দ্রাবিড় সৈকত
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ০৮:৫০ এএম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ল্যান্ডস্কেপ
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা প্রসঙ্গে শুরুতেই একটা প্রশ্ন চলে আসে, তিনি কেন চিত্রকলায় আত্মনিয়োগ করলেন? এর উত্তরের সন্ধানে অবশ্যই বুঝতে হবে তার সময় ও পরিশ্রমী মননের অন্তকথা এবং তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিকতাও বিবেচনায় নিতে হবে গুরুত্বের সাথে। (যদিও রোলা বার্থ দ্বিমত পোষণ করে ঘোষণা করবেন ডেথ অব অথর, ‘death of the author-১৯৬৮’)
রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) সময়কাল বিশ্ব শিল্পের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কালের মধ্যেই ধরা যায় আধুনিক শিল্পের জন্ম, বার্ধক্য এবং মৃত্যু। আধুনিক শিল্পের পরিসর নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, শিল্পী ভ্যানগগের মৃত্যুর পর থেকেই (১৮৯০) আধুনিকতার শুরু। কবিগুরুর বয়স তখন ২৯ বছর, রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, চৌদ্দ থেকে ষোলো বছর বয়সেই লেখা হয়ে গিয়েছিল ‘মালতী পুঁথি’। রবীন্দ্রচিত্রকলার আদি উৎস এই মালতী পুঁথিতেই পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের ওই বয়সে আঁকা চারটি পরিষ্কার মানুষের মুখ। দুই জায়গায় একটি করে আর এক জায়গায় একসঙ্গে আঁকা দুটি মানুষের মুখ। আর এই পুঁথির এখানে ওখানে আছে কবির আঁকা কলমের আঁচড়ের একটু নকশা। মালতী পুঁথির পাণ্ডুলিপিতে ‘হে কবিতা হে কল্পনা’ কবিতার সঙ্গে লেখা তারিখ থেকে জানা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১৭ বছর দুই মাস। এই মালতী পুঁথি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত আছে।
আধুনিক শিল্পের নামে বস্তুত সমন্বয় ঘটেছিল অনেক ভাবাদর্শের। যেমন সিমবলিজম, এক্সপ্রেসনিজম, ফভইজম, কিউবিজম, ফিউচারিজম, ডাডাইজম স্যুরিয়ালিজম। এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন ভাবাদর্শের শিল্পীদের শৈলী ও প্রকাশভঙ্গিগত পার্থক্য ছিল। নান্দনিকতার প্রশ্নেও ছিল ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান। তবু শিল্পীদের মধ্যে একটা প্রশ্নে মিল ছিল, তা হলো সব রকম প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শিল্পের সকল প্রচলিত ধ্যান-ধারণার প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা।
রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি থেকে জানা যায় স্কুলের গণ্ডিবদ্ধতা থেকে ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের যথাসম্ভব অব্যাহতি ছিল। ‘জীবনস্মৃতি’র ‘নানা বিদ্যার আয়োজন’ অধ্যায়ে কিবি লিখেছেন ‘স্কুল হইতে ফিরিয়া আসিলেই ড্রইং এবং জিমন্যাস্টিকের মাস্টার আমাদিগকে লইয়া পড়িতেন।’ রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে চিত্রাঙ্কন শিক্ষা ছিল বিদ্যাচর্চার অন্যতম অঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছবি আঁকতে জানতেন। দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পেনসিল স্কেচে দক্ষ ছিলেন। বহু বিখ্যাত ও স্বল্পখ্যাত ব্যক্তির প্রতিকৃতি এঁকেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ১৭ বছর বয়সে মেজোদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে ইউরোপে গিয়ে আর্ট মিউজিয়ামগুলো দেখেন। পরে ভারতের অজন্তা ইলোরার শিল্পকলা রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। চীন-জাপান ভ্রমণকালে সেখানকার চিত্রশিল্পও তার চিত্রচিন্তায় যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।
মূলত তার শৈশবে ছবি আঁকা ছিল আর ১০টা শিক্ষার মতোই। ছবি এঁকে চিত্রকর হওয়ার কোনো মনোবাসনা তার ছিল না। তবে তার মনোভাব গঠনে ঠাকুর পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের পাঁচ ও ছয় নম্বর বাড়িতে অনেকেরই ছবি আকার শখ ছিল। পাঁচ নম্বরের গিরীন্দ্রনাথ, গুণেন্দ্রনাথ ও তার তিন ছেলে গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ও মেয়ে বিনয়িনী ও সুনয়নী এবং বিনয়িনীর মেয়ে প্রতিমা পর্যন্ত ছবি আকার প্রবাহ দেখা গেছে। ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশে পরিবারের সদস্যদের যে, সমস্ত শিল্পকলায় সাধারণ রুচি গড়ে উঠবে এটা ছিল স্বাভাবিক।
তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উপলব্ধি অনেক আগে থেকে দানা বাঁধতে থাকলেও এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার জাপান সফরের পরে। তাঁর এই বোধে পৌঁছানোর ইতিহাসে একটু নজর দিলেই আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ছিল তাঁর সময় এবং ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
রবীন্দ্রনাথের শিল্পরুচির বিবর্তনচিহ্ন ঠাকুরবাড়ির দেয়ালেই পাওয়া যায়। আঠারোশ সাতানব্বই পর্যন্ত পুত্র রথীন্দ্রনাথ দেখেছেন, জোড়াসাঁকোর বাড়িতে সারা দেয়ালে বিলাতি ছবির প্রতিলিপি টাঙানো থাকত। যেমন জোন্সের আঁকা ‘আশা’ ও মিলের আঁকা ‘বীজ ছড়ানো’। তারপর এলো রবি বর্মার যুগ। বিলাতি ছবি ফেলে দেওয়া হলো, রবি বর্মার ছবির বড় বড় ওলিয়োগ্রাফ প্রিন্টে দেয়াল গেল ভরে। বিলাতি ঢঙের আঁকা এই ছবিগুলো বেশি দিন ভালো লাগল না। একদিন সেগুলোও গেল, এলো কতকগুলো পৌরাণিক আখ্যানের ছবি-সাগর মন্থন, সর্পযজ্ঞ প্রভৃতি। এগুলো কোন শিল্পীর আঁকা তা জানা নেই।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও জানিয়েছেন যে, তিনি যখন ছবি আঁকায় নতুন পথের সন্ধান করছেন সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তাকে রবি বর্মার ছবির কতগুলো ফটো দেন ও বৈষ্ণব পদাবলী পড়ে ছবি আঁকতে বলেছেন। একই সময় প্রদীপ পত্রিকায় ছাপা তার স্নেহাস্পদ তরুণ, বয়স্ক আত্মীয়, যামিনীপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কাদম্বরী’ চিত্রের যে সমালোচনা রবীন্দ্রনাথ লিখলেন তাতে বোঝা যায় বিশ শতকের গোড়াতেও তিনি বুঝতেন ছবি মানেই কাব্যপুরাণের বর্ণনা মাত্র। তখনও রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট মনে করেছেন সাহিত্যের মুখাপেক্ষিতাই শিল্পের ধর্ম। তাঁর এই মনোগঠনের পেছনে কার্যকর ছিল সুগভীর জ্ঞান সাধনা। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বিশেষ করে চিত্রকলার ইতিহাসে দৃষ্টিপাত করলে এমনটি মনে হতেই পারে। ভারতের চিত্রকলার ইতিহাসে বিভিন্ন গুহাচিত্র গুলো সুবিদিত। এর মাঝে অজন্তা, ইলোরা, বাঘ, যোগীমার গুহার প্রাচীরচিত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রগত অনুপ্রেরণা ছাড়াও এসব গুহা চিত্রের পেছনে সক্রিয় ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রেরণা। এই সব ছবিতে বুদ্ধের কাহিনী, জাতকের গল্প একটা প্রধান স্থান নিয়েছে। সঙ্গে আছে অসংখ্য জন্তু জানোয়ার, মানুষ, পাখি, উদ্ভট সব প্রাণী, কী নয়। মূলত এসব চিত্রকর্মের বৈশিষ্ট্য ছিল আখ্যানধর্মিতা।
শুধু অজন্তা প্রমুখ প্রাচীন ছবিই নয়, মধ্যযুগের অধিকাংশ ছবি-মুঘল ছবিই হোক আর রাজপুত ছবিই হোক সর্বত্রই আখ্যানের উপস্থিতি। এ সময়ের প্রথম দিকের ছবিও তাই। রবি বর্মার অধিকাংশ বিখ্যাত ছবিই রামায়ণ মহাভারতের গল্প কালিদাসের নাটক থেকে বিষয় নিয়ে আঁকা আর বিষয় অর্থই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আখ্যান। শুধু ভারতীয় নয়, ইউরোপীয় চিত্রশিল্পেও এই আখ্যানধর্মিতার জয়জয়কার।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘লাস্ট সাপার’, মোনালিসা কিংবা মিকেলাঞ্জেলোর সিস্টিন চ্যাপেলের অনবদ্য ফ্রেস্কোর গল্পও আমরা জানি। আরও পরের দিকের ইউরোপিয়ান ছবিতেও একই অবস্থা। উদাহরণ হিসেবে আনা যায় গয়ার বিখ্যাত চিত্রকর্ম The Third of May, কিংবা দেলাক্রোয়ার মহান পেইন্টিং ‘Liberty Leading the people’ আধুনিককালেও খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না যেমন মুংকের চিত্রকলা বা পিকাসোর বহুল প্রশংসিত ‘গুয়ের্নিকা’। চিত্রশিল্পে এই গল্পধর্মিতার কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিল্পতে সাহিত্যের মুখাপেক্ষি ভেবেছিলেন।
শুধু চিত্রকলা নয়, রবীন্দ্রনাথের সময়কেও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। উনিশ শতকের শেষের দিকে ভারতব্যাপী যে হাওয়া বইতে শুরু করে তারই অংশ হিসেবে ই.বি. হ্যাভেলের নেতৃত্বে অবনীন্দ্রনাথের সহযোগিতায় এবং রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণা ও পরামর্শে কলকতা আর্ট কলেজে শুরু হয় প্রাচ্যরীতির ব্যাপক অনুশীলন।
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অবদান যে কতখানি তা সবারই জানা। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের শাসনকালে বাংলার বিভক্তিকরণ তথা বঙ্গভঙ্গের ফলে যে জাতীয়তাবোধ সে সময় আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই জাতীয়তাবোধের অন্যতম প্রবক্তাই ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বঙ্গভঙ্গের ফলে রবীন্দ্রনাথের মর্ম বেদনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট’। এই সোসাইটির শিল্পীরা অজন্তার শিল্পরীতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। অবশ্য খানিকটা ব্যতিক্রম ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ।
১৯০২ সালে সিস্টার নিবেদিতার মাধ্যমে জাপানি দার্শনিক শিল্পী ওকাকুরা কাকুজোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন ঠাকুর পরিবারের সৃজনশীল ব্যক্তিরা রবীন্দ্রনাথের ব্যবস্থায়। কাউন্ট ওকাকুরার এশিয়া ইজ ওয়ান এই প্রাচ্য জাতীয়তাবাদে তিনি দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথের ব্যবস্থায় ওকাকুরার মাধ্যমে তিনজন জাপানি শিল্পী ইয়োকায়ামা টাইকান, জোশিয়ো কাৎসুতা ও হিসিদা সুনসো ভারতে প্রেরিত হয়েছিলেন এই প্রাচ্য শিল্পকলার বিকাশের লক্ষ্যে। তবু রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ হারিয়ে ফেলা খুবই তাৎপর্য পূর্ণ ব্যাপার।
রবীন্দ্রনাথকে আমরা উদার মানবতাবাদী হিসেবেই জানি। তিনি মানব সভ্যতার মৌল ঐক্যে বিশ্বাসী। জাতি-বর্ণ দেশ এই কৃত্রিম সীমানাকে তিনি মনেপ্রাণে মানতে পরেননি। অজিতকুমার চক্রবর্তীকে একটি চিঠিতে (১৯২০, ১১ ডিসেম্বর) তিনি লিখেছিলেন ‘আমাদের জন্য একটি মাত্র দেশ আছে, সে হচ্ছে বসুন্ধরা, একটি মাত্র নেশন আছে সে হচ্ছে মানুষ।’ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে। (১৯১৯-২১) বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর স্বাক্ষর রাখেন।
রবীন্দ্রনাথের শিল্পমনের বিবর্তন একদিনে হয়নি। ১৯০৫-এর স্বদেশী আন্দোলনের সময়ই তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ মোহভঙ্গ হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ (১৯০৭-১০) রচনাকালকেই তার দৃষ্টি খুলে যাওয়ার প্রথম সময় ধরা যায়। তখন থেকেই তিনি আরও বেশি মানবতাবাদী হয়ে ওঠেন। তাঁর চিন্তা আরও স্বচ্ছ ও গভীর হয় এবং স্পষ্ট জাতীয়তাবাদ বিরোধী হয়ে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময়। জাপানে আমেরিকার ন্যাশনালিজমবিরোধী বক্তৃতা দেন (১৯১৬-১৭) Nationalism (১৯১৭) বইটিতে তাঁর সেই বক্তৃতাগুলো বিধৃত হয়েছে। একই চিন্তা আরও ব্যাপকতা লাভ করে, গোটা মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ বিপদের চেহারা রবীন্দ্রনাথের দিব্যদৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে ‘রক্তকরবী’ নাকটে (রচনারম্ভ ১৯২৩ সালে, পত্রিকায় প্রকাশ ১৯২৪ সালে, গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯২৬ সালে)। সহজেই বোঝা যায় শিল্পের জাতীয়তাবাদে বা কাউন্ট ওকাকুরার পাশ্চত্য বিরোধী ‘Asia is one’ মতবাদে আস্থা রাখতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর সময় থেকে চিন্তা চেতনায় ছিলেন অনেক অগ্রগামী। তাই তাঁর চিন্তা-চেতনা প্রাচ্যসীমায় আবদ্ধ থাকেনি। ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্য রীতির প্রতি যেমন তাঁর আস্থা ছিল না, তেমনি গতানুগতিক ভারতীয়তায় খুঁজে পাননি নতুনত্বের সুষমা।
ফরাসি শিল্পের বন্ধ্যা যুগে ১৮৫৯-এ জাপানি কাঠখোদাই ছবি এডগার দেগার চোখের পর্দা সরিয়ে দিয়েছিল। ছবি যে শুধু অনুকরণ নয় রঙরেখা রূপবদ্ধ ভঙ্গিতে গড়ে ওঠা ছবির ছন্দই যে আসল এবং ছবি তার নিজের শর্তে ও যুক্তিতে গড়ে ওঠে, এই বোধ ইমপ্রেশনিস্ট এবং পোস্ট ইমপ্রেশনিস্টদের আঙ্গিক নির্মাণে অনুপ্রেরণা হয়েছিল। দেগা থেকে পল গগ্যাঁ, ভ্যানগগ, তুলুজ লোৎরে জাপানি কাঠ খোদাই দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। বিশ শতকের মাঝামাঝি মার্কিন চিত্রকরের। অ্যাবসট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমের অনেকখানি প্রেরণা জাপানি ছবি থেকে নিয়েছিল।
কন্যা মীর দেবীকে জানান যে জাপানে শিল্প, কেবলমাত্র শৌখিনভাবে কুনোভাবে চলছে না। দেশে যে শিল্পের সমর্থন তিনি এতকাল করেছেন তা যে ষোলো আনা সত্য হতে পারেনি এই অনুভব তাঁর জাপানে গিয়েই হয়েছিল। একই সময়ে তিনি অবনীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন (৮ ভাদ্র ১৩২৩, ১৯১৬) এখানে এসে আমি প্রথম বুঝতে পারলুম যে, তোমাদের আর্ট ষোলো আনা সত্য হয়নি। আমাদের দেশে আর্টের পুনর্জীবন সঞ্চারের জন্য এখানকার সজীব আর্টের সংস্রব যে দরকার তা তো তোমরা বুঝতে পারবে না। জাপানে গিয়েই তিনি বুঝতে পারলেন নব্য বঙ্গ ঘরানায় বৃহতের স্থান হয়নি, এই অচলায়তন থেকে মুক্তির অন্যতম প্রধান ভূমিকা শিল্পী হিসেবে তাঁকেই নিতে হবে। কিন্তু এ সমসা তাঁকে ভাবিয়েছে। অবীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথকে তিনি অনেক সময় বলেছেন ঘরের গতি ছেড়ে বাইরে বেরুতে। অন্যান্য প্রাচ্য ও পশ্চাতা দেশের শিল্পকলার অর্জনকে নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করেতে। সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা এক চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করেই বলেন‘ ‘ভারতবর্ষের আর্ট যদি পুরো জোরে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে এগোতে পারে তা হলে গভীরতায় এবং ভাব ব্যঞ্জনায় তার কাছে কেউ লাগবে না।…।’ তাঁর এ ভাবনাকে ঘিরেই কলা ভবনের পরিকল্পনা, পূর্ব ও পশ্চিমের নানা ঐশ্বর্যকে আমাদের ঐতিহ্যের সমন্বিত করার প্রয়াস। কলাভবনে নিয়মিত এনেছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা গুণী শিল্পী ও শিল্পরসিকদের। চিত্রশিল্পের প্রতি তাঁর এই ঐকান্তিক শ্রম এবং শিল্পের গুঢ়ার্থ বোঝার দায় তাঁকে শোধ করতে হয় নিকেই চিত্রশিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে।
১৯২০-২১ সালে রবীন্দ্রনাথ এক বছরের ওপরে ইউরোপ ও আমেরিকায় কাটিয়েছেন। এই সময় তিনি প্যারিসে ইউরোপের আধুনিক শিল্পীদের চিত্র প্রদর্শনী দেখেছেন। ঠিক পরের বছর রবীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথের আগ্রহে এবং ওরিয়েন্টাল সোসাইটির উদ্যোগে কলকাতায় পাশ্চাত্য আধুনিক শিল্পীদের বিশেষ করে বাউ হাউস গোষ্ঠীর শিল্পীদের একটি এক্সিবিশন হয় (ডিসেম্বর ১৯২২) এই প্রদর্শনীতে ক্যান্ডিনেস্কি, পল ক্লি, ফাইনিঙ্গার প্রমুখ বিখ্যাত আধুনিক শিল্পীদের ছবি দেখানো হয়। এর সবই রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যায়। বিশ শতকের শুরুতে আধুনিক শিল্প আন্দোলনের বিভিন্ন গতি ধারার সাথে রবীন্দ্রনাথের ছিল প্রত্যক্ষ পরিচয়।
‘ছবি বলতে আমি কী বুঝি সেই কথাটাই আর্টিস্টকে খোলাসা করে বলতে চাই। ছবি পাশ কাটিয়ে যেতে নিষেধ করে। যদি সে জোর গলায় বলতে পারে ‘চেয়ে দেখো’ তা হলেই মন স্বপ্ন থেকে সত্যের মধ্য জেগে ওঠে। ছবি বিশ্বের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলুক, ‘ওই দেখো আছে।’ আর্টিস্ট আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আর্টের সাধনা কী? আর্টের একটা বাইরের দিক আছে। সেটা হচ্ছে আঙ্গিক, টেকনিক, তার কথা বলতে পারিনে। কিন্তু ভেতরের কথা জানি। সেখানে জায়গা পেতে চাও যদি তাহলে সমস্ত চিত্ত দিয়ে দেখো, দেখো। বিশ্বের যেখানে প্রকাশের ধারা সেখানে যদি মনটাকে সম্পূর্ণ করে ধরা দিতে পারো। তাহলেই অন্তরের মধ্যে প্রকাশের বেগ সঞ্চারিত হয়, আলো থেকেই আলো জ্বলে। দেখতে পাওয়া মানে প্রকাশকে পাওয়া। বিশ্বের প্রকাশকে মন দিয়ে গ্রহণ করাই হচ্ছে আর্টিস্টের সাধনা।’ পশ্চিম যাত্রীর ডায়েরি (১৯২৫) এ তিনি এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন। নানা বাঁকবদলের পর শিল্প সম্পর্কিত উপলব্ধির পূর্ণতায় তিনি ততদিনে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশের জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
১৯২৪-এ পেরুর স্বাধীনতা শতবর্ষ পূর্তি দিবসে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যাত্রাপথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আর্জেন্টিনায় বিশ্রাম নিতে বাধ্য হন। সান ইসিস্রোতে তিনি প্রায় দুই মাস ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর (১৮৯১-১৯৭৯) আতিথ্যে প্রবাস যাপন করেন এখানেই রবীন্দ্রনাথের শিল্প জীবনের এক আশ্চর্য বাঁকবদলের সূত্রপাত। সময়ের তীব্র আহ্বান এবং শিল্পী চেতনায় ঋদ্ধ রবীন্দ্রনাথের শুধু দরকার ছিল কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীর আন্তরিক পরামর্শ। ভিক্টোরিয়া সেই দায়িত্ব পালন করে ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন। ভিক্টোরিয়ার আতিথ্যে প্রবাস যাপনের সময় পূরবী’র পাণ্ডুলিপি রচিত হচ্ছিল। ওকাম্পো কাটাকুটি সমন্বিত সেই পাণ্ডুলিপি দেখেছেন। এই কাটাকুটি গুলোর চিত্রগুণ দৃশ্যতাগুণের ছন্দ, গতি টেনশন ফর্ম কিছুই তার নজর এড়িয়ে থাকার মতো নয়। এর মধ্যে যে রূপ সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল তার পুরোটা ধরা পড়ে ওকাম্পোর কাছে। শিল্প সমুদ্রের অভিজ্ঞ নাবিক রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়ের ডাকে সারা দেন; যার ফলে জন্ম নেন ভারতীয় চিত্রকলার প্রথম আপাদমস্তক আধুনিক চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৯২৫ সালের জানুয়ারিতে আর্জেন্টিনা থেকে দেশে ফিরে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকর। পুরোপুরি চিত্রশিল্পী হিসেবে ছবি আঁকা শুরু করেণ ১৯২৮ সালে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পীরীতির সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সূত্রে তিনি জানেন যে আধুনিক চিত্রকলা দেশবিশেষের ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। উনিশশ ছাব্বিশে ঢাকায় ‘আর্ট অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’ বক্তৃতায় শিল্পীদের ওপর চাপানো সমস্ত দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে মুক্ত স্বাধীন সত্তা প্রকাশে এগিয়ে আসার আহ্বান তাই জানাতে পারেন এই সংস্কার ও সংকীর্ণতামুক্ত মহান শিল্পী, শিল্পচর্চার সূচনা থেকেই তাঁর ব্যাতিক্রমী রুচির পরিচয় পাওয়া যায়। পাণ্ডুলিপির কাটাকুটিগুলোকে তিনি দিতে চান শিল্পিত সমাধি। ‘I Must give them a decent burial’ এই উন্নত রুচিরই বহিঃপ্রকাশ চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ। চিত্র শিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব তাঁর সময়ের দাবি, তাঁর জ্ঞান সমুদ্রের অনিবার্য পরিণতি। তার শিল্প নিয়ে আলোচনায় এই দিকটি উপেক্ষিত হতে দেখা যায়। অথচ নব্যবঙ্গীয় চিত্রধারা নিয়ে আক্ষেপের সাথে আমরা পরিচিত চারদিকের আবেষ্টনী এবং সংস্কার নিয়ে রচিত শিল্পকর্ম যে প্রাণহীন হতে বাধ্য এ কথা রবীন্দ্রনাথ খুব দুঃখের সাথে তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে জাপান থেকে এক চিঠিতে ব্যক্ত করেছিলেন ‘আমাদের নববঙ্গের চিত্রকলায় আর একটু জোর সাহস এবং বিরাটত্বের দরকার। আমরা অত্যন্ত ছোটখাটোর দিকে ঝোঁক দিয়েছি, ওদের কারও এখানে আসার খুব দরকার আছে, নইলে আমাদের আর্ট একটু কুণো রকমের হবার আশঙ্কা আছে। গগন অবনরাও কোথাও নড়বে না কিন্তু নন্দলালের কি আসার সম্ভাবনা নেই?’
এই চিঠি থেকে তাঁর হতাশার পরিমাণটা যেমন বোঝা যায় তেমনি গগন অবন নন্দলালের বিষয়ে প্রকাশ পায় ঘোরতর সন্দেহ। তবে কি রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়ের শিল্পীদের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি এবং পরিণতিতে নিজেরই চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলো? চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাটা ১৯১৬ তেই হতে পারত কিন্তু এই বিষয়ে তাঁর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তাই পূর্ণাঙ্গ চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায় ১৯২৮ থেকে ততদিনে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে এবং এই জ্ঞান সমৃদ্ধ শিল্পীর বেদনা ও আক্ষেপ জমা হয়েছে অনেক। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আমাদের বিস্মিত করে রচনা করলেন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার চিত্রকর্ম। অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় Like volcanic lava-র স্রোতে তিনি রচনা করেন অভূতপূর্ব চিত্রকর্ম। অবনীন্দ্রনাথই যথার্থ উক্তিটি করেছিলেন তাঁর রবিকার চিত্রকলা সম্পর্কে ‘সময়ের দুর্নিবার চাহিদা এবং সংবেদনশীল বিদগ্ধ মনীষার অবশ্যম্ভাবী স্ফুরণ রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা।’