× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মায়ার মরীচিকা

গাজী তানজিয়া

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ০৯:০২ এএম

আপডেট : ১৫ মে ২০২৬ ১৪:৫৩ পিএম

মায়ার মরীচিকা গল্পের প্রচ্ছদ এঁকেছেন শতাব্দী জাহিদ। পাশে লেখক গাজী তানজিয়া। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মায়ার মরীচিকা গল্পের প্রচ্ছদ এঁকেছেন শতাব্দী জাহিদ। পাশে লেখক গাজী তানজিয়া। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাড়ির সামনের সুপারি বাগানটা অনেক দিন পর সাফ-সুতরো করা হচ্ছে। চারজন ঠিকা লোক লাগানো হয়েছে। তারা দা, কাস্তে আর লম্বা লাঠি নিয়ে সকাল থেকে কাজে লেগে পড়েছে। আজ দিনের মধ্যে এত বছরের জমে থাকা আগাছা, পরগাছা সব পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। জরমনি লতা, সটি গাছ, ভাটফুল, বুনো ডুমুরসহ আরও নানা জাতের আগাছায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে বাগান। বুনোঝোপ আর অন্ধকারে ছাওয়া জায়গাটায় বর্ষাকালে দিনের বেলায়ও পা রাখতে গা শিরশিরানি অনুভূতি হয়। সাপ কোপের অবাধ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। ঝুম বৃষ্টির পর যে পানি জমে, সেখানে ড্যানডেনি মাছের সাথে সাঁতরে যেতে দেখা গেছে মেটে সাপ থেকে বাস্তু সাপেদের। 

দীর্ঘ দিনের অক্ষমতার সাথে ক্ষমতাহীনতায় জন্তু থেকে মানুষ দুই ধরনের সাপ ও শ্বাপদেরা দিনে দিনে নধর হয়েছে, বিচরণ হয়েছে অবাধ!

আসগর আলি তার পুরনো পলেস্তারা খসে পড়া বারান্দায় বসে আছেন হুইল চেয়ারে। মন ভরে দেখছেন সব কর্মযজ্ঞ। কতকাল, কতকাল পর তার বাড়িতে এমন একটা আয়োজন হতে চলেছে। আসলে এমন আয়োজন তার বাড়িতে কখনও হয়ইনি। যখন তিনি দোর্দণ্ড প্রতাপে দল করতেন, তখন হয়েছে কি? না। যখন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তখনও না। মেয়ের বিয়ের দিনও না। মেয়ের বিয়েতে তো তিনি কোনো আয়োজনই করতে পারেন নাই। আয়োজন করার মতো অবস্থা তার ছিল না। দীর্ঘ দমন-পীড়ন বলতে গেলে তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। দিনের পর দিন চিকিৎসার খরচ, তার ওপরে চলাফেরা করতে না পারায় ব্যবসাটা একেবারে বসে গেছে। জায়গাজমি যা ছিল বেচতে বেচতে যখন বসতবাড়িতে এসে ঠেকেছে, সেই সময়ে এসে ছেলেটাও বড় হলো, মেয়ের জামাই হাতে ধরে টুকটাক কাজকর্মে শামিল করতে শুরু করল। ছেলে চাকরি করবে এই দুরাশা তার ছিল না। ছিল না কারণ, চৌদ্দ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কুষ্ঠি ঠিকুজি কখনোই মেলানো যেত না!

দলীয় প্রধানের আসবার খবরটা ততক্ষণে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিস্ময়ভরা কৌতূহল নিয়ে আগের দিন রাত থেকে তার বাড়িতে পার্টির সব ধরনের নেতাকর্মীরা আসছেন দলে দলে। 

আসগর আলি গুম হয় নাই, আসগর আলি খুন হয় নাই। তাকে দেখতে নেতা কেন আসবেন ভেবে পায় না কেউ!

অন্যদের কী দোষ, মাঝে মাঝে তার নিজেরই তো বিশ্বাস হয় না। নিজের গায়ে নিজে চিমটি কেটে দেখেন।

নেতা কি সত্যিই আসবেন তাকে দেখতে!

এমন হাজারো আহত, নিহত নেতাকর্মী তো আছেন দলে, সবার কাছে, সবার পরিবারের কাছে কি নেতা যাবেন একে একে? নাকি শুধু তার বেলাতেই! 

কেউ কেউ সরাসরিই জিজ্ঞেস করে বসে, কেমনে যোগাযোগ হইল নেতার সাথে। কার মাধ্যমে?

আসগর আলি একটু রহস্য করেন, খোলাসা করেন না বিষয়টা। 

ইরফান মেম্বার রহস্য ভাঙার ভঙ্গিতে বলেই ফেলে, পত্রিকায় দেখছি কয়েক দিন আগে, আপনে নাকি মরবার আগে একবার নেতার দর্শন চাইছেন। নেতা যে এই খবর দেখবেন বা এত জলদি সাড়া দেবেন, এইটা কারও কল্পনাতেও আছিল না।

এই ইরফান একটা ধুরন্ধর। সামনে সে চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াবে। গ্রুপিং পলিটিক্সে সে তার বিরোধী গ্রুপের। আসগর আলি যতই পঙ্গু হোক, অচল হোক, প্রতিদ্বন্দ্বী তো প্রতিদ্বন্দ্বীই। তার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা হুমকি বইকি!

আসগর আলি ইরফানের এই কথাকে প্রায় উড়িয়ে দিয়ে বলেন, তোমরা মিয়া কী দল করো? এইটা বোঝো না, কর্মীর কাছে নেতা যেমন প্রিয়, নেতার কাছেও তো তার কর্মী প্রিয়। তাদের ডাকে মাঝে মধ্যে সাড়া না দিলে চলে!

আসগর আলির এই দার্শনিক ধরনের কথার কোনো গুরুত্ব ইরফানের কাছে নাই। সে জানে, রাজনীতি নামক দাবার গুটি এখন কোন কোর্ট থেকে কোন কোর্টে ঘুরছে! সামনে জাতীয় নির্বাচন, তিনজন মনোনয়ন প্রার্থী তিন রকমের কার্ড নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে। তারই একটা কার্ড খেলা হচ্ছে হয়তো এখন!

ভোর হতেই দুটি ছোটবড় ট্রাক হাজির হয় বাড়ির সামনে। একটা ট্রাক থেকে রান্নার সরঞ্জাম নামল তো অন্যটা থেকে লোকাল বালি, অরেকটা থেকে ডেকোরেটরের সরঞ্জাম। আসগর আলি এর কিছুই জানতেন না। একে একে ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে বাঁশ, শামিয়ানা, চেয়ার আর বিশালাকার মনিটর ও প্রজেক্টর। 

খানিক বাদে মনোনয়ন প্রার্থীদের একজন নামলেন চকচকে কালো জিপ থেকে। লম্বা সালাম দিয়ে বললেন, ‘আসগর ভাই, প্যান্ডেলের ব্যবস্থা করে দিলাম। এখন আর কোনো ঝামেলা নাই। বর্ষা-বাদলের দিন, লোকজন আসবে মেলা, সবাই এই প্যান্ডেলেই বসবে। স্যাঁতসেঁতে উঠোন, কাদা হয়ে যাবে তাই বালির ব্যবস্থা করা হইছে। আপনার কোনো চিন্তা নাই।

আসগর আলি অবাক হন, তবে চিন্তিত না। এমনিতেও তিনি এসব নিয়ে চিন্তা করার অবস্থায় নাই। শরীরটা তার খুবই খারাপ যাচ্ছে। তিনি শুধু চেয়ে চেয়ে এই তিন প্রতিযোগীর মধ্যে কে কার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে, সেই মহড়া দেখে যাচ্ছেন! যে যার গ্রুপের লোক নিয়ে শোডাউনের ওপর শোডাউন করে যাছে। এই তিনজন সক্রিয় প্রার্থীর ক্রিয়াকলাপ ছাড়াও আরও আছে কিছু আধা সক্রিয়, তারাও দলবলসহ ঘুরপাক খাচ্ছে। এ দেশের প্রায় সব টাকাওয়ালা মানুষের মধ্যে একটা কমন ইচ্ছা আছে। জীবনে একবার না একবার এমপি হবে। আমলা থেকে ব্যবসায়ী, খেলোয়াড় থেকে জুয়াড়ি, নায়ক থেকে গায়ক রাজনীতি করুক না করুক জীবনে তাদের একটাই ইচ্ছা এমপি-মন্ত্রী হবে। নাম, যশ, সম্পদ আর সাথে দুর্নাম কেনার এমন সহজ পন্থা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। তবুও গরিবের কাবিখা, টিআর থেকে শুরু করে মেগা প্রজেক্টের হাজার কোটির হাতছানি তাদের স্বপ্ন, জাগরণকে আরও রোমাঞ্চিত করে।

ওদিকে ঘন ঘন চায়ের জোগান দিতে দিতে অস্থির আসগর আলির স্ত্রী লুৎফা বেগম। এসব হাঙ্গামা তার জীবন থেকে বিদায় নিয়েছিল অনেক আগে। আজ যে আবার ফিরে এসেছে, তাতে তিনি অখুশি নন। তবে মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা অবিশ্বাসের দোলাচল। 

তিনি আবারও একবার তার স্বামীর কাছে জানতে চান, সত্যিই কি তিনি আসতেছেন?

তোমার বিশ্বাস হয় না?

হওয়ার কি বিশেষ কারণ আছে?

না হওয়ার কারণইবা কী?

আচ্ছা, বছরে বছরে হিসাব করলে কম তো হইল না! যুগ পার হইয়া গেছে। একদিন একটা ফোনও তো এলো না তার কাছ থেকে! প্রতিদিন কত আশায় আশায় থাকতা এই বুঝি কিছু ঘটবে! রাজনীতিটা তো ভার্চুয়াল হয়ে গেছিল অনেক আগেই, তারপরও ঘটল না।

ঘটবে কীভাবে? দেশটা কি তখন এত স্বাভাবিক ছিল? এই কয়দিনেই ভুইলা গেলা! এই হইল বাঙালির স্মৃতিশক্তির দৌড়!

লুৎফা বেগম এই কথায় একটু দমে গেলেন। ঠিকই তো! কোনো কিছু তো এত স্বাভাবিক ছিল না তাদের জন্য। একের পর এক উঁচু দেয়াল শুধু ঢেকে ফেলছিল তাদের উড়বার আকাশ।

সেবার, সেই নির্বাচনের বছর! ঘটনার পর অনেক দিন আসগর আলির স্মৃতিতে ছিল না কিছু। হাসপাতালের ঘর, ওষুধ আর ফিনাইলের গন্ধ। হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের অস্তিত্ব উধাও হয়ে যাওয়ার ট্রমা কাটাতে চলে যায় বছরের পর বছর। 

অতঃপর একসময় ধীরে ধীরে দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে আসতে শুরু করে স্মৃতিরা! বারবার, বারবার পুলিশের সামনে ক্লান্তিকর বয়ান দিতে দিতে অনেকটা সিনেমার ফ্লাশব্যাকের মতো করে সামনে আসতে থাকে সেই সময়, সেই দিন…।

এরই মধ্যে শোরগোল ওঠে বাইরে। 

এখন আবার বাইরে কী হলো? তিনি হুইল চেয়ারটা নিয়ে বারান্দার দিকে এগোতে এগোতে ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিলেন সেই দিনটাতে। সেদিনও সকালবেলা বাড়ির উঠোনে এমন শোরগোল শুরু হলে তার আত্মাটা কেঁপে উঠেছিল। ভোটকেন্দ্রের দিকে রওনা হবেন ঠিক ওই সময়ে তার ছোট ভাই আনিস দৌড়াতে দৌড়াতে এসে লুটিয়ে পড়েছিল প্রায়! আনিসের চোখেমুখে ক্ষোভ, একই সাথে আতঙ্ক! 

ভাইজান, কেন্দ্রে তো ঢুকতে দেয় না ভোটারগো! 

কী কস! ভোট দিতে পারো নাই এখনও?

সাথে থাকা দলের কর্মীরা সমস্বরে বলতে থাকে, ভোট দিতে গেছিলাম। বিরোধী পক্ষ কেন্দ্রে ঢুকতে দিল না। কইল, ‘এখানে কাম কী? তোমাগো ভোট দেওয়া হইয়া গেছে। বাড়ি যাও মিয়া!’

আমরা জোর কইরা ঢুকতে গেলাম, ওরা বাধা দিল।

কাউরে ঢুকতে দেয় না কেন্দ্রে?

না, পথ থাইকাই ভোটারগো ফিরায়ে দিতেছে।

বাড়ির পাশের কেন্দ্রই ওরা দখলে নিয়ে নিছে, বাকিগুলার না জানি কী অবস্থা!

সব কেন্দ্রই ওদের দখলে। ওদের কাছে অস্ত্র আছে, বোমাও।

হুড়মুড়িয়ে খবর আসতে থাকে, একের পর এক।

আসগর আলি থানার ওসিকে ফোন দেন। দুবার, তিনবার ফোন বেজে যায়, ওসি সাহেব ফোন তোলেন না। মোবাইল বিজি। এমন করে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টার পর যখন তাকে পাওয়া গেল, তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, আমরা দেখতেছি বিষয়টা, আপনি টেনশন নিয়েন না। আর বোঝেনই তো, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নির্বাচনে পেশিশক্তির প্রভাব থাকবে, টাকার খেলা থাকবে, অল্পবিস্তর কারচুপি থাকবে এসব তো অজানা কিছু না!

কিন্তু ভোটকেন্দ্রে স্বয়ং প্রার্থীই ঢুকতে পারবে না, এমন ঘটনা কে দেখছে কবে!

আপনাকে কে যেতে নিষেধ করবে? আপনি যান, আমাদের ফোর্স আছে তো, আপনাকে কে আটকাবে? কেনই বা আটকাবে? দেশে গণতন্ত্র আছে না!

আসগর আলি গণতন্ত্রের ভরসায় না, পুলিশের আশ্বাসেও না, তিনি তার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে রওনা দিয়েছিলেন ভোটকেন্দ্রের দিকে…!

কিন্তু ওই তার শেষ নিজ পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা হবে কে জানত!

বিকট আওয়াজ ধোঁয়ায় ধোঁয়াসা চারিদিক, অসাড় শরীর আর চিরদিনের জন্য হুইল চেয়ার হয়ে রইল তার নিয়তি!

বাইরের শোরগোলটা আরও বেড়েছে মনে হয়। তিনি হুইল চেয়ারটা নিয়ে বারান্দায় পৌঁছতে পৌঁছতে শুনলেন, শামিয়ানা টাঙাতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে গেছে আদম সুরত। আদম সুরত তার বাড়ির কাজের মেয়ে হানিফার ছেলে। বয়স এগারো কি বারো বছর। এই তো সেদিন জন্মাল ছেলেটা! আসগর আলির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কিছু হলো না তো ছেলেটার! 

কেউ একজন জোরে জোরে বলছে, কোমরে চোট পাইছে খুব। ভাঙছে নাকি কেডা জানে! হাসপাতালে নিয়া চলো জলদি।

আদম সুরত স্কুলে যায় না। দুরন্ত, ডানপিটে ছেলে, কিন্তু মাকে খুব ভালোবাসে। বাপ চলে গেছে মাকে ফেলে। চার জনের পেট চালাতে একলা মায়ের চার বাড়িতে যমের খাটুনি। মায়ের কষ্ট কমাতে এই বয়সেই সংসারের হাল ধরতে চায় সে! তাই তো সাধের স্কুলে যাওয়াও ছাড়তে হয়েছে তাকে। কোথাও কোনো ফুট-ফরমাশের কাজ পেলেই আদম সুরত হাজির হয় সেখানে। তবে ধরাবাঁধা কাজ সে কখনোই করে না। অদম্য আদম পড়ে গিয়ে যতটা না ব্যথা পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি তাকে বিব্রত মনে হচ্ছে। কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে সে একবার একলা একলা উঠতেও চেষ্টা করে, কিন্তু তীব্র যন্ত্রণা তাকে কাবু করে ফেলে। তার চোখেমুখে যন্ত্রণা ছাপিয়ে ফুটে ওঠে হতাশা। কারণ কোমরের কাছটা ক্রমশ অবস হয়ে আসছে। চাইলেও নড়তে পারছে না সে।

এরই মধ্যে তার মা কোত্থেকে ছুটে এসে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে। এই কান্নার মধ্যে ছেলের জন্য দরদ যতটা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তা। ছেলের চিকিৎসা কীভাবে হবে সেই নিয়ে সংশয়। 

মায়ের বিলাপের সাথে সাথে আদম সুরতকে ঘিরে জড়ো হওয়া লোকেদের শোরগোল ক্রমশ বেড়ে চলেছে। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সদর হাসপাতাল, সেও তো এখান থেকে দশ-বারো কিলোমিটার দূর। রিকশা, ভ্যান, যা হয় একটা এক্ষুনি হাজির করা দরকার। হাতের কনুইয়ের কাছটা কেটে গিয়ে স্রোতের মতো গল গল করে রক্ত বের হচ্ছে। 

আসগর আলি তার ছেলেকে অস্থির ভঙ্গিতে ডাকতে থাকেন বাবু, বাবু!

খানিক বিরক্তি নিয়ে বাবার ডাকে ছুটে আসে বাবু।

ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে, রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করতেছি, এর মধ্যে ডাকতেছেন কেন?

ডাকতেছি কি সাধে! ওরে নিয়ে হাসপাতালে যাবি না!

এত অস্থির হওয়ার কিছু নাই আব্বা, ফার্স্ট এইড যা দেওয়ার দিয়ে দিছি। তাদের কাছে খবর পৌঁছে গেছে।

তারা কারা?

আপনি যে কোন জগতে বাস করেন! সকাল থেকে দেখতেছেন না, তাদের শোডাউন! আমরা যা আয়োজন করার তো করতেছিলাম, এতো ধুম-ধামের তো দরকার ছিল না।

ওসব দলীয় কাজ কারবার তুমি বুঝবা না!

আমি বুঝব না? সত্যিই বলছেন, মনোনয়নের মৌসুম না হলে আপনি বুঝতেন। একলাই বুঝতেন!

তার ওপরে আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেতা আসতেছেন। আদমের কপালটা ভালো বলতে হবে, গাছ থেকে পড়ে হাড়গোড় ভাঙলেও, কাদা পানিতে বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে হবে না!

আসগর আলি তার ছেলের কথায় মনে মনে বিরক্ত হন। তার এ রকম একটা নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত ছেলে হবে, এটা তিনি কখনও কল্পনা করেন নাই! ‘হেইট পলিটিক্স’ জেনারেশনের এই এক মুশকিল। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই জেনারেশনের ছেলে মেয়েরাই একটা সফল আন্দোলন করে ফেলেছে! শুধু এই কারণে তিনি ছেলেকে কড়া ভাষায় কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। 

কিন্তু ছেলের কথার ফল ফলতে শুরু করল মুহূর্তেই। এরই মধ্যে মোটরসাইকেল বহর আর গাড়ির চাকায় ভেজা রাস্তা দাবিয়ে দিয়ে একে একে হাজির হতে লাগলেন তারা। 

একজন নিজের হারিয়ার গাড়িতে ওঠাবে কি ওঠাবে না এমন দোনামোনা করতে করতেই অন্য আরেকজন ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এনে হাজির করেছে। আদম সুরতকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠাতে ওঠাতে, দূরে আর এক অ্যাম্বুলেন্সেকে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে আসতে দেখা গেল। 

নির্বাচনের বাজারে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের লম্ফঝম্ফ দেখে মনে মনে প্রমাদ গোনেন আসগর আলি। সাথে সেই দিনের কথা বারবার মনে পড়তে থাকে তার, যেদিন বোমার আঘাতে একটা পা তার প্রায় উড়ে গেছে, পাশে মরে পড়ে আছে তার একান্ত সহকারী। অথচ ওই সময়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একটা সাধারণ বাহন পেতে পার হয়ে গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা