× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আকণ্ঠ আলিঙ্গনে, প্রেমে তারা ক্ষ্যাপা

সাকিরা পারভীন

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ০৯:৩৬ এএম

কাজী নজরুল ইসলাম। স্কেচ: জয়নুল আবেদীন

কাজী নজরুল ইসলাম। স্কেচ: জয়নুল আবেদীন

শুরু করিলাম লয়ে নাম আল্লার

করুণা ও দয়া যার অশেষ অপার

আউজুবিল্লাহ হিররাহমান নিররাহিম বিসমিল্লাহ হিররাহমান হিররাহিম...কাব্য আমপারারে ঊনচল্লিশটি সূরার অনুবাদের শুরুর দুটি লাইন ঊনচল্লিশ বার ঊনচল্লিশ রকম করে অনুবাদ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। আমি অধম তার একটি দিয়ে শুরু করলাম কেননা এই ছাড়া আর কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছি না। হাজারখানেক শব্দ লেখার জন্য বেশ কদিন ধরে উঠেপড়ে লেগেও কোনো সুরাহা করতে পারছি না দেখে শেষে তাঁরই শরণাপন্ন হলাম। তাঁর বলতে তারা ক্ষ্যাপার। আর এও বুঝলাম যে যা কিছু তোমাকে অল্প-স্বল্প প্রভাবিত করে তা নিয়ে তুমি দু’চার লাইন লিখে দিতে পারো বৈকি; তবে যা তোমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে তাকে তুমি সহজে যেন প্রকাশই করতে পারো না। ধানসিড়ি সম্পাদক আমাকে তেমন বিপদে ফেলে কী শান্তি পাচ্ছেন তা তিনিই ভালো জানবেন। ‘এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি খোদা তোমার মেহেরবানী...।’ স্কুলজীবনে প্রতিযোগিতায় দোলনায় দুলতে দুলতে ছোট ভাইকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে মায়ের কণ্ঠে শিখে নেওয়া এই গজল দিয়ে শুরু; ভেতরে ভেতরে কী মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধারণ করতে শেখাল এই গান? ‘তারকা রবি শশী খেলনা তব হে উদাসী পড়িয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে রাশি রাশি...।’ এই গান দিয়েই শিখলাম তাঁর বিচিত্র স্বরূপ। ‘... চাই না বেহেশত্ খোদার কাছে নিত্য মোনাজাত করে হায়, খোদারই প্রেমের শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে হায়...।’ এই দিয়ে শিখলাম তাঁর কাছে পৌঁছাবার পথ ভয় নয় প্রেম। তারপর তিনি এলেন ঘুমে জাগরণে শয়নে স্বপনে... স্বপ্ন দেখতে শুরু করি একদিন ফিরোজা বেগম হব, নজরুলের গান শিখব; ধুর বললেই হয় নাকি? 

‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর 

নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ ...।’ মাধ্যমিকে পড়াকালীন বাড়িতে এলেন এক নতুন অতিথি। সনি কোম্পানির একটি শোয়া ভঙ্গিমার ক্যাসেট প্লেয়ার। শ্যামনগর বাজারে কঙ্কর দা’র দোকান থেকে মা প্রথম কিনে দিলেন ফিরোজা বেগমের নজরুল সংগীতের ক্যাসেট। শত শত বার সহস্র লক্ষ বার সেইসব গান শুনে শুনে শুনে শুনে গুনে গুনে কতবার জপেছি কত কল্পনার জপমালা কে জানে তার হিসাবনিকাশ। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন আমার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে খুলনা বেতারের কতিপয় শিল্পীর পুরনো হারমনিয়ামখানি ৩৮০০ টাকা মূল্যে কেনা হলো এলাকার শিল্পী গাজী সালাহউদ্দীন বাপ্পী ভাইয়ের সহযোগিতায়। সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতে ডেকে আনা হলো পরম প্রতিবেশী মধুকণ্ঠী ফাতেমা খালাকে। খালার আঙুলের কৃপায় বেজে উঠল যে গান তাতে গলে পড়ল লাল সিরাজীর গেলাস তন্বী সাকীর শরাব। হাই স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক নজরুল স্যারের বাড়িতে চলে গেছি, স্যার অনুষ্ঠান আছে, গান শিখায়ে দেন। ‘হলুদ গাঁদার ফুল রাঙা পলাশ ফুল এনে দে এনে দে নইলে বাঁধব না বাঁধব না চুল...।’ আমার নাছোড়বান্দা ভাব দেখে স্যার গালভরা হাসি নিয়ে বারান্দায় বসে স্যার শেখালেন নজরুলের গান। তখন জাতীয় দিবসগুলোতে স্কুলে, উপজেলায়, ইউনিয়ন পরিষদে নানা জায়গায় অনুষ্ঠান হতো । ততদিনে একটু-আধটু গান টান শিখে গেছি এরকম ভাব আদতে শূন্য থালা আজও তাই। গান-বাজনায় বেড়ে ওঠার সঙ্গ তবলিয়া তরুণ দা আশুতোষ দা’কে যখন তখন জ্বালাতন করি। সেবার হলো কী! মারাত্মক কন্ডিশন মানে ওপেন অনুষ্ঠানে গান করতে হবে। ও বাবা ম্যালা লোক, নকিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে লোকে লোকারণ্য। আমি পারব তো দাদা? হ্যাঁ হ্যাঁ খুব পারবি...তাল তো যাবেনে কেটে! ও কাটবে না, চরম সাহস দিয়ে তরুণ দা বাজালেন আর আমি ‘...কুসমী রঙ শাড়ি চুড়ি বেলোয়াড়ী বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরলাম। এবার কাট। বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছেই তো। তা কী করব। আমাকে স্মৃতিকথা লিখতে বলা হয়নি। লিখতে বলা হয়েছে নজরুলকে নিয়ে। তা লেখ। কী সমস্যা। সমস্যা তো অনেক। এই ভদ্রলোক এক বদ্ধ উন্মাদ, পাগল; অর্ধেকটা জীবন ইচ্ছা করেই পর্দা টানলেন ঘরের দরজায় যেন আর কেউ প্রবেশ করতে না পারে। ভালো করে তাকালেই দেখবেন কেমন লক্ষ্মী বাচ্চার মতন পঙ্গু প্রেমিকা প্রমীলা দেবীর হাতে ভাতের নলা খেয়ে নিচ্ছেন; যেন তার কোনো দোষ নেই অপরাধ নেই ছিল না কোনো দিন। চল্লিশ বছরেই রচনা করে ফেললেন চার হাজারের মতন কবিতা গান ছড়া অনুবাদ আরও কত কিছু। বিপ্লবী হলেন প্রেমিক হলেন পিতা হলেন প্রতারক হলেন অভিমানী আর প্রেমিক হলেন পান খাইলেন আর গান গাইলেন আর হলেন স্টাইল আইকন অভিনেতা হলেন চলচ্চিত্র পরিচালক হলেন দরিদ্র হলেন রাধা হলেন আর রাজাধিরাজ হলেন কোটি মানুষের অন্তরের মণিকোঠায়। চলে গিয়ে বেঁচে গেছেন একালে জন্মালে কবর থেকে তুলে পোড়ানো হত। হয়তোবা। সেই ছোটবেলায় নজরুলকে শুনতে শুনতেই থেকেই ক্লাসিক্যালের প্রতি জন্মালো অনুরাগ। আজো তা অটুট।

 ‘...তোমার সুরের নেশায় যখন

 ঝিমাবে আকাশ কাঁদিবে পবন

 রোদন হইয়া অসিব তখন 

তোমার বক্ষে দুলিতে তবু তোমারে দেব না ভুলিতে...।’ 

আর পাঁচজন বাঙালি নরনারীর মতন আমিও তুমুল ভাবে ফেল মেরেছি কিচ্ছু শিখতে পারিনি তবু তিনি এমন করে আমাকে অবিষ্ট করে রাখেন যে গুনগুন গাই যেন সে আমার তসবির জপমালা। যতবার শুনি নিলুফার ইয়াসমীনের কণ্ঠে ‘মালা যখন গাঁথ তখন পাওয়ার সাধ যে জাগে...।’ যতবার শুনি ইয়াকুব আলীর কাছে ‘বধূ তোমার আমার এই যে বিরহ একক জনমের নহে... যেন কিছুতেই শেষ হতে চায় না শুনবার লোভ; কেমন করে এমন করে লেখা যায় আর সুর... হা মাবুদ তুমিই তা ভালো জানো কেননা তোমার নির্মাণ সুরেই এরকম মনে হয় কেন কে জানে; আর আমার মনে হলেই বা কি ধুর...।’ ২০১৭ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করেছিল সিলেটে। অপূর্ব সুন্দর ছিল সেই আয়োজন। অতি নিবিষ্ট চিত্তে তারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য কাজ করে চলেছে নিরন্তর যেন 

আমি নৃত্য পাগল ছন্দ 

আমি আপনার তালে নেচে যাই আমি মুক্ত জীবনানন্দ…দিনের অনুষ্ঠান শেষে রাতের বেলা কবি আসাদ চৌধুরী, কবি রুরী রহমানের উপস্থিতিতে একটা স্বপ্নের মতন আড্ডাময় রাত কাটছে। টোকন দা’ও ছিলেন। আরও কেউ কেউ মনে নেই। তো কেউ কেউ অনুরোধ করলেন। খুব একটা জোর তাও কিন্তু নয়। ওরকম মানুষদের পেলে ইচ্ছে হবে না? ইট্টু জাহির করি নিজেরে খালি কলসি বাজে বেশি জানই তো নাকি! তো ধবধবে সাদা বিছানায় খুব করে গাইতে চেষ্টা করছিলাম ...

‘আসিবে তোমার পরম আত্মীয় কত প্রিয়জন কে জানে 

মনে পড়ে যাবে কোন সে ভিখারী পায় নি ভিক্ষা এখানে

তোমার কুঞ্জ পথে যেতে হায়

চমকি উঠিয়া যাবে বেদনায়

দেখিবে কে যেন মরে মিশে আছে তোমার পথের ধূলিতে

তবু আমারে দেব না ভুলিতে…।’

সেদিন তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। ভালোবাসা নাকি এ রকম হলেও হতে পারে। তেমন করে কি বাসতে পেরেছি ভালো? তিনি কি সত্যিই এসেছিলেন? তাহলে আমি একটা উদ্ভট চিৎকার কেন করেছিলাম, কেন মনে হয়েছিল তিনি খাটের ওপর এসে আমার সামনে বসে রয়েছেন। সবাই একটু বিব্রত হয়েছিল বৈকি, আমিও। কিন্তু তাতে আমার কোনো হাত ছিল না। সেই সেরকম তাঁর রূপ…।

 ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা… কে জানে অথবা হয়তো এসই কিছুতেই কিছু নয়। তবু বিশ্বাস করি তিনিই সেই 

 ‘...তিমির বিদারী অলখ বিহারী কৃষ্ণ মুরারি আগত ঐ

 টুটিল আগল নিখিল পাগল সর্বসহা আজি সর্বজয়ী...।’

অনুপ জলোটাকে আমি সালাম জানাই, আর যাঁরা নজরুলের গানকে ধারণ করে গেয়ে গেছেন, গেয়ে চলেছেন তাঁর গানগুলো আর আমাদেরকে সুধা থেকে সুধারসে সিক্ত করে চলেছেন তাঁদের পদতলে আমার আনত শ্রদ্ধা তাঁদের গলায় পুষ্পমালা, তাঁদের পবিত্র অধরে আঁকি চন্দনের তিলক আপনার মনে আকণ্ঠ আলিঙ্গনে প্রেমে। আর একটি কথা ছোট মুখে বড় কথাও হতে পারে তা হোক তবু বলি

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলের জীবন, কর্ম ও দর্শন পাঠ আবশ্যিক করা না হলে আমরা কোনো দিন মানুষ হব না। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা