× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিরাভরণ ‘অপরাজিতা’

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ১৮:৪৭ পিএম

আপডেট : ১৫ মে ২০২৬ ০৮:৩৩ এএম

শিল্পী ইফাত আরা দেওয়ান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শিল্পী ইফাত আরা দেওয়ান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শিল্পী ইফ্‌ফাত আরা দেওয়ানের ক্যানভাসের দিকে তাকালেই মনে পড়ে সেই রবীন্দ্রসংগীতÑ ‘নিরাভরণ যদি থাকি চোখের কোণে চাইবে না কিÑ/ যদি আঁখি নাই-বা ভোলাই রঙের ধাঁদনে।’ এই প্রশ্ন, এই অন্তর্সংশয়, এই আত্মজিজ্ঞাসা অনাদিকালের; আর সেসবের অন্তরীক্ষে আমাদের এই দ্বিধান্বিত জীবনযাপনও অনেকÑঅনেক দিনের। কিন্তু ইফ্‌ফাত আরার কাছে তা ‘ফুল তুলিতে ভুল’ করা এক প্রেমের সাধন। আর ওই ভুল, ওই সাধন আমাদের দিয়েছে আত্মবিশ্বাসী, অন্তর্গত, কিন্তু কৈশোরক সব রেখার আস্বাদ। প্রেমের সাধনের ওই হাসি-কাঁদনে যেমন কোনো মোহ নেই, তেমনি এই রেখা-রঙ-জমিনেও নেই কোনো মোহময় ছড়ানো-ছিটানো কালবেলা। কিন্তু কোথায় যেন আদিমকালের অস্ফুট এক মায়া মিশে থাকে। জানি না, কবে তিনি নেমেছিলেন এই জমিনের ওপর রঙরেখায় নিরুদ্দিষ্ট সব সত্তার সন্ধানে; তবে তাঁর প্রথম প্রকাশ দেখেছিলাম ১৯৯২ সালের এক দিন হঠাৎ জার্মান কালচারাল সেন্টারে। তারপর যত দিন গেছে, তাঁর রেখা-রঙ আর সেসবের অন্তঃস্থ স্বর ততই শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, তিনি পরিণত হয়েছেন আমাদের শিল্পকলা আস্বাদনের অবিচ্ছেদ্য অংশে।

সুরেলা রেখা আর ফুলের ছদ্মাবরণে মননের স্নিগ্ধতা মন্দ্রিত রঙের আলোকোজ্জ্বলতা নিয়ে খেলা করে ইফ্‌ফাত আরার ক্যানভাসে, কিন্তু দূরে-বহুদূরে যেতে যেতে একসময় অনুভব করি, বড় বেশি উজ্জ্বল আসলে সেই ক্যানভাসের বিষণ্নতা, বড় বেশি উজ্জ্বল আসলে সেখানকার নস্টালজিয়া। দিন শেষের রাঙা মুকুল হয়ে জেগে থাকে তাঁর ক্যানভাস। ফুলের উদ্ভাসনে উষ্ণ আমন্ত্রণের যে বার্তা জেগে থাকে, সে ছবির ‘ভুলে যেও’ শিরোনাম কি আমাদের নি:সঙ্গতার অনুভবে আদ্র করে তোলে? তার জমিনে নীল আর লালের অন্তরঙ্গ সংমিশ্রণ কি নিতল করে তোলে সেই বেদনাকে?


এসবই কি আত্মজৈবনিক কিছু? শাদামাটা আঁকবার ভঙ্গি, মাধ্যম নিয়েও নেই জটিল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা; বরং যেন-বা সমুদ্রের ধারে নুড়ি কুড়ানোর আনন্দের মতো আত্মমগ্নতায় হাতের কাছে যা আছে, তা নিয়েই যেন ক্যানভাসে বা কাগজে আঁকতে বসেন তিনি। অথচ রেখায় রয়েছে প্রগাঢ় আস্থা, প্রগাঢ় সাহস রয়েছে রঙ নিয়ে খেলা করার; রয়েছে ক্যানভাসকে শূন্য, সরল রাখার বিপ্রতীপে রঙকে খুব প্রবল প্রতাপে নিরাভরণ করে ছড়িয়ে দেওয়ার স্থিরতাÑ আর এসবই তাঁর শিল্পকর্মকে দিয়েছে স্বতন্ত্রতা। এবার ‘অপরাজিতা’ নামের এ প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ রয়েছে বোধকরি মোটামুটি ২৫ বছরের। অথচ এর মধ্যেও বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয়ে গেছে তাঁর। অন্য প্রদর্শনীগুলোর মতো এই ‘অপরাজিতা’য়ও ফুল আর ফুলদানি কিংবা স্বচ্ছ কাচপত্রই তাঁর ক্যানভাসের মূল উপজীব্য। প্যাস্টেল হোক আর চারকোল হোক, কিংবা হোক অ্যাক্রিলিকÑ ফুল আর এই ফুলদানিই হয়ে উঠেছে ইফ্‌ফাত আরা দেওয়ানের স্বাক্ষরধর্মী কাজ। কেবল ক্যানভাসে নয়, প্রকৃতির দিকে চেয়েও তাঁর দৃষ্টি বোধকরি প্রথমে আটকে যায় ওই ফুলের দিকে। মনে পড়ে তাঁর একমাত্র বই ‘অচেনা কুসুমের গন্ধে’ তিনি কলকাতার নিউমার্কেট নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে করেছিলেন এই ফুলের আড়তের কথা; যে লেখাটিতে খুঁজে পাওয়া যায় কীভাবে তিনি এই ফুল আঁকতে ভালোবাসেন, সেটার এক হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা :

‘আরেক মাথায় ছিল ফুলের আড়ত, নানা রকমের ফুল বোঝাই থাকত জায়গাটাতে, আর ফুলের গন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে যেত। সামনেই মাটিতে বসে ওরা ফুলের তোড়া তৈরি করত, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আবার সাজি সাজাতÑ লাল, হলুদ, গোলাপি, সাদা গোলাপ দিয়ে। আরও থাকত গাঁদা, গ্ল্যাডিওলা, রঙ্গন, রজনীগন্ধা, জুঁই কত ফুল। একধারে পুরনো শোকেসের ভেতরে বড় বড় ফুলদানিতে ফুল সাজানো থাকত, খুব বড় বড় চিনেমাটির লবণদানি, একবার কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দোকানি কিছুতেই রাজি হলো না। এগুলো এখন আর দেখা যায় না, আগেকার দিনে এই পাত্রগুলোতে লবণ, আচার ইত্যাদি রাখা হতো ভাঁড়ার ঘরে। আর আমি এই পাত্রগুলোতে ফুল সাজিয়ে ছবি আঁকতে ভালোবাসি। পরে ঢাকায় এসে গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে পুরনো জিনিসের দোকানে খুঁজে পেয়েছিলাম। ছোট-বড় আর মাঝারি, তিনটি মাপেরই কিনে নিয়েছিলাম।’

এভাবে দৃষ্টির সামনে ও পরোক্ষে, দৃষ্টির গভীরে ও উজানে তিনি ফুল রাখেন, ফুলদানি রাখেন, রাখেন জড় আর জড়তা, রাখেন প্রাণ আর প্রাণতা, রাখেন বৃক্ষ আর আলো-আঁধার। কিন্তু তাতে নিয়ে আসেন সরল, কিন্তু অজস্র ভিন্নার্থ। কাগজের ওপর চক-প্যাস্টেলে আঁকা ওই ফুলগুলোর কথাই মনে করা যাকÑ নরম আলো ধরে রেখেছে তারা, চকের নিশ্চিত আস্থাশীল রেখা তাদের করে তুলেছে আর্দ্র, আকুল,Ñ এখন এসবের সঙ্গে যদি যুক্ত করা যায় এই শিল্পকর্মের শিরোনামের গীতলতাÑ ‘নিশীথ রাতে কে ডাকে’, তবে সব মিলিয়ে জেগে ওঠে আরও এক নতুনতর অনুভূতি, জেগে ওঠে ক্যানভাসের এক নতুন আদল। অনুভবের এক স্তর থেকে আমরা পৌঁছাই আরেক স্তরে, স্তর থেকে স্তরান্তরে। কিংবা তিনিই বয়ে চলেন সুরে সুরে। প্রতিটি স্তর আমাদের মধ্যে জাগ্রত করে নতুন, নতুনতর স্বস্তিময়তা। রেখার সারল্য, ক্যানভাসে দৃশ্যমান শূন্যতা আর রঙের নিঃসঙ্গতা তাঁর সৌন্দর্যবোধের স্বাতন্ত্র্যকেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলরত করে।


‘অপরাজিতা’ প্রদর্শনীতে শিল্পী ইফ্‌ফাত আরা দেওয়ান তাঁর এই স্বাতন্ত্র্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন আরও নিবিড়ভাবে। আঁকাআঁকির প্রথম দিকে যেমন, এখনও তেমনি তাঁর ক্যানভাসকে দখল করে রেখেছে লতিয়ে পড়া অথচ নীরবলম্ব ফুল। একই ফুল ঘুরেফিরে আসে তাঁর ক্যানভাসে, কিন্তু কখনও কল্পনার অবভাস নিয়ে, কখনও স্মৃতি হয়ে, কখনও নস্টালজিয়া নিয়ে, কখনও ক্ষরণের দ্যুতি নিয়ে, কখনোবা আলোকধারা হয়ে। কখনোবা তাঁর ক্যানভাসে দেখি স্মৃতিময়তার পুনর্গঠন। জড়বস্তুময় শূন্যঘরÑ পড়ে আছে শূন্য চেয়ার, শূন্য মেঝে, পড়ে আছে তানপুরা, হাট হয়ে খুলে আছে জানালা; কিন্তু কেবল নেই কোনো জনমনুষ্যি; অথচ মানুষের এই অনুপস্থিতিই প্রবল থেকে প্রবলতর স্বরে বলে দিচ্ছে, সে-ও আছেÑ আকাশছাওয়া দৃষ্টি তার, সেই দৃষ্টি মেলে ধরে দেখছে বসবাসের শূন্য ঘর, দেখছে খেতে বসার টেবিল-চেয়ার, পাখির চোখে দেখছে আসা-যাওয়ার পথ, জলাশয়ের নিরীহ হাঁস, পথের ধারের বৃক্ষরাজি। কোনো ব্যাকরণ দিয়ে এই স্মৃতিময়তার সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, কেননা তিনি তাঁর স্মৃতিময়তাকে পুনর্গঠন করেছেন নিচু ও নিমগ্ন স্বরে সৌন্দর্যের পুরনো ব্যাকরণকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে। এসব স্মৃতি পুনর্গঠনের সঙ্গে মিলেমিশে সুরেলা নস্টালজিক আমেজে নিঃস্তরঙ্গ তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে ছবির এমন সব শিরোনামÑ ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’, ‘আজি বিজন ঘরে’, ‘যেদিন জীবনে তুমি’, ‘বসন্তের ফুল যত’, ‘আসা যাওয়ার পথের ধারে’, ‘ভালো যদি বাসো সখী’, ‘দীপ নেভে মোর বাতায়নে’, ‘এসো আমার ঘরে’, ‘চাঁদের এত আলো’, ‘পথের এখনো শেষ হলো না’, ‘ভালোবেসেছিনু ভুল না ভুল না’, ‘নিশীথে গন্ধরাজ’, ‘নিশীথ রাতে কে ডাকে’, ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’...।

ইফ্‌ফাত আরা দেওয়ান এইভাবে তাঁর নিজস্ব স্মৃতিময়তার অরণ্য নির্মাণ করেছেন, রচনা করেছেন তাঁর অন্তর্গত অপরাজিতার আখ্যান। অনেক দূরের যাত্রী তিনি, ‘অপরাজিতা’ সে কথা আবারও আমাদের জানিয়ে গেল।


[শিল্পী ইফ্‌ফাত আরা দেওয়ানের অপরাজিতা প্রদর্শনী চলছে রাজধানীর লালমাটিয়ার দি ইল্যুশন গ্যালারিতে। শিল্পাঙ্গন আয়োজিত এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ১৬ মে পর্যন্ত]

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা