× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইচক দুয়েন্দে: আমাদের না-পড়া একাকিত্ব

সৈকত আরেফিন

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ০৯:২৪ এএম

ইচক দুয়েন্দে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ইচক দুয়েন্দে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ইচক দুয়েন্দে শামসুল কবীর কচি চলে গেলেন।

এই বাক্যটি লিখতে গিয়ে মনে হলো, মৃত্যুর সংবাদ সবসময় কেবলই মৃত্যুর সংবাদ নয়। কখনও কখনও তা আমাদের দীর্ঘ বিস্মৃতির হঠাৎ প্রকাশ। মানুষটি হয়তো অনেক আগেই সরে গিয়েছিলেন আড্ডা থেকে, আলোচনার টেবিল থেকে, সাহিত্যসমাজের চেনা আলোকবৃত্ত থেকে, আমাদের নিয়মিত স্মৃতি থেকে। আর আমরা ভেবেছি, তিনি আছেন। কোথাও আছেন। নিজের মতো আছেন। তার মতো মানুষ তো থাকেনই অদ্ভুত, দুর্বোধ্য, কিংবদন্তির মতো দূরে। কিন্তু এই ‘দূরে থাকা’র ভেতরে যে কতখানি একা হয়ে যাওয়া থাকে, তা আমরা ভাবিনি।

শামসুল কবীর কচিকে আমরা ইচক দুয়েন্দে নামে চিনেছি। এই নাম তিনিই নিয়েছিলেন, কচিকে উল্টে ক+চ+ই= ইচক করে। তাকে আমরা মহামতি, মহাত্মা বলেছি, কেউ বলেছি দুর্বোধ্য, রহস্যময়, অস্বাভাবিক। কিন্তু এসব নামের আড়ালে যে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন শামসুল কবীর কচি, তাকে আমরা কতটা দেখেছি? তারও শরীর ছিল, ক্ষুধা ছিল, ক্লান্তি ছিল, অপেক্ষা ছিল, অভিমান ছিল। তারও হয়তো সামান্য আলাপের দরকার হতো। হয়তো চুপ করে পাশে বসে থাকার মতো একজন মানুষের দরকার হতো। অথচ আমরা তাকে মিথ বানিয়ে আরামে দূরে বসে থেকেছি। মিথের শরীর নেই, ক্ষুধা নেই, বিছানা নেই, ঘর নেই, একাকিত্ব নেই। কিন্তু ইচক দুয়েন্দের ছিল।

তার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে বারবার রাজশাহীর সেই বাড়িটার কথা মনে পড়ছে। সূর্যকণা স্কুল গলির শেষ মাথায় বিশাল, প্রায়-পরিত্যক্ত এক বাড়ি। অন্ধকার করিডোর। বন্ধ দরজা। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। এমন এক নীরবতা, যেখানে মানুষের বসবাসের চেয়ে সময়ের ক্ষয় বেশি স্পষ্ট। বিকালের আলোও সেখানে ঢুকে পূর্ণ আলোয় উদ্ভাসিত থাকতে পারত না। জানালা পেরিয়ে ঘরে এসে আলোই যেন আবছায়া হয়ে যেত। মনে হতো, বাড়িটির ভেতরে প্রবেশ করলেই সবকিছু ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে আলো, শব্দ, উপস্থিতি, মানুষের স্বাভাবিকতা সব। সেই বাড়িতে একা থাকতেন ইচক দুয়েন্দে। এই বাড়িতে যেমন তিনি থাকতেন, হয়তো বাড়িটিও তার মধ্যে থাকত। তার ভেতরেও হয়তো ছিল অন্ধকার করিডোর, অর্ধেক খোলা দরজা, মৃত আলো, হঠাৎ সরীসৃপের মতো নড়ে ওঠা বাক্য, আর এমন সব ঘর যেখানে আমরা প্রবেশ করতে ভয় পেতাম।

তিনি বলেছিলেন, ঘরে প্রায়ই সাপ আসে। কথাটি বলেছিলেন অবিশ্বাস্য স্বাভাবিকতায়। যেন সাপ কোনো আতঙ্ক নয়, কোনো বিপর্যয় নয় বরং সহবাসী। যেন মানুষেরা না থাকলে নিঃসঙ্গতারও নিজস্ব প্রাণিকুল জন্মায় সাপ, পোকা, দেয়ালের নোনা ধরা গন্ধ, বাতাস, ছায়া, পুরনো কাগজ, অসমাপ্ত বাক্য।

তখন কথাটি শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। আজ বুঝি, সেটি ছিল তার জীবনের এক অমোঘ রূপক। সভ্যতার আলো থেকে সরে গেলে মানুষের ঘরে অন্ধকারের প্রাণীরা ফিরে আসে। সাপ তখন শুধু সাপ থাকে না। সে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার প্রতীক। সে বলে দেয়, মানুষটি আর মানুষের সাধারণ জগৎ-ধারণার মধ্যে নেই; তিনি বাস করছেন অন্য এক অঞ্চলে যেখানে অর্ধেক বাস্তব, অর্ধেক ভাষা, অর্ধেক অরণ্য, অর্ধেক পরিত্যক্ত সময়।

আমি আর কথাশিল্পী কবীর রানা যেদিন তার কাছে গিয়েছিলাম, তিনি আমাদের কবিতা শুনিয়েছিলেন। কবিতা ঠিকই, কিন্তু সেটা আমাদের পরিচিত কবিতার মতো নয়। সেখানে সহজ আবেগ হয়তো ছিল, শ্রুতিমধুরতার পথ ছিল হয়তো কিন্তু পাঠকের প্রবেশের জন্য কোনো দরজা খোলা ছিল না। কারণ সে ভাষা ছিল অচেনা। ফলে আমরা কিছুই বুঝিনি। সত্যি বলতে, বুঝবার মতো প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। কবিতা শেষ হওয়ার পর আমরা কেউ কথা বলতে পারিনি। 

এই নীরবতাই হয়তো ইচক দুয়েন্দেকে বোঝার প্রথম পাঠ। তাকে সহজ ব্যাখ্যায় ধরা যায় না। তাকে সারাংশে নামানো যায় না। তাকে দুর্বোধ্য বলে সরিয়ে দিলে নিজের অক্ষমতাটাই শুধু প্রকাশ পায়। কিছু সাহিত্য মাথায় ঢোকে, কিছু সাহিত্য হৃদয়ে লাগে, আর কিছু সাহিত্য শরীরের গভীরে গিয়ে অস্বস্তি তৈরি করে। ইচক দুয়েন্দের লেখা সেই তৃতীয় ধরনের। তার অর্থ হয়তো প্রথমে মেলে না; কিন্তু অভিঘাত মেলে। মনে হয়, কোনো অচেনা প্রাণী আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। আমরা তার নাম জানি না, কিন্তু তার পায়ের শব্দ শুনেছি। আমরা তার ভাষা বুঝি না, কিন্তু তার উপস্থিতি এড়াতে পারি না।

আমরা যারা লিখি, আমরা বেশিরভাগই আপোসের মানুষ। আমাদের চাকরি আছে, সংসার আছে, সন্তান আছে, বাজার আছে, চিকিৎসা আছে, সামাজিক সম্পর্ক আছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। আমরা সাহিত্যকে ভালোবাসি, কিন্তু সাহিত্যকে আমাদের জীবন গ্রাস করতে দিই না। আমরা জীবন বাঁচিয়ে রেখে লিখি। অথচ ইচক দুয়েন্দে যেন লেখার কাছে জীবনটাই রেখে দিয়েছিলেন।

তার বইয়ের নাম লালঘর, টিয়াদুর। এই নামগুলো উচ্চারণ করলেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মানচিত্রে কেউ লাল কালি দিয়ে অচেনা চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। লালঘর ঘর আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই; রঙ আছে, কিন্তু উৎসব নেই; আছে রক্ত, গোপনতা, অন্তরীণতা, নিষিদ্ধ আলোর ঝিলিক। টিয়াদুর-এও তিনি জটিল রাজনীতির আপাত সরল বঙ্গানুবাদ করেন প্রতীকী ভাষায়।

আমরা তাকে কিংবদন্তি বানিয়েছি। কারণ কিংবদন্তি বানানো সহজ। দূর থেকে বলা যায় তিনি আলাদা, তিনি দুর্বোধ্য, তিনি অসাধারণ। কিন্তু একজন একা মানুষের পাশে বসা কঠিন। তার অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসা কঠিন। তার ভাঙা, জটিল, অস্থির ভাষা শুনেও ধৈর্য ধরে থাকা কঠিন। তার প্রয়োজন বুঝতে চেষ্টা করা কঠিন। জীবিত শিল্পীর পাশে থাকা কঠিন। মৃত শিল্পীকে শ্রদ্ধা করা সহজ। এখানেই আমাদের অপরাধবোধ।

ইচক দুয়েন্দের মৃত্যু তাই কেবল আমাদের ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি আমাদের সাহিত্যসমাজের আয়না। আমরা তাদের কথাই বলি, আমাদের প্রচলিত রুচির সঙ্গে যারা মিলে যায়। যারা প্রতিষ্ঠানের ভাষায় অনুবাদযোগ্য। যারা আলোচনায় সুবিধাজনক। যারা আমাদের আরাম নষ্ট করে না। আর যারা ভাষাকে বিপজ্জনক করে তোলে, যারা অর্থকে অনিশ্চিত করে, যারা পাঠকের অলসতা ভেঙে দেয়, যারা নিজের জীবনকেও সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর করে ফেলে তাদের আমরা দূরে সরিয়ে রাখি। মৃত্যুর পরে বলি, তারা অনন্য ছিল। কিন্তু অনন্য মানুষের জীবন অনেক সময় খুব কষ্টের হয়। এই কথাটা আমরা ভুলে যাই।

ইচক দুয়েন্দে ছিলেন বাংলা ভাষার ভেতরের এক গোপন অসুখ। এই অসুখ আমাদের স্বাভাবিকতার মিথ ভেঙে দিয়েছিল, আমাদের জাগিয়ে রেখেছিল। রাজশাহীর সেই বাড়িটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে, এখানে একজন মানুষ থাকতেন, যিনি প্রচল ভাষার ভেতরে অন্য এক পৃথিবী বানাতে চেয়েছিলেন। যিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের ভাষায় নয়; নিজের তৈরি করা, অচেনা, অদ্ভুত ভাষায়। আমরা হয়তো তা বুঝিনি। কিন্তু আগামী পৃথিবীর মানুষ নিশ্চয়ই সেই ভাষা বুঝবে। 

তার মৃত্যু শোকের, কিন্তু তার জীবন দাবি রেখে যায় বাংলা সাহিত্যকে আরও সাহসী করো। ভাষাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে দাও। অস্বস্তিকর লেখকদের পাশে দাঁড়াও। জীবিত শিল্পীকে মৃত্যুর আগেই পড়ো।

মৃত্যুর পর ফুল দেওয়া সহজ। জীবিত অবস্থায় অন্ধকার ঘরে গিয়ে বসা কঠিন।

ইচক দুয়েন্দের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি শ্রদ্ধা হলো তাকে ফিরিয়ে আনা পাঠে, আলোচনায়, পুনর্মুদ্রণে, স্মরণে, বিতর্কে। তাকে কিংবদন্তির নিরাপদ কুয়াশায় হারিয়ে ফেললে চলবে না। তার বই হাতে নিতে হবে। তার প্রতীকী ভাষার সামনে বসতে হবে। তার অস্বস্তিকে গ্রহণ করতে হবে। তাকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি ব্যর্থও হই, সেই ব্যর্থতাকে সম্মান করতে হবে। কারণ বড় শিল্প সবসময় আমাদের জয়ী করে না, কখনও আমাদের বিনম্র করে।

শামসুল কবীর কচি, ইচক দুয়েন্দেকে আমরা হয়তো যথেষ্ট ভালোবাসতে পারিনি। যথেষ্ট পড়িনি। যথেষ্ট পাশে থাকিনি। তাকে কিংবদন্তি বলেছি, কিন্তু মানুষ হিসেবে ছুঁতে পারিনি। এই দেরিতে বলা স্বীকারোক্তি তার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না। তবু বলতে হয়, তিনি বাংলা ভাষার সেই দুর্লভ মানুষদের একজন, যারা ভাষার জন্য নিজের জীবনকে সহজ হতে দেননি।

ইচক দুয়েন্দে চলে গেছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া অন্ধকার নিভে যায়নি। সে অন্ধকার এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমরা, এতদিন পরে, প্রথমবারের মতো তার চোখের দিকে তাকাতে শিখছি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা