× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আহ্‌মেদ হুমায়ূন-এর অগ্রন্থিত রচনা

ইরাজ আহমেদ

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ০৮:৪০ এএম

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬ ১৪:৪৪ পিএম

আহমেদ হুমায়ূন, ১৮ মে ১৯৩৬-২৩ জুলাই ১৯৯৯

আহমেদ হুমায়ূন, ১৮ মে ১৯৩৬-২৩ জুলাই ১৯৯৯

ভূমিকা : ইরাজ আহমেদ

ধূসর, লালচে নিউজপ্রিন্টে ছাপা জীর্ণ পেপারকাটিং জানান দিচ্ছে, লেখাটি মুদ্রিত হওয়ার পর ৬৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসের ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে, যা ওলট-পালট করে দিয়েছে লেখকদের মনোজগৎ, সাহিত্য রচনার কাঠামোগত ভঙ্গি আর চিন্তাকে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসও বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসের পরিবর্তনমুখর ধারার বাইরে নয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বহু পালাবদল ঘটে গেছে। 

‘ঝড়ের পাখী’ নামে এই লেখাটির বিষয় বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্য। ১৯৬১ সালের ০৩ ডিসেম্বর তৎকালীন দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সাপ্তাহিক সাময়িকীতে ‘ঝড়ের পাখী’ নামে লেখাটি লিখেছিলেন আহ্‌মেদ হুমায়ূন। বাংলাদেশে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবেই তার পরিচয়। দীর্ঘকাল ধরে সংবাদপত্রে কর্মরত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য রচনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিক থেকে আশির দশকের শেষাবধি পত্রপত্রিকায় তার সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, লিমেরিক প্রকাশিত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত হয়েছিলেন ছাত্রজীবন থেকেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তার বিশেষ পক্ষপাতিত্ব তখন থেকেই বলে আমার জানা। পাঠক হিসেবে গভীর মনযোগের আলো ফেলে তিনি অনুসরণ করেছিলেন মানিক বাবুর লেখা। পাশাপাশি এই সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত জীবন, জীবনের গভীর সংঘাত, উত্থান-পতন আহ্‌মেদ হুমায়ূনকে আকর্ষণ করেছিল। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘চতুষ্কোণ’ অথবা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসগুলোর কাহিনি জানা হয়ে গিয়েছিল। পাঠ করার আগেই অবগত হয়েছিলাম উপন্যাসগুলোর অন্তর্গত বিশ্লেষণ সম্পর্কে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোজগৎ, তার রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং জীবনের লড়াইয়ে একরোখা দৃষ্টিভঙ্গি আহ্‌মেদ হুমায়ূনকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিল, পাল্টে দিয়েছিল তার জীবনবোধকে তা এখন অনুধাবন করতে পারি। 

প্রয়াত আহ্‌মেদ হুমায়ূনের সন্তান হিসেবে এই লেখাটির বিষয়ে আমি অবগত নই। কারণ আমার জন্মের তিন বছর আগে এটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শুনেছি ওই সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় তার সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ ছাপা হতো, যার একটিও এখন আর আমার সংগ্রহে নেই। ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হাসনাত মোবারক যখন এই জীর্ণ হয়ে যাওয়া পেপারকাটিংটি আমাকে পাঠালেন, দেখে ভীষণভাবে বিস্মিত হয়েছি। উনিশশ একষট্টি সালে প্রকাশিত এই লেখা তার হাতে কোত্থেকে এলো! মনে পড়ল বাবার মুখেই শুনেছি তখন তিনি হুমায়ূন আহমেদ নামে লিখতেন। তার পুরো নাম ছিল সৈয়দ মহিউদ্দিন হুমায়ূন আহমেদ। পরে লেখালেখির সুবিধার জন্য তিনি সামান্য পরিবর্তন এনে লিখতে শুরু করেন আহ্‌মেদ হুমায়ূন। এই নামেই পরবর্তী সময়ে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার সহকর্মী ও সহযাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ এই নাম পাল্টে যাওয়ার বিষয়ে অবগত ছিলেন। 

আহ্‌মেদ হুমায়ূনের জন্মদিন ১৯৩৬ সালের ১৮ মে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বরাহনগরে। শৈশবের পুরোটাই কেটেছে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে। ১৯৫৩ সালে শ্যামগ্রাম মোহিনীকিশোর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। সেখানেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৬১ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। অধুনালুপ্ত আদমজী পাটকলে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে পার্টির নির্দেশেই তিনি সংবাদপত্র জগতে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে আহ্‌মেদ হুমায়ূন সাবেক দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৯৯ সালের ২৩ জুলাই তার মৃত্যুদিন।


ঝড়ের পাখী
হুমায়ূন আহমেদ

চলমান জীবনের নিরক্ত, বিবর্ণ ধূসর মিছিলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুখ’ যা ‘নিষ্কোষিত তরবারির মতো’ জেগে ওঠে আরো সবাইকে জাগিয়ে তোলে সাহিত্যকর্মে অনুসৃত, বিশ্লেষণে মর্ম্মভেদী দৃষ্টি, আঙ্গিকে অনায়াস আধিপত্য এবং একটি তীব্র, তীর্যক অনমনীয় ব্যক্তিত্ব নিয়ে। বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ পুরুষ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দুই দশক ধরে পাঠক-সমালোচকগণের তর্ক, জিজ্ঞাসা এবং স্তুতি-নিন্দার ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে অবস্থান করেছেন। খরস্রোতা নদীর বঙ্কিম তটরেখার মতো নানা-বাঁক সম্বলিত তাঁর সৃষ্টি-ধারা সাহিত্য সম্পর্কে একটি মৌল জিজ্ঞাসায় আমাদের অস্থির করে এবং অসামান্য ঋজু, দৃপ্ত এবং আপোষহীন তাঁর জীবন-যাপনের পদ্ধতি মানুষ সম্পর্কে আশা এবং বিশ্বাস ভরা, মূল্যবোধে আত্মস্থ একটি নিশ্চিন্ত জবাব আমাদের হাতে তুলে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সব বিরল পুরুষদের একজন যারা আপন জীবনে দুঃখ-যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে নিঃশেষিত হলেও উত্তর পুরুষের জন্য রেখে যান দুদণ্ড দাঁড়ানোর জন্যে একান্ত বিশ্বাসের মাটি এবং আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মতো দুর্জয় সাহসের স্তম্ভ।

বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সত্যিই একটি অত্যাশ্চর্য্য নাম।

এই শতাব্দীর তৃতীয় দশকের উন্নাসিক, উচ্ছ্বাস-প্রবণ-অগভীর এবং উFল্লাসগামী বিদ্রোহীদের কলরব মুখরিত বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়ের আবির্ভাব একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। ভেবে দেখলে একথা স্বীকার করতে হবে যে মানিক বাবু কল্লোলীয় বিদ্রোহের নিশ্চিন্ত পরিণতি নন খৃষ্টীয় তৃতীয় দশকের বাংলা দেশের যুগ-মানসের সৃষ্টি। বিশেষ কোনো বক্তব্য যেমন যৌন-ভালবাসার জয়গান, যৌবনের বন্দনা, যুবক যুবতীর মিলিত উন্মার্থগামী বিদ্রোহ, এলিয়েট-লরেন্স-জয়েস কিংবা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান সাহিত্যিকদের সাথে নতুন-পরিচিতির উচ্ছ্বাস তেমন কোন বক্তব্যে মানিক বাবুর লেখা সীমায়িত হয়ে থাকে নি। যার জন্যে অসাধারণত্বে ঔজ্জ্বল্যে তিনি দীপ্তিমান তা হলো তাঁর গভীর, অন্তর্ভেদী, বিশ্লেষণক্ষম তাঁর দৃষ্টিশক্তি এবং ভঙ্গী। মহাকালের পটভূমিকার যে সুবিশাল জীবন-মৃত্যুর ওঠাপড়া ‘সত্যিকার বাম দৃষ্টি’ দিয়ে তিনি তা পর্য্যবেক্ষণ করেছেন এবং এই দক্ষ শিল্পীর হাতে তা নিপুণরূপে খোদাই হয়ে থেকেছে। 

শরৎচন্দ্রের সামান্য প্রভাবচিহ্নিত বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত পরিবারের চিত্র সম্বলিত প্রথম উপন্যাস ‘জননী’ প্রকাশের এক বছরের মধ্যে (১৯৩৫-৩৬) একটির পর একটি মহা বিস্ময় সৃষ্টি করলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুল নাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মা নদীর মাঝি। এতোখানি পরিণত লেখা বয়সে তরুণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে যেন অপ্রত্যাশিতরূপে এসেছিল। বৃদ্ধিবাদী, আত্মস্থ এবং আত্মমগ্ন, প্রতি মুহূর্তে আত্মবিশ্লেষণক্ষম নিরাসক্ত হেরম্ব এবং সুপ্রিয়া আনন্দের ছায়া জগতের কাহিনী দিবারাত্রির কাব্যের পাঠককে বিস্মিত এবং বিমুগ্ধ করে রাখে। উপন্যাসের পাতায় এ এক অভূতপূর্ব ছবির অভিক্ষেপ : আশ্চর্য্য এক স্বাতন্ত্র্য জগত। আকাশচারী ভালোবাসার বৃত্তে, তাঁর আলো-আঁধারীর রহস্য, তা চন্দ্রকলা নাচের মুদ্রার এবং “জলের সমুদ্রের চাইতে আরো উন্মাদ হৃদয় সমুদ্রের কলরবে মুখরিত” দিবারাত্রির প্রতিটি পৃষ্ঠা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ সৃষ্টি-দক্ষতার পরিচয় বহনকারী। “মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ” এমন অপূর্ব মানসলোক নিয়ে দিবারাত্রির কাব্যের মতো স্পন্দমান উপন্যাস-কাব্য বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় রহিত। 


“তাল বনের টিলার উপরে উঠিয়া সূর্য দেখিবার সাধ” যার জীবন থেকে অপসারিত সেই শশী, আধো-বালিকা, আধো-রমণী চপল রহস্যময়ী কুসুম, যাযাবর কুমুদ, গেঁয়ো মেয়ে মতি যে আজ এমন হইয়া গিয়াছে, আপন ফাঁদে ধরা যাদব-পাগল দিদি এবং গোপাল-সেনদিদি ইত্যাদি চরিত্রের সংমিশ্রণে নির্মিত ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ যেন তেল রঙের ছবি অসমান, অমসৃণ, আপাতদৃষ্টিতে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত সুতীব্র, অত্যুজ্জ্বল রঙ এই সব চরিত্রের আশ্চর্য্য সংমিশ্রণকে অর্থবোধক দূরত্ব থেকে পর্য্যবেক্ষণ না করলে যেন ছবির তাৎপর্য পরিস্ফুট হয় না। একমাত্র যৌনতাবোধে বা অন্ধকামনা নয় পুতুল নাচের সূত্রধর আরও গভীর রহস্যময় কেউ হ্যামলেটের সেই ‘divinity’ (I here's a divinity that shepes our ends; Hamlet)। ‘পুতুল নাচের ইতিকথার’ শিল্পোত্তীর্ণতা বিস্ময়কর। আপাতদৃষ্টিতে ‘আত্মপ্রবৃত্ত’ হলেও পুতুল নাচের মর্ম্মোদঘাটনের জন্যে এমনি ‘শিথিল’ আঙ্গিক অপরিহার্য ছিলো। যে গভীর দার্শনিক বক্তব্য ‘পুতুল নাচের ইতিকথায়’ নিহিত সুবিস্তৃত ক্যানভাসে এতোগুলো চরিত্রের অভিক্ষেপ না ঘটলেও সে বক্তব্য কিছুতেই পূর্ণ ব্যঞ্জনা নিয়ে উদ্ভাসিত হতো না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন বই শ্রেষ্ঠতম তা নিয়ে বিচার-বিতর্ক নিষ্ফল এবং নিরর্থক কিন্তু মহাকালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তাঁর যে সমস্ত সৃষ্টি ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ তারই অন্যতম। 

কীর্তিনাশা পদ্মার মাঝি-মাল্লার জীবনী তাদের ভালোবাসা, আশা এবং আকাঙ্ক্ষার কাহিনী এবং কথ্যভাষার দুঃসাহসিক ব্যবহার এই সব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত পদ্মা নদীর মাঝি বাংলা সাহিত্যের দিগন্তের পরিধিকে নতুন ব্যাপ্তি দিয়েছে। বইটির মূল সুর রোমান্টিক, জীবনে জীবন যোগ করে মাঝি-মাল্লার জীবনযাপনের ইতিবৃত্ত পরিজ্ঞাত হয়ে তার ‘আক্ষরিক’ ছবি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের উপহার দেন নি। তবুও কৃত্রিম পণ্যে তার সৃষ্টি যে ব্যর্থ হয়নি তার কারণ এই যে, বইটির বক্তব্য উদ্দেশ্য এবং মেজাজ মানিক বাবু অসাধারণ সৃষ্টি ক্ষমতার অধিকারী। দিবারাত্রির কাব্য ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ এবং ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈচিত্র্যশীল লেখনীর অক্ষয় সৃষ্টি। 

‘নবমীর চাঁদের আলো’ যাদের শুধু পথ চেনায় সাহায্য করে, ঝোপের নিরাপত্তায় যাদের বাসর রাত্রি যাপন করতে হয়, জীবনের সেই গলি, ঘুঞ্জির প্রতিনিধি ভিখু পাচীর ছবিতে সরীসৃপ কামনার স্বরূপ উদঘাটনে, শৈলজশিলার প্রৌঢ়ের বর্বর বীভৎস বিচিত্র ভালবাসার আদরে এবং মধ্যবিত্ত কন্যা শেষ পর্য্যন্ত আপন হাতের রক্তে সমুদ্রের স্বাদ লাভের মর্মান্তিক কাহিনীতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পগুলো তীব্র, তীর্যক এবং বিচিত্র স্পন্দনে কম্পমান। বাংলা সাহিত্যে তাঁর উচ্চতার মতোই এমনকি তার উপন্যাসের চাইতেও গল্পগুলো বড়ো সম্পদ।

মন সমীক্ষণে যে অপরাজেয় দক্ষতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশিষ্টতায় চিহ্নিত করে রেখেছে তার চূড়ান্ত পরিণতির স্বাক্ষর ‘চতুষ্কোণের’ পাতায় বিধৃত। রাজকুমার এবং তাকে কেন্দ্র করে চারজন নারীর মান অভিমান, ভালবাসা, ঈর্ষা এবং প্রতিযোগিতার খুটিনাটি বিবরণ সম্বলিত চিত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘চতুষ্কোণে’ আমাদের উপহার দিয়েছেন। তার পর্য্যবেক্ষণ দক্ষতা পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষমতা এবং টাইপ চরিত্র অঙ্কনে নৈপুণ্য ‘চতুষ্কোণে’ নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত। তাঁর শব্দ চয়নে এবং বর্ণনার ভঙ্গীতে এই উপন্যাসের কিছু অংশ কখনো কখনো কবিতার সমতলে উন্নীত হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলতঃ বাস্তববাদী লেখক। ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং ব্যক্তি-মানসের বিচিত্র গতিধারার চিত্র সম্বলিত মানিক বাবুর উপন্যাসের সাথে আধুনিক ইউরোপীয় উপন্যাসের সমধর্মীতা আমাদের বিস্মিত করে। ঘটনাকে নির্বাসন দিয়ে আধুনিক উপন্যাস আজ যে সাংকেতিক, উদ্ভট এবং জটিল-বিশৃঙ্খল ব্যক্তি মানসের পরিচয় রূপায়ণে ব্যস্ত, সুদীর্ঘ কাল অবধি রচিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে অনুরূপ চিত্র আমাদের চোখে পড়ে। একথা হয়তো সত্যি যে, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রথম পর্বের উপন্যাসে তেমন আধুনিক, সামগ্রিক কোন বক্তব্য নেই; কিন্তু তাহলেও আশ্চর্য্যজনকভাবে এ কথাও সত্য যে, অন্তর্মুখী বিশ্লেষণপ্রিয় এবং অসাধারণ মনের অধিকারী মানিক বাবু নায়ক শশী-হেরম্ব রাজকুমার এরা সবাই দ্বিতীয় যুদ্ধোত্তর জটিল-কুটিল আধুনিক মানুষের অনেক কাছাকাছি। নীচুতলার মানুষ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সংঘবদ্ধভাবে এবং জীবন সংগ্রামে অপরাজেয় হয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টাকেই তিনি রূপ দিতে চেয়েছেন তাঁর দ্বিতীয় পর্বের উপন্যাসগুলোতে। দুঃখের সঙ্গে হলেও এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, তাঁর এই পর্বের সাহিত্যকর্ম প্রথম পর্বের সৃষ্টির চাইতে আপেক্ষিকভাবে নিম্ন মানের। ইতিকথার পরের কথার শুভময়, সার্বজনীনের মোহন, সোনার চেয়ে দামীর রাখাল এ সমস্ত চরিত্রগুলোকে শশী-রাজকুমার-হেরম্বের পাশাপাশি মনে হয় অনেক নিষ্প্রভ, অনুজ্জ্বল। আমার মনে হয়েছে কোন্‌ মত গ্রহণ করেছিলেন তা বড়ো কথা নয়, জীবনের হঠাৎ মোড় পরিবর্ত্তনই তাঁর শেষ পর্ব্বের সাহিত্য-কর্ম্মের দুর্ব্বলতার জন্যে দায়ী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যয় তাঁর প্রথম পর্বে বলা যেতে পারে Perfection-এ পৌঁছেছিলেন। তারপর নতুন মতে, নতুন পথে এসে নিখুঁত উপন্যাস রচনা এতো সহজেই সম্ভব হয়নি। কিন্তু শেষ পর্বের কিছু গল্প তাঁর পূর্ব দক্ষতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দুই ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্যে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর অসাধারণ অস্বাভাবিক জীবন তাঁর সম্পর্কে বিপুল কৌতূহলের সঞ্চার করে। ‘সম্মানের বনেদী আসন’ যখন অনায়াসে করতলগত হতে পারতো সেই মুহূর্তেই মানিক বাবু পুরনো নিশ্চিত আসন ছেড়ে নতুন পথে পা বাড়িয়েছেন। ফলাফল কী হবে তার জন্যে ভ্রুক্ষেপ করেন নি। জীবনে দুঃখ-দারিদ্র কম ভোগ করেন নি। কিন্তু আপন বিশ্বাসে অটল থেকেছেন। তাঁর সম্পর্কে প্রেমেন্দ্র মিত্র যা লিখেছেন তা, আমাদেরও বক্তব্য “সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখকের রোজ রোজ দেখা পাওয়া যায় না। খোশ গল্প শুনিয়ে আমাদের মন ভুলিয়ে আসর জমিয়ে রাখার লেখক তো এরা নন। এরা আসেন এক অদ্ভুত অস্থিরতা নিয়ে। মানুষের মধ্যে এরা একা একা সঙ্গোপনে ঘুরে বেড়ান। ঘুরতে ঘুরতে দেখেন, অনুভব করেন আর ভাবেন, আর সেই গভীর অনুভূতি আশ্চর্য্য ভাষায় লিখে যান। সেই লেখা সবাই যে তখুনি তখুনি বুঝতে পারে তা নয়। সাময়িক রুচি, বিশ্বাস, ধারণার সঙ্গে তা মেলে না বলে অনেকে তা পছন্দ করে না। অনেকে তার নিন্দা করে। কিন্তু সে লেখা সত্যের জোরে বেঁচে থাকে। আগামীকাল সেই লেখার মধ্যে নিজেকে চিনতে শেখে। পথ নির্দ্দেশ পায়”।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা