মাকসুদা আক্তার
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ০৯:০৫ এএম
‘লাল জিহ্বার নিচে’ বইয়ের প্রচ্ছদ। কারিগর: মোস্তাফিজ
ভিন্নমাত্রিক ভাষা উপস্থাপন এবং নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পকার খালেদ চৌধুরী। সম্প্রতি পঠিত হলো তার ‘লাল জিহ্বার নিচে’ গল্পগ্রন্থ। ১৫টি গল্প দিয়ে সাজানো এ বইয়ের প্রথম গল্প ‘বিকিনি বুড়োর মাছ’। এখানে বিকিনি বুড়োর চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিবেশ। এই বুড়োকে ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-র বুড়োর চেয়ে পরিশ্রমী বলছেন লেখক। মূলত বৃদ্ধদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা ও উপস্থাপনের একটি দিক এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘গল্প-জার্নালে’ কয়েকটি অনুগল্পের স্থান হয়েছে। বন্যার সময় নবজাতক সন্তানকে ভাসিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, গৃহশিক্ষকের লোলুপতা, কবরের মানুষের প্রিয়জনদের দেখার তৃষ্ণা, ধর্মীয় লেবাসে আর্থিক ক্ষমতায়নের চিত্র, প্রকৃতির প্রতি ভিন্নমাত্রিক দৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর নির্ভরতা, পারিবারিক টানাপড়েন ইত্যাদি প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন। এই উপস্থাপনের ভঙ্গিটা অনেকটাই সংক্ষিপ্ত অবয়বের সরল বাক্যে জীবনের জটিল কাঠামো।
‘বেঁচে থাক আপেল’ গল্পের বর্ণনা লিবিডো তাড়নার এক বিরাট বর্ণনায় ঠাসা। তবে সে বর্ণনাকে অশ্লীল মনে হয় না। ঘটনার প্রয়োজনেই যেন এসব বর্ণনা এসেছে।
বইটির নাম ‘লাল জিহ্বার নিচে’ রচনার কয়েকটি ভাগ আছে। এখানে যেভাবে বর্ণনা দিচ্ছেন দৈনন্দিন জীবনের তা অনেকটাই বাস্তব জীবনসম্মত। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভ্রম হয় যে পাঠক পুনরায় শহীদুল জহিরকে পড়ছি। ‘দুধু ভাইয়ের বন্ধু এখন কোথায়?’ গল্পের শুরুর বাক্য পড়ে মনে হয় বৃষ্টি কোনো রক্তমাংসের মানবী। আসলে তা নয়, সে প্রকৃতিরই অংশ। দুধুর বন্ধু সফিক প্রথম থেকেই ধনী ও যাচ্ছে তাই করার মতো মানসিকতা বহন করে। একসময় সফিককে ছিনতাইকারীদের বস হিসেবে চিনতে পেরে দুধুর সাথে বন্ধুত্ব শেষ হয়। এই অসমাপ্ত বন্ধুত্বের গড়ে ওঠাটা ছিল আকস্মিক আর ভেঙে যাওয়াটা ছিল বিস্ময়কর। ‘এফ সিক্স ফ্ল্যাটে শেষ পনেরো মিনিট’ গল্পে সুমনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর আর সব নোংরা মানসিকতার পুরুষকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। যেসব পুরুষ মনে করে বাইরের সব নারীকে অযাচিত স্পর্শ করা যাবে কিন্তু নিজের বাড়ির মেয়েকে কেউ ছুঁলে তার হাত কেটে ফেলতে হবে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আশা করছেন লেখক।
‘মেহগনি পাতা দুলছিল’ গল্পে রেজা ও সাথী দম্পতির ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। হঠাৎ করে কুমিল্লায় বাসা ভাড়া নেওয়া এরপর আকস্মিক প্রচুর টাকার মালিক হয়ে রেজার ঋণভারে জর্জরিত অবস্থাকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনা মনে হয়। কিন্তু লেখক বর্ণনাভঙ্গি ও ভাষা ব্যবহারে এখানে পার্থক্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। যেভাবে হঠাৎ আগমন সেভাবেই রাতের আঁধারে তাদের পলায়ন।
‘মুন্সীর বউ একটা শব্দ করে’ গল্পে সূক্ষ্ম বর্ণনায় ছোটখাটো কাজকেও ব্যাপক গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন লেখক। ‘আমি খুন করিনি’ গল্পের ঘটনা মানসিক বিকার ঘটেছে এমন কারও মুখের বর্ণনা মনে হলেও আদতে তা নয়। সম্পর্ক নিয়ে এক চিরন্তন বাস্তবতার দেখা মেলে। বন্ধুত্ব কিংবা সাজ্জাতের প্রেম তার ব্যতিক্রম নয়। শেষ পর্যন্ত এক অস্পষ্ট ধোঁয়াশা রয়ে যায় জং সাহেবের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।
‘ফুঁ’ গল্পের নামকরণে ব্যতিক্রমী চিন্তার আভাস পাওয়া যায়। একটা পুকুরে জল আছে আরেকটাতে খরা এই ধারণার মধ্য দিয়ে জীবনের সত্য-মিথ্যার মতো দ্বান্দ্বিক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেন লেখক। তবে গল্পের শুরু ও শেষের পারম্পর্য রক্ষা হয়নি। ‘বঁটি-দা’ গল্পের প্রথম বর্ণনা পড়ে মনে হবে মধ্যবিত্ত বেকার প্রেমিক নাফিজ এবং তার প্রেমিকার মধ্যে কথার লড়াই। কিন্তু শেষে তা রূপ নেয় সাম্প্রদায়িক অস্বস্তিতে।
গল্প বিশ্লেষণে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), শহীদুল জহিরের (১৯৫৩-২০০৮) গল্পভঙ্গির ছাপ তার লেখায় স্পষ্ট। পৃথিবীতে অনেক মহৎ লেখকই প্রথম জীবনে কাউকে না কাউকে অনুসরণ করেছেন। তবে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির প্রয়াসও গল্পে ছিল। কাহিনী, চরিত্রের ভিন্নতা, প্রেমকে উপেক্ষা, সামাজিক বাস্তবতার প্রাধান্য তার গল্পকে ভিন্নতা দিয়েছে।
বই : লাল জিহ্বার নিচে
খালেদ চৌধুরী
প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশনী : কবি
প্রকাশকাল : ২০১৯
দাম : ১৫০ টাকা