× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দুমুখো মহল্লার কিসসা

ইসরাত জাহান

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ০৯:২৫ এএম

দুমুখো মহল্লার কিসসা

বিশেষ্যবিহীন এক সন্ধ্যায় ‘হাজী রহিম বক্স লেন’ মহল্লার ধূসর আকাশ থেকে ভেসে আসে একটি শোকবার্তা। বার্তাটি শুনে পুরো এলাকাবাসী প্রথমে স্তম্ভিত হয়। হয়তো সেই সন্ধ্যায় বিদ্যুতের খুঁটির তারে ঝিমিয়ে থাকা কাকগুলোও সচকিত হয়ে তাকায় আশপাশে। স্তম্ভিত ঘোর কেটে গেলে কিছু ভাই ব্রাদার শোকাহত হয়। আর বাকিরা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে জিলাপি ও বাখরখানি খায়। অল্প সময়ের মধ্যে একই পাড়ার সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া মানুষগুলো নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন দলভুক্ত করে। কয়েকজন এই বিভক্তির কারণ নিয়ে দীর্ঘ আলাপ শুরু করেন। গরম চা পিরিচে ঢেলে ঠান্ডা করার অবসরে দুয়েকজন পুরনো বয়ান শোনে। দুয়েকজন চা ফুঁকে ফুঁকে ঠান্ডা করে। দুয়েকজন কলা চায়ের সঙ্গে রুটির ভিজিয়ে খায়। এই সন্ধ্যাটা অন্যসব সন্ধ্যার মতোই সাধারণ একটি রাতে এসে ফুরাতে পারত। কিন্তু তা হয় না। বিষাদবার্তাটি মহল্লাবাসীর ঘরে ঘরে নানান কানে পিনপিন করে ঢুকে পড়ে। যা শুনে কিছু মুরব্বি ফিরে যায় পুরনো এক সন্ধ্যার স্মৃতি-রোমন্থনে...।

পাঁচ বছর আগের সেই সন্ধ্যাটাও আজকের মতোই ছিল...

ঘিঞ্জি এই মহল্লায় দুপুরের পর থেকে তেলে ডোবা মচমচে ভাজাপোড়ার উৎসব নতুন কিছু নয়। রোজকার আয়োজন। বৌ-ঝিরা এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে উঁকি দিতে দিতে মোগলাই পরোটায় কামড় দেয়, কাবাব খায়, ঘুগনি মাখায় জব্বর ঝাল খেয়ে আহ্ উঁহু করে। সারা দিন রিকশার টুংটাংয়ের সঙ্গে টানা ঢেলার হুড়হুড়িটা বিকালে একটু বেশি থাকে। আরও থাকে রাস্তার পাশে চিকন নালাগুলোতে হলদে থকথকে ভাসমান এটা সেটা। বাতাসে দুর্গন্ধের পরিমাণটাও যেন একটু বেশি থাকে এই শেষবেলায়। সেই সঙ্গে থাকে আশপাশের দোকান ও রাস্তায় হুড়াহুড়ি ও গালাগাল। এই পরিবেশে অভ্যস্ত লোকজন সেই দিন প্রথমে বুঝতে পারে না, কোথা থেকে ভেসে এলো এমন শব্দ। কাঁধে কাঁধ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর অন্দরমহলে নামাজে দণ্ডায়মান নারীরাও শোনেন সেই ডাক। কিছু সময়ের জন্য থেমে যায় তাদের বিড়বিড়িয়ে সুরা আওড়ানো ঠোঁট দুটো। অতি-আগ্রহীরা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে তাড়াতাড়ি সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করে। ঘটনার সূত্র ও শেষ জানার আগ্রহে জায়নামাজ দ্রুত ভাঁজ করে উঠে যায়। তসবিহটা আঙুল লটকে থাকে। সেদিন হয়তো অনেকে ভুলে যান মোনাজাতে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুছিয়ে রাখা নীরব আর্জিগুলো। মা-খালা শ্রেণির শ্রদ্ধেয় মুরব্বিরা আরও টনটনে গলায় বলে ‘কইবার লাগছে, তয় কামডা ক্যামতে হইলে!’ 

অনেকে তসবিহ হাতে নিয়ে মনে করার চেষ্টা করেন তাদের বাপ-চাচার আমলে মহল্লাটা কেমন ছিল; কয়েকজন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কথা বলে নিজেদের ভেতরে বাইপাস মতান্তর টেনে আনেন। 

তবে সেই দিন...

মহল্লার সরল-গড়ল পুরুষরা সময় তারিখের জটিলতা মনে রাখেন না। তারা যে যেখানে! যে অবস্থায় থাকেন, সে সেই অবস্থায় থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসেন। কারও হাতে মোটা বাঁশ, কেউবা চিকন লাঠি আবার কেউ আসেন টুকরো রড নিয়ে। বলবান তাগড়া যুবকরা আসেন বিশাল বুকের ছাতি নিয়ে। সেই দিন মসজিদের ইমাম সাহেবের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা ডাকটি কাউকে থামাতে পারে না। মসজিদের ইমাম সাহেব ডাক মানে রহিম হাজীর ডাক। যেহেতু ইমাম সাহেব হাজী বক্সের অধীনস্ত ছিলেন, তাই মহল্লাবাসী জানেন ওটা রহিম হাজীরই ডাক। সবাই ওটা জেনেই ছুটে এসেছিলেন। এই গলির সবাই হাজী মিয়াকে খুবই মান্য করেন। পিঠপিছনে কেউ কেউ গালাগাল দিলেও তার সামনে সবাই হাত দুটো বগলে ঢুকিয়ে দিলখুশভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর হাভাতে গুলি মলিন চেহারা নিয়ে দৃষ্টিগোচর হওয়া আশায় সকাল-বিকাল ঘুরঘুর করে ‘হাজী রহিম বক্সে ম্যানসন’-এর আশপাশে। হাজী সাহেব এমনিতে বেশ ভালো মানুষ। সবাইকে বুকে টেনে নেন, লোকজনের দুঃখে কেঁদে ফেলেন। বৃদ্ধ বালক সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলেন। মুরব্বিদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেন। কোভিডের সময় পুরো মহল্লার সবার জন্য ফ্রি মাস্ক বিলি করেছিলেন। সঙ্গে ছিল হ্যান্ড সেনিটাইজার, চাল, ডাল, তেল, চিনি নানারকম সাহায্য। পরে অবশ্য সবাই জেনেছেন সরকার দিয়েছিল সেই সাহায্য। হাজী মিয়া শুধু বিলিবণ্টন করেছেন। তাও তো করেছেন। সে কারণে এই লোকটার যেকোনো ডাকে ‘হাজী রহিম বক্স লেনের’ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেদিন পাশের মহল্লার সঙ্গে হাজী মিয়ার বিবাদের ওসিলায় অনেকেরই সেই দিন হাতের আঙুল খোয়া যায়, কয়েকজনের পায়ে রড-স্ক্রু গুঁজতে হয়। বাকিদের চামড়ায় টুকটাক আঘাতের চিহ্ন থাকে অনেক দিন। 

অবশ্য সেই সন্ধ্যায় তার ডাকে সবাই বের হয়ে এলেও নাক-ব্যাঁকা বিজু আসেন না। অবশ্য বিজু যে আসবেন না, সেটা রহিম বক্স জানতেন। আর আসবে কীভাবে! নাক-ব্যাঁকা বিজুর পা দুটো অচল। অচল হয়েছিল সেটাও আরও বছরখানেক আগের এমনই আরও একটি ডাকে। বিজু তখন জোয়ান ছ্যাড়া৷ হাজী সাহেবের ডান হাত। রহিম মিয়ার ব্যাংক থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিল সব কাজ একার হাতে করতেন বিজু। একেবারে ঘরের ছেলে। ঘরের ছেলে হতে হতে একটা সময় বিজুর খায়েশে হয়, হাজী মিয়ার জামাই হওয়ার। অবশ্য সেই গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছিল হাজী মিয়ার বড় মেয়ে মাইমুনার কাছ থেকে। রাত-বিরাতে মাইমুনা এটা-ওটা নানা আবদার মেটাত বিজু। সেই কারণে বা অন্যকোনো আকাঙ্ক্ষায় মাইমুনা ‘দিল’ দিয়ে দেয় বিজুকে। দুজনের মনে লাড্ডু ফোঁটে। প্রতি রাতে একই স্বপ্ন দেখে দুজনে ঘুমান।

সেসময় হয়তো মাইমুনা রাত ১০টা বলল ‘চটপটি খিলাইবা বিজু ভাই’ আধাঘণ্টার ভেতরে চটপটি নিয়ে হাজির হয় বিজু। আরও কতশত ঢং-আহ্লাদ মেটাত বিজু। ওর দিলের মহারানী ছিল রহিম হাজীর বড় শাহাজাদি। হঠাৎ এক দিন রহিম হাজীর ম্যানেজার বিজু ও মাইমুনার পিরিতির কথা জানায় রহিম মিয়ার ছোট বিবি হাফসাকে। স্বামীভক্ত হাফসা মনে মনে বিজুকে চোখে হারাত। সতীনের সন্তানের সঙ্গে মারডালার প্রেম মেনে নিতে কষ্ট হয়। এক রাতে একান্ত সময়ে রহিম হাজীর বুকের কাঁচাপাকা লোমে আঙুল বুলাতে বুলাতে কথাটা বলে ফেলে তার প্রাণপ্রিয় স্বামীকে। সেই কথা শুনে রহিম হাজী ভেতরে ভেতরে রেগে কয়লা হলেও কাউকে কিছু বুঝতে দেন না। নীরবে নিজের কাজ গুছিয়ে নেন। আর বিজুকে চোখে চোখে রাখেন। আরও মহব্বত করে বা দেখান। বিজু সেই খুশিতে জান কোরবান করার জন্য প্রস্তুতি নেন। রহিম হাজী তার আপনা লোক তার কিছু হলে বুক পেতে দেবেন। 

হঠাৎ এমনই এক সন্ধ্যায় মসজিদের মাইক থেকে এমনই এক ডাক আসে।

‘রহিম হাজীর বাড়িতে ডাকাত পড়ছে, ‘ব্যাবাকে অ্যাহো।’

সন্ধ্যার সেই ডাকে সবাই ছুটে যান। সবার আগে ছুটে যান বিজু আর ফেরে সবার পরে থেঁতলানো পা দুটো কোমরের সঙ্গে ঝুলিয়ে। সারা গায়ে কোপের দাগ নিয়ে। ডাকাত দল রহিম হাজীর চারতলা বাড়ি থেকে কিছুই নেয় না। শুধু বিজুকে চা-পাতি দিয়ে কুপিয়ে যায় কসাইয়ের মতো করে। রহিম হাজীর দয়ার শরীর। বিজুর চিকিৎসা করেন। মামলা করে অজানা কয়জন ডাকাতের নামে। মাইমুনা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেন ৷ তিন মাস পর সেই মামলারই বাদীপক্ষ হাজী মিয়া কেস তুলে নেন। তার কয়দিন পরে মাইমুনার আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সঙ্গে শাদি হয়। জামাইয়ের পাত্তি ও স্বাস্থ্য দুটোই মাশা-আল্লাহ বেশ ভালো ছিল। পাড়ার সবাই একবেলা পেটভরে খানা খেয়ে আসেন। দুয়েকজন মাইমুনার সোয়ামিকে দেখে মুখ টিপটিপে হাসে, পিঠপিছনে অনেকেই বলেন ‘কাউয়ার মুখে ডেউয়া দেইখা আইলাম ভবে।’ আর মাইমুনার দাদি বলে ‘বেটিয়াকো পানি মে ফেক দিয়া থা, রহিম?’

তবে হাজী মিয়া মেয়েকে পানিতে না ভাসালেও মহল্লার পানির সংকট তার বাড়িতে বসানো গোপন পাম্পের কারণে শুরু হয়েছিল। কয়কজন তা বুঝতে পারেন। এক দিন সাহসী কয়েকজন তার বাড়িতে গিয়ে পাম্পটি জব্দ করেন। হাজী সাহেব সেই সন্ধ্যায় মহল্লাবাসীকে একত্রিত করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে নিজেই পাম্পটি খুলে ফেলেন সবার সামনে। সেদিন আবারও সবাই রহিম হাজীর ওপর খুশি হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল এক সপ্তাহ। তারপর হঠাৎ এলাকায় কিছু মানুষের ওপর আল্লাহতায়ালা নাখোশ হয়। সে কারণে তারা নানারকম পুলিশ হয়রানির শিকার হন। তাদের বাড়ির দলিলপত্রে ঘাপাল দেখা যায়। শরিকদের সঙ্গে বিবাদ শুরু হয়। মারামারি কাটাকাটি করে দুয়েকজন জেলহাজতেও যান। তারপর সবকিছু আবারও স্বাভাবিক হয়। কিন্তু নতুন করে শুরু হয় পানির আগের সেই সংকট।

আর তা হঠাৎ এক দিন চায়ে পাত্তি দিতে দিতে টং-দোকানের রাজ্জাক মিয়া খেয়াল করেন। রাজ্জাক কেঁচো খুঁড়ে সাপ বের করে আনেন। সাপ এসে জানান দেয়, সেই সন্ধ্যায় রহিম হাজীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করা সবাই কোনো না কোনোভাবে ঝামেলায় পড়েছেন। এরপর সবার টনক নড়ে। এলাকার সবাই রহিম হাজীর বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটচলা বন্ধ করে দেন। যদি যানও, যাওয়ার আগে দুইবার আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে মাখা নিচু করে আসা-যাওয়া করেন। নেক দিলের হাজী মিয়াকে আর কেউ ঘাটায় না। তারপর থেকে হাজী রহিম বক্স লেনের সবাই কিছু বলা বা করার আগে একবার নিজেরা আলোচনা করে তারপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ধর্ম চিন্তায় কাটে ময়মুরুব্বিদের দিনকাল। হাজী মিয়ারও বয়স হয়েছে এখন। মাইমুনার লাশ পাঠিয়েছেন জামাই দামি কফিনবন্দি করে। সেই থেকে হাজী মিয়া রোগে-শোকে কাতর। তবে ব্যবসা তার তড়তড়িয়ে এগিয়ে যায়। দেয়ালের কান এড়িয়ে অনেকে ফিসফিস করে বলেন রহিম মিয়ার গোডাউন রাত-বিরেতে ট্রাকে এটা-সেটা আসে সেই গল্প। বাকিটুকু বলার আর কেউ সাহস পান না। 

আজকের এই দিন

রাত এখন বারোটা, আজকের সন্ধ্যার শোকবার্তাটির জন্য পুরো লেনবাসী জেগে আছেন। পুরো মহল্লাবাসী এখন রাস্তায়। আশপাশের লেন থেকে শোকে কাতর লোকজনও আসেন। 

সবাই এখন অপেক্ষা করছেন নাক ব্যাঁকা বিজুর জন্য। দুই পা হারানো বিজুর অনেক সময় লাগে সিঁড়ির ধাপগুলো পার হতে। এই সময়ের ভেতরে বিজু মুখে বেশ পরিমাণে থুতু জমায়। জানাজায় শরিক হওয়ার আগে ওর মুখভর্তি থুতুটা যথাস্থানে ছিটিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা