× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নজরুল-প্রতিভার আবির্ভাব

কাজী মোহাম্মদ ইদ্‌রিস

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ০৯:৪৬ এএম

সংবাদ পত্রিকায় ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৩ (২৫ মে ১৯৬০ সালে) নজরুলজয়ন্তী সংখ্যায় প্রকাশিত। ছবি: পেপার কাট

সংবাদ পত্রিকায় ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৩ (২৫ মে ১৯৬০ সালে) নজরুলজয়ন্তী সংখ্যায় প্রকাশিত। ছবি: পেপার কাট

ভূমিকা : সামিও শীশ

কাজী মোহাম্মদ ইদ্‌রিস (১৯০৬-১৯৭৫) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। রংপুরের মুন্সিপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী এই গুণী কলকাতায় দৈনিক কৃষক, নবযুগ, ইত্তেহাদ প্রভৃতি পত্রিকায় এবং পরবর্তীকালে ঢাকায় দৈনিক সংবাদ, পূর্বদেশসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন। সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার এক কণ্ঠস্বর।

১৯৬০ সালে কাজী নজরুল ইসলামের জয়ন্তী উপলক্ষে ২৫ মে তারিখে ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকায় ‘নজরুল-প্রতিভার আবির্ভাব’ শিরোনামে কাজী মোহাম্মদ ইদ্‌রিসের একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। লেখাটি তার কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ রচনাটি শুধু একটি সাহিত্য-সমালোচনা নয়, বরং নজরুলের আকস্মিক প্রতিভার উত্থানকে যুগের সংকট ও মানবমুক্তির ভাষায় ব্যাখ্যা করে বাংলা সাহিত্যের স্বাধীনতা-সংগ্রামের একটি ঘোষণাপত্র। প্রবন্ধের রচনাশৈলী, যুক্তিবিন্যাস, রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে নজরুলের স্বাতন্ত্র্য, ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির বিশ্লেষণ আজকের জন্যও প্রাসঙ্গিক। ছয় দশকেরও আগে লেখা কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আজকের সাম্প্রদায়িক বিভাজন, পরিচয়-রাজনীতি ও নতুন প্রজন্মের নজরুল-পাঠের প্রেক্ষিতে এই প্রবন্ধ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে এবং নজরুল সাহিত্য-সমালোচনায় এ রচনাটি একটি উল্লেখযোগ্য দলিল বটে। 

ঢাকা, ১৩ মে ২০২৬


নজরুল-প্রতিভার আবির্ভাব

কাজী মোহাম্মদ ইদ্‌রিস

ইংরেজ কবি বায়রন ‘awoke one morning to find himself famous’ 

ইংরেজি উদ্ধৃতিটা বায়রনের কবিতার সমালোচকদের কথা নয়; কবির নিজের মুখের কথারই পরিবর্তিত রূপ।

বায়রনের উক্তির বাংলা তর্জ্জমা করে নজরুল ইসলামও যদি বলতেন, একদিন ভোরবেলা উঠে দেখলেন, তিনি জগদ্বিখ্যাত, তাহলে একজন প্রখ্যাত ইংরেজ কবির কথা অনুকরণ করার জন্য হয়তো তাঁর মৌলিক চিন্তাশক্তির প্রতি কটাক্ষ করা চলত, কিন্তু তাঁর সত্যনিষ্ঠায় একটু আঁচড় লাগত না। 

‘Childe Harold’s pilgrimages ‘(প্রকাশিত লেখাতে ঊর্ধ্ব কমা এইভাবে রয়েছে)-এর প্রথম দুই সর্গ ছাপার হরফে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়রন তাঁর যুগের নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হলেন। তরুণীরা বসালো তাঁকে দেবতার বেদীতে, আর তরুণরা তাঁর লেবাসের অনুকরণ করে ‘খোলা গলাবন্ধ আর উড়তি Tie বেঁধে তরুণ-তরুণীর মজলিস-মহফিলে, বায়রনের কাব্যে বর্ণিত হতাশাগ্রস্ত দুঃখবাদী নায়কদের মতো, ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো।

সারা ইউরোপ ভূখণ্ডে উঠলো বায়রন স্তৃতির প্রচণ্ড ঝড়। কবির প্রতিভায় সম্মোহিত ভক্তরা বললে, সেক্সপিয়ারের পরে আর এতো বড় প্রতিভার আবির্ভাব হয়নি। সাহিত্য-জগতের যারা খুঁটিনাটি খবর রাখেন, তাঁরা বলেন, ব্যাপারটা এতদূর গড়িয়েছিল যে, সে জমানার কোনো কোনো কাব্যরসিক তাঁদের মৃত্যুর সময় বাইবেলের শ্লোক না আউড়িয়ে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বায়রনের কবিতা আওড়াতে আওড়াতে।

কিন্তু এই স্তুতি আর জনপ্রিয়তা যেমন একলাফে মগডালে উঠেছিল, ঠিক তেমনি হঠাৎ ধপাস করে একলাফে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লো। আর, সেই যে পড়ল, আর উঠল না।… দুনিয়ার বাদবাকি দিন কয়টা হয়তো মুখ থুবড়ে পড়েই থাকবে।

ঠিক বায়রনের মতই, নজরুলের প্রতিভার স্বীকৃতি এবং তাঁর কবিখ্যাতি ও জনপ্রিয়তা তড়িৎগতিতে এসেছে। এদের আবির্ভাব যেমন দ্রুত, তেমনি আকস্মিক ও চমকপ্রদ।

দুই দেশের দুই কবি-প্রতিভার আবির্ভাব আর বাড়বাড়ন্তের মিল দেখে স্বভাবতঃই মনে যে-প্রশ্নটি জাগে, তার জবাব যথাসময়ে মহাকালই দেবে। তবে নজরুলের বেসার তিরোভাবটা বায়রনের মতো অতো দ্রুত হবে না বলেই মনে হয়। বরং শ্রেণীচ্যুত মানুষের কবিরূপে অনাগতকাল নজরুল-প্রতিভাকে বরণ করতে বরণ-ডালা সাজিয়ে অপেক্ষা করছে, কেউ কেউ হয়তো এই ধারণাও পোষণ করে; আর যারা পোষণ করে, তারা সম্ভবত: স্বপ্নচারী নয়।

কিন্তু অনাগতকালের উপরই ন্যস্ত থাক। যখনকার কথা তখন হবে। শ্রেণী-সচেতন সমাজে নজরুল-প্রতিভার আবির্ভাবের কথাই আলোচনা করি।


খরপ্রখর বৈশাখের দুপুর বেলা। নজরুলের ভাষায় ‘মাথার ওপর জ্বলিছেন রবি। ‘(প্রাগুক্ত) কার সাধ্য আকাশের পানে তাকায়? সূর্য্যের কী তেজ!

আকাশে যখন দুপুরের সূর্য্য জ্বলজ্বল করে জ্বলেন, তখন একমাত্র তিনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি। তখন গ্রহনক্ষত্রের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। সূর্য্যের জ্বালাময়ী দীপ্তি তাদের অস্তিত্ব গ্রাস করে; গ্রহ-নক্ষত্রের তেজ আর আলো সেই সর্ব্বগ্রাসী দীপ্তিতে হারিয়ে যায়।

বলাকার যুগ। রবীন্দ্র প্রতিভায় ভরা দুপুর। যতো বড় শক্তিধর কবিই হোক না কেনো, কলম নিয়ে বসলে রবীন্দ্র প্রতিভার প্রভাব বেচারার কলমের ডগায় এসে ভর করে। সাত-দিন সাত-রাত বসে মাথা কুটলেও তাকে এড়ানো যায় না। বড়ই করুণ পরিস্থিতি!

কে জানে, হয়তো এড়াতে না পারার দরুনই অতো বড় প্রতিভার অধিকারী হয়েও কবি সত্যেন দত্ত তাঁর প্রতিভার স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেলেন অনবদ্য অনুবাদ সৃষ্টি করে। (সত্যেন দত্তের প্রতিভার যোগ্য মর্যাদা দিতে হলে তার অনুবাদকে ‘সৃষ্টি’ বলেই আখ্যায়িত করতে হয়। 

কিন্তু কী আশ্চর্য! বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ প্রকৃতির বিধিবিধান তচনচ করে মাত্র বাইশ-তেইশ বছরের একজন যুবক প্রচণ্ড মধ্যাহ্নে সূর্য্যের সর্ব্বগ্রাসী দীপ্তিকে যেনো বুক ফুলিয়ে অস্বীকার করলেন। রবীন্দ্র-প্রতিভাকে এড়িয়ে সেই মধ্যাহ্ন সূর্য্যেরই পাশে নিজের স্বতন্ত্র আসন করে নিলেন, আর সেই আসনে বসলেন গ্যাট হয়ে।

হকচকিয়ে গেলো বাংলা কাব্যের রসিকরা। তার বললে, ‘বাহাদুর ছেলে বটে। জিতা রহো বাচচা’ (প্রাগুক্ত)।… তাদের সেই আশীর্ব্বাদে বলাকার কবি, দুপুরের তেজোময় সূর্য্য, রবীন্দ্রনাথও যোগ দিলেন।

বাহাদুর ছেলেই বটে!

মাত্র বছর দুই বাংলা সাহিত্যের আসনে পিঁড়ি পেতে বসেছেন। চেহারা চলনবসনের মধুবর্ষী আকর্ষণ এবং দু’বছরের অবদানে কল্পনাতীত প্রতিশ্রুতি আসরে সবেমাত্র সপ্রশংস গুঞ্জনধ্বনি তুলেছে। আসরের অন্যান্য নামকরা নট-নটি ও শ্রোতারা বার বার তাঁর দিকে উল্লসিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন। ‘আহা। কি লা আর কি তান, কি ঢং আর কি বচন মধু, মধু-আসর এবার জমবে ভালো… ।’ নতুন গায়েনের দিকে তাকিয়ে তাঁরা সোল্লাসে এসব কথা বলাবলি করছেন। কিন্তু এ পর্যন্তই ও-র বেশি নয়।

হ্যাঁ, আসরের মূল গায়েনের কথা বলা হয়নি। তিনিও মুচকি হেসে মনে মনে বলছেন যদি বিগড়ে না যায়, আসর জমাতে ও পারবে। …ছেলেটির ভেতর বস্তু আছে।

নজরুল প্রতিভার শুধুমাত্র একটা স্পষ্ট প্রতিশ্রুত ফুটে উঠেছে। তার বেশি কিছু নয়। … কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই অঘটনটা ঘটলো!

সবেমাত্র বলার কথার পুনরাবৃত্তি করছি… প্রকৃতির বিধি-বিধান হলো ভণ্ডুল। দুপুরের প্রদীপ্ত সূর্য্যের সর্বব্যাপী জ্বালাজ্যোতি এড়িয়ে নজরুল প্রতিভার চোখ ধাঁধানো শিখা হঠাৎ দপ দপ করে জ্বলে উঠলো।

নজরুল লিখলেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। 

বিস্ময়কর রবীন্দ্র প্রতিভার জাদুমন্ত্রে সম্মোহিত লোকসমাজে ব্যাপারটা এতো অকস্মাৎ ঘটলো যে, একমাত্র তন্ত্রেমন্ত্রে বিশ্বাসী লোক ছাড়া আর সবারই বুদ্ধি থমকে দাঁড়ালো। 

তন্ত্রেমন্ত্রে বিশ্বাসী লোকেরা তাদের জ্ঞান-বৃদ্ধি দিয়ে অবোধ্য সমস্যাটার অবশ্য একটা ফয়সালা করে ফেলল। 

তারা বললো, ‘কোন মহাযাদুকর বুঝি হঠাৎ হুঙ্কার ছাড়লে আবিরাবিম ‘এধি; আর নজরুল ইসলাম বিদ্রোহীরূপে আবির্ভূত হলেন। 

কিন্তু ঘটনাটি ঠান্ডা মাথায় একবার বিবেচনা করে দেখুন, কী তাজ্জব কাণ্ড সেদিন ঘটেছিলো।

‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলির তলে।’ কে বলছেন? 

বর্ত্তমান দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। 

তিনি কোন দেশের লোক? 

এই বাংলা দেশেরই ।

আর গোটা দেশের বুদ্ধিজীবীদের ওপর তাঁর প্রভাব এত প্রচণ্ড যে, তাঁর হাতের লেখার ছাদটি পর্য্যন্ত অনুকরণ করে বুদ্ধিজীবীরা অক্ষর লেখা শিখছেন।

একই বাড়িতে অতো বড় প্রতিভা বাস করলে, বাড়ির অন্যান্য সবারই ‘দাগা বুলানো‘ (প্রাগুক্ত) ছাড়া আর-কি-ই বা করার ক্ষমতা থাকতে পারে। 

‘দাগা বুলানো’ কথাটা এখানে ব্যাপক অর্থেই প্রযোজ্য।

কিন্তু নজরুল একই বাড়িতে বাস করেও দাগা বুলানোর ধারেকাছে ঘেঁষলেন না। তিনি এক অবাক কাণ্ড করে বসলেন। … না, না, না, আমার মাথা নত করো… নয়।’ (প্রাগুক্ত) … দশদিক কাঁপিয়ে নজরুল হঠাৎ গর্জ্জে উঠলেন, বলবীর… বল মাথা নত করো… নয়।’ দশদিক কাঁপিয়ে নজরুল হঠাৎ গর্জ্জে উঠলেন বলবীর… বল উন্নত মম শির। 

মহা হৈ চৈ পড়ে পড়ে গেলো। 

পড়বার কথাই তো। …একেবারে নতুন ধ্বনি, নতুন বাণী, নতুন রূপ, নতুন রস।

স্কুল-কলেজে, সাহিত্যিকদের আড্ডায়, ছাত্রাবাসে, ট্রামে, বাসে, পার্কে রেস্কেরায় যেখানে দেখবে, শিক্ষিতমানী বাঙালী, বিশেষ করে যবুক বাঙালী, তোমার কানদুটো একটু খাড়া করো, অমনি তোমার কানদুটো একটু খাড়া করো, অমনি তোমার কানে ভেসে আসবে, ‘বল বীর‘ (প্রাগুক্ত) বল উন্নত মম শির। … নজরুল প্রতিভার জনপ্রিয়তা কী দিনই না গেছে!

দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত জনপ্রিয়তার ঝড় বইতে শুরু করলো। 

বিদ্রোহীর অহরাত্র সংকীর্ত্তন চললো তরুণ মহলে। 

দেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে তাছাড়া ‘বিদ্রোহী’ (প্রাগুক্ত) কবিতা আবৃতি (মূল লেখায় এই বানান রয়েছে) করা রেওয়াজে পরিণত হলো। কলকাতা শহর ভেঙে পড়লো ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে। ব্যাপার কী? না দেশের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা… যুগস্রষ্টা নট শিশির ভাদুরী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করবেন।

বেশ মনে পড়ে, অধ্যাপক বিনয় সরকার তখন ইতালিতে। তিনি করলেন কি, ইংরেজি ভাষায় ‘বিদ্রোহী’র প্রশস্তিপূর্ণ একটি প্রবন্ধ লিখে আর সেই প্রবন্ধে ‘বিদ্রোহী’র (প্রাগুক্ত) কিছুটা অংশের ইংরেজি অনুবাদ উদ্ধৃত করে জোর গলায় ঘোষণা করলেন : দুর্ব্বার প্রাণশক্তি, উদ্দাম ব্যঞ্জনা, অগ্রগামী পৌরুষ আর অভাবিত ওজসের প্রসঙ্কের বক্তা... নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতায় যে জীবনাবেগ সৃষ্টি করেছে, বাংলা কাব্যজগতে তা শুধু অনন্যসাধারণ নয়, বাংলা কাব্যের পূর্ব্বতন গতিপথ ত্যাগ করে এ কবিতার বেগ এক অভাবিত নতুনতর খাতে প্রবাহিত হয়েছে। নজরুলকে তিনি বাংলার কাব্যাংশের নতুন সূর্য্য বলে অভিনন্দিত করে তাঁর প্রতিভার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সেই প্রবন্ধে। (এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। বিনয় সরকারের প্রবন্ধের বাংলা তর্জ্জমা আমি এখানে দিইনি। কারণ প্রবন্ধটি আামর কাছে নেই। বহু বৎসর পূর্ব্বে পঠিত প্রবন্ধের শুধু মূল বক্তব্যটা সম্পূর্ণ নিজের তর্জ্জমায় ও নিজের ধরনে এখানে বললাম।)


সকল বড় কবিরই কবিজীবনে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়। বড় কবি মানে অবশ্য যে কবি সৃজনধর্ম্মী প্রতিভার অধিকারী। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার পর থেকে শুরু হয় কবির সত্যিকার সৃষ্টি। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গকে বলা যেতে পারে, কবি প্রতিভার সৃজনশক্তি উন্মেষের প্রথম ওঙ্কার ধ্বনি। 

আটপৌরে ভাষায় যাকে বলে গায়ের কাঁটা ভাঙ্গা। ‘(প্রাগুক্ত)… নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিপ্রতিভার সেই ‘গায়ের কাঁটা ভাঙ্গা।’ কাঁটা ভাঙ্গার অর্থ হচ্ছে, প্রকাশাব্যাকুল প্রথিভার দ্বিধা, দেমনা, সঙ্কোচ অতিক্রম করা… প্রতিভা সংহত হওয়া … নিজের সৃজনশক্তির সঙ্গে কবির সর্ব্বপ্রথম মুখোমুখি হওয়া।

আর এই মুখোমুখি হওয়ারি অর্থ হচ্ছে কবির নিজস্ব সৃষ্টির পথে দ্বিধা-সঙ্কোচবর্জিত, স্বতঃস্ফূর্ত প্রথম পদক্ষেপ করা।

সৃজনধর্মী প্রতিভাবান কবির সত্যিকার সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ যে কবিতাকে জন্ম দেয়, কাব্যরসিকদের দৃষ্টি সেই কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া… কবির অন্যতম অবদান রূপে তা গণ্য হওয়া … কবির সৃজনধর্ম্ম প্রতিভার স্বাক্ষর তাতে চিহ্নিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং সকল কবিরই রচিত ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ (প্রাগুক্ত)… এ তা হয়-ও। কিন্তু এ-র বেশি আশা করা যায় না।

  আশা করা হয়তো যায় না, কিন্তু কাজী নজরুলের প্রতিভা এই স্বাভাবিক নিয়মেরও কল্পনাতীত ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে। 

‘বিদ্রোহী’ কবিতাই তাঁর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।’ (প্রাগুক্ত) কিন্তু কী আশ্চর্য। ‘বিদ্রোহী’ (প্রাগুক্ত) কবিতা সাহিত্য-জগতের কাছ থেকে নজরুল প্রতিভার স্থায়ী স্বীকৃতি যে শুধু আদায় করেছে, তা নয়, নজরুল প্রতিভার কাছ থেকে বিদ্রোহীকেই পরমতম পাওয়া বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একটিমাত্র কবিই কবি-প্রতিভার স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ; আর যে কবিতা নজরুল-প্রতিভার ‘নির্ঝরের ‘স্বপ্নভঙ্গ’ (প্রাগুক্ত) বলে বিদিত, সেই কবিতা তাঁর প্রতিভার পরমতম সম্পদে সমৃদ্ধ বলে সুধী সমাজে গণ্য এ-ও স্বাভাবিক নিয়মের এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম।

কিন্তু লক্ষণীয়, ‘বিদ্রোহী’ নির্জ্জলা বিদ্রোহী নয়।

সে ‘শ্যামের হাতের বাঁশরী’ তো বটেই। তাছাড়া

 চিত্ত-চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর থর-

 থর প্রথম পরশ কুমারীর!

আমি গোপন-পিয়ার চকিত চাহনি,

ছল-করে দেখা-অনুখন

আমি চপল মেয়ের ভালবাসা, তার 

কাঁকন চুড়ি কন কন

আমি চির শিশু, চির কিশোর,

আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড়

কাঁচলি নিচোর!

নাই-বা হলো নির্জ্জলা বিদ্রোহী! রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শে উচ্ছ্বসিত অপূর্ব্ব সৃষ্টি তো বটে!

এমন কি আর নজরুল ‘awoke one morning to find himself famous?’


*প্রবন্ধে লিখিত বানানরীতি অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে)

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা