যক্তিগত, আরও আন্তরিক। পাঠক যেন কবির সঙ্গে তার স্মৃতির ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন। ‘বুড়ি নদী ও মনসুর হাল্লাজ’ কবিতার ভাষায় : ‘ও আমার বুড়ি নদী/বুকের বাঁপাশে খচখচ-করা নস্টালজিয়া/ফেলে আসা রঙিন শৈশব/কৈশোরের বর্ণময় রূপকথা/মনে পড়ে আমাকে?’ আবার ‘ঘোড়ামামা’ কবিতায় আমরা পাই, ‘রবিশস্যের চোখজুড়ানো মাঠ ছাড়িয়ে/বোরোধানের বিল পেরিয়ে/আঁকাবাঁকা বুড়ি নদীর খেয়া পেরিয়ে/আমরা পৌঁছে যেতাম মামাদের বাড়ি/আহা! আমার শৈশবের সেই প্রিয় ঘোড়ামামা।’ এই ধাঁচের কবিতাসমূহে কবি সময়কে একটি পরিবর্তনশীল সত্তা হিসেবে দেখেছেন। অতীত এখানে স্থির নয় বরং বর্তমানের আলো-আঁধারিতে তা পেয়েছে এক নতুন অর্থবিভা। স্মৃতিপুঞ্জ একধরনের নস্টালজিক আবহ তৈরি করলেও তা কখনও পুরোপুরি সুখকর নয়। বরং সেখানে হারানোর বেদনা, অপূর্ণতার আক্ষেপ এবং সময়ের নির্মম গতিশীলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই কাব্যগ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দার্শনিক অন্তর্গততা। বসন্তের অন্বেষণ প্রকৃতপক্ষে জীবনের অর্থের অনুসন্ধান। কবি যেন বলতে চান জীবনে কোনো স্থায়ী বসন্ত নেই; আছে কেবল তার অন্তহীন সন্ধান। এই ধারণা একধরনের অস্তিত্ববাদী উপলব্ধির দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে মানুষ চিরকাল অপূর্ণতার মধ্যেই বেঁচে থাকে। গ্রন্থটি একই সঙ্গে ভাবনামূলক ও নান্দনিক, যেখানে বসন্ত জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। কবি এখানে তার কাব্যভাষা, প্রতীকচিন্তা এবং আবেগের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র কাব্যজগৎ নির্মাণ করেছেন। সর্বোপরি এই গ্রন্থটি পাঠককে শুধু সৌন্দর্যের অনুভূতিই দেবে না বরং তাকে জীবনের অপূর্ণতা ও অন্বেষণের গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৬, প্রকাশক : অনন্যা, পৃষ্ঠা : ৬৪, মূল্য : ২৫০ টাকা