× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লেখা ও লড়াই: সাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষ

হামীম কামরুল হক

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৫:৪৩ পিএম

আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ২১:৫৬ পিএম

প্রাচীন যুগের মহাকাব্য বা মধ্যযুগের মহাকাব্যগুলোতে বীররসেরই প্রাধান্য; আর সেখানে শ্রমজীবী বলতে গেলে সবাই। কারণ লড়াইটা শরীর সম্বল করেই শ্রমের মাধ্যমেই করতে হয়। অলংকরণ : শতাব্দী জাহিদ

প্রাচীন যুগের মহাকাব্য বা মধ্যযুগের মহাকাব্যগুলোতে বীররসেরই প্রাধান্য; আর সেখানে শ্রমজীবী বলতে গেলে সবাই। কারণ লড়াইটা শরীর সম্বল করেই শ্রমের মাধ্যমেই করতে হয়। অলংকরণ : শতাব্দী জাহিদ

লেখা ও লড়াইÑ কথাটা নিয়েই প্রথমে কটি কথা বলা যাক। যদি বলা হয়: লেখাও লড়াই বা লড়াইও লেখাÑ রচনা অর্থে, নির্মাণ অর্থেÑ খুব কি তফাত ঘটে? কেউ লড়াই করেন কোনো কিছু পাওয়ার জন্য, কেউ লড়াই করেন পরিবর্তনের জন্য, কেউবা লড়াই করেন বিদ্যমান দশাকে আরও উন্নততর, আরও পরিশীলিত করার জন্য। ফলে জীবন মানেই লড়াই। যার যার মতো করে। মাঠ বদলে যায়, কিন্তু লড়াই থামে না। লড়াই জীবনের সংস্কৃতি। কিন্তু সব লড়াই একই পথে হয় না। সংঘর্ষের পথে যেমন লড়াই আছে, আছে শান্তির পথেও। শক্তি বা ক্ষমতার পরিচয় যে সব সময়, যে সংঘর্ষ দিয়েই দিতে হয়, তাও তো নয়। সাহিত্যের ভেতরের যে লড়াই, সেটিও সব সসময় সংঘর্ষ দিয়ে দেখানো হয় না। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাসে হরিহর থেকে অপুর যে-জীবন, তা তো জীবন সংগ্রামই, কিন্তু তারা কি শ্রমজীবী ছিলেন? ঠিক তেমনি, আমরা যদি বাংলা সাহিত্যের শুরুটায় চর্যাপদে যে ক্ষুৎকাতর নিরন্ন মানুষের ছবি পাই, শ্রমজীবীদের ছবি পাইÑ সেখানেও লড়াইটা সংঘর্ষের ছিল না। চর্যাপদ যদিও সাহিত্য বা কবিতা হিসেবে রচনার চেয়ে বৌদ্ধ-বাউলদের সাংকেতিক ভাষায় লেখা সাধন-সংগীত হিসেবেই মূলত রচিত হয়েছিল, কিন্তু এর প্রতীকে-সংকেতে ছিল প্রাচীন বাংলার শ্রমজীবী মানুষ। ডোম্বি বা মাঝি বা ব্যাধÑ এই প্রান্তিক মানুষেরা আদতে শ্রম দিয়েই জীবনধারণ ও জীবনযাপন করতেন।

অশ্রমিক চরিত্র তাদেরই বলা হয়, যারা মূলত কথার করাবারি। শ্রমজীবীকে শারীরিক শ্রম দিয়ে বেঁচে থাকার উপায়-উপকরণ জোগাড় করতে হয়। আমরা দেখি, প্রাচীন যুগের মহাকাব্য বা মধ্যযুগের মহাকাব্যগুলোতে বীররসেরই প্রাধান্য; আর সেখানে শ্রমজীবী বলতে গেলে সবাই। কারণ লড়াইটা শরীর সম্বল করেই শ্রমের মাধ্যমেই করতে হয়। তারপরও রাম বা যুধিষ্ঠির বা একিলিস বা হেক্টরকে আমরা শ্রমজীবী বলতে পারি না। কারণ তার সব সময়ই যুদ্ধ করেন না। যুদ্ধের সময় যুদ্ধ করেন। কিন্তু সাধারণ সৈনিককে নিত্যই পরিশ্রম করতে হয়, প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। সেনাপতিরা যুদ্ধের ছক সাজায় ও সেই মতো যুদ্ধ পরিচালনা করে থাকে।

কালের পালাবদলে সাহিত্যে, ক্রমে রাজরাজড়া বা রাজপুত্র রাজকন্যাদের কাহিনী থেকে সামন্ত বা জমিদার হয়ে উচ্চমধ্যবিত্ত, পরে মধ্যবিত্ত, আরও পরে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ বা একবারে প্রান্তিক মানুষরাÑ গণ্যতা মান্যতা পেতে শুরু করেন। সাহিত্য যত আধুনিক হয়েছে, ততই সেখানে যে চরিত্রগুলো এসেছে, তাতে আগের চরিত্রদের যে বীরত্ব বা নায়কত্ব ঘুচে গেছে। সাহিত্য ক্রমে হয়ে উঠেছে নায়কহীন চরিত্রের সমাবেশ। নারীরাও আর সেখানে রাজকন্যা বা রাজকুমারী নন, নায়িকাও নন। যদিও প্রধান বা প্রটাগনিস্ট হিসেবে আমরা তাদের নায়ক বা নায়িকাই বলি, যেমন তারাশঙ্করের কবি উপন্যাস নিতাই নায়ক এবং তার দুই নায়িকা বসন ও ঠাকুরঝি। এরা আর একদিকে শ্রমজীবী মানুষ; যদিও একদম নিপাট শ্রমিক নন। শ্রমিক অর্থে কলে-কারখানায় কাজ করা শ্রমিক বা দিনমজুর। যেমন কৃষক শ্রম দেন, সেই অর্থে তিনিও শ্রমিক। আমরা বলতে পারি : সব কৃষকই শ্রমিক, কিন্তু সব শ্রমিকই কৃষক নন। কারণ কৃষিকাজ জমিতে মাঠে ও ফসলের উৎপাদনে। শ্রমিকের মূল কাজ যান্ত্রিক; কারখানায় বস্তু উৎপাদনেই তিনি নিয়োজিত থাকেন।

শ্রমিকের জীবন নিয়ে কবিতায় কবিতায় একসময় মুখরিত হয়ে উঠেছিল বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গন। ফরাসি ও রুশ কবিরা উদাত্ত কণ্ঠে বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন যেমন, তেমনই বাংলা সাহিত্যের কুড়ি তিরিশ চল্লিশ থেকে ষাট কি সত্তর দশক অব্দি কবিতা শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্বের গান ও বয়ানে অকুণ্ঠ। কাজী নজরুল ইসলামকে এর শিরোমণিই বলতে হয়। পরবর্তীকালে তিরিশের বিষ্ণু দে থেকে সুকান্ত ভট্টাচার্য থেকে সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্রসহ চল্লিশ পঞ্চাশের কবিতা শ্রমজীবী জীবনের অনেক ছবি ও চিত্রকল্প দিয়ে গড়া। ভিন্নভাবে তারাই আছেন শঙ্খ ঘোষ কী জয় গোস্বামীর কবিতায়ও। বাংলাদেশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিকসহ বিপুল পরিমাণ কবি শ্রমজীবী ও লোকায়ত জীবনের ক্ষোভ-সংক্ষোভ তুলে ধরেন। 

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে মার্ক্সবাদী চিন্তার জায়গা থেকে সাহিত্যে শ্রমজীবীর নতুন মান্যতা দেখা দেয়। আধুনিক সময়ে সেটি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসে। এ ছাড়াও গোর্কির আত্মজৈবনিক রচনা, যেটিকে হায়াৎ মামুদ গোর্কির ‘ত্রিপিটক রচনা’ বলেন: আমরা ছেলেবেলা, পৃথিবীর পাঠশালায় ও পৃথিবীর পথেÑ সেখানেও শ্রমিকের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। ফরাসি বিপ্লব থেকে সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার ডাক দিলেও এতে সাহিত্যে শ্রমজীবীদের প্রাধান্য তৈরি হয়নি, মূলত আভিজাত্যকে ভেঙে দেওয়ার প্রয়াস ছিল। কিন্তু রুশ বিপ্লবের পর থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে সাহিত্যে শ্রমজীবীরাই নায়ক হয়ে দেখা দেন। এমনকি বীর-চরিত্র হিসেবে; জীবন নামের মহাসমরে তারা সবচেয়ে বড় বীর।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক সময়ে শ্রমজীবী চরিত্র নিয়ে সবচেয়ে ক্ল্যাসিক রচনা যেটিকে বলতে হয়, সেটি হলো রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী। বুদ্ধদেব বসুর মতে, রবীন্দ্রনাথের একক কোনো রচনাকে মাস্টারপিস বলা যায় না, কিন্তু রক্তকবরী নতুন পাঠে পাঠক, এখন কী মনে হয় না, এটিই আসলে রবীন্দ্রনাথের সেই রচনাÑ যেখানে মানুষ সম্পর্কে এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে রবীন্দ্রনাথ চূড়ান্ত স্তরে নিয়ে হাজির করেছেন, যা মূলত তাঁর জীবনদৃষ্টির সারসংক্ষেপÑ এই দিক থেকে এটাই তাঁর মাস্টারপিস? তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো ১৯২৬ সালে প্রকাশিত এই নাটকটির এই বছরই রচনা-শতবর্ষ। এ এক আশ্চর্য লেখা। এতে দেখা যায়, মূল কলকাঠি নাড়া ধনিক-বণিক শ্রেণির মানুষরা একেবারেই আড়ালে-অগোচরে থাকে; আদতে সব সময়ই তারা এমনই থাকে বা ছিল। রাজাকে তারা সামনে রেখে চালিয়ে যায় তাদের শাসনশোষণের কারবার। নন্দিনী, কিশোর, বিশু পাগল বা রঞ্জনদের বিপরীতে আমরা সর্দারদের দেখতে পাই, তারা আসলে প্রতিনিধিমাত্র। ধনিক-বণিকরা মানুষকে সংখ্যাতে পরিণত করেছে। শ্রমজীবীরা স্রেফ সংখ্যা, নাম-পরিচয়হীন মানুষ। তীব্র কঠিন শোষণে জর্জরিত এই জনপদের মুক্তি তখনই হবে, যখন স্বয়ং রাজা সবার সঙ্গে একযোগে এসে এই ব্যবস্থার উৎখাত ঘটাবে। রক্তকরবী আসলে সেই আহ্বানই জানায়। শ্রমেই তৈরি হবে সৌন্দর্য, শ্রমেই তৈরি হবে যাপনের নিজস্ব আনন্দ-ঐশ্বর্য, যে ঐশ্বর্য বস্তুগত সম্পদের চেয়ে বড়।

বাংলা সাহিত্যে শ্রমজীবীদের দারুণভাবে ও শৈল্পিক সুষমায় হাজির করেছেন যারা তাদের মধ্যে প্রধানতম হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। পদ্মা নদীর মাঝি থেকে চিহ্ন উপন্যাসে সেই শ্রমজীবীদের লড়াই ও নতুন ভুবন নির্মাণের পথ উন্মোচিত হয়। শরৎচন্দ্র তাঁর পথের দাবিতে লড়াই ও মুক্তির ডাক দিলেও সেটি শিল্পের চূড়ান্ত সামর্থ্য অর্জন করছে কি না, এ নিয়ে তর্ক আছে। সেদিক থেকে সমরেশ বসু তাঁর নয়নপুরের মাটি, উত্তরঙ্গ, শ্রীমতি কাফে, বঘিনী থেকে জগদ্দল হয়ে টানাপড়েন বা বাথানে শ্রমজীবী মানুষদের বিচিত্র বর্গগুলোকে হাজির করেছেন। চটকল শ্রমিক থেকে শুরু করে শুড়ি কি গোয়ালাদের নতুনভাবে দেখা যায় তাঁর উপন্যাসে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর একটির পর একটি গল্প-উপন্যাসে বিচিত্র বয়ানে একসময় মুখরিত হয়েছিল বাংলা কথাসাহিত্য। দেবেশ রায়ে তিস্তাপারের বৃত্তান্তের বাঘারু শ্রমজীবী মানুষের মাধ্যমে নতুন স্বদেশ জিজ্ঞাগা তৈরি করে। এ ছাড়া তাঁর সময় অসময়ের বৃত্তান্ত, তিস্তাপুরাণ বাংলা উপন্যাসে যে নতুন দুয়ার খুলে দিল, সেটি শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি অপার দরদের সূত্র ধরেই সম্ভব হয়েছে।

বিশ্ববিখ্যাত ছোটগল্পকার প্রায় সবাই অ্যাডগার অ্যালান পো, নিকোলাই গোগল, গী দ্য মোপাসাঁ, ও’ হেনরিÑ কমবেশি শ্রমজীবী মানুষদের হাজির করেছেন। গী দ্য মোপাসাঁর ‘নেকলেস’ গল্প তো শ্রমজীবী মানুষের গল্পই হয়ে ওঠে। ও’ হেনরির ‘দ্য গিফট অব মেজাই’ও তাই। আপটন সিনক্লেয়ারের ‘দ্য জাঙ্গল’ (১৯০৫) উপন্যাসের শ্রমজীবীদের জীবন এমনভাবেই উঠে আসে যে, এর ফলে সংসদে নতুন বিল পাস করতে হয়। কারও মতে, রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী লিখতে গিয়ে এই উপন্যাসের থিম ও চরিত্রগুলো ভেঙে নিজের মতো গড়েছেন। সিনক্লেয়ার নিজেই বলে তার বেশ কিছু বইপত্র রবীন্দ্রনাথকে উপহার দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের ছোটগল্প-উপন্যাসের প্রধান প্রধান প্রতিভূরা যেমন আবুজাফর শামসুদ্দীন, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সরদার জয়েনউদ্দীন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ থেকে শুরু করে শওকত ওসমান, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জমান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ থেকে শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন, ওয়াসি আহমেদ, সেলিম মোরশেদ, পারভেজ হোসেন, নাসরীন জাহান বা ইমতিয়ার শামীমদের অনেক গল্পে ও উপন্যাসে শ্রমজীবী মানুষের বয়ান হাজির করা হয়েছে। ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই ও খোয়াবনামা উপন্যাসে শ্রমজীবী মানুষরাই ভিড় করে আছে। তমিজ ও তমিজের বাপ বা হাড্ডি খিজির এঁরা শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি। শহীদুল জহিরের ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাকে’র মতো গল্পে শহুরে নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষের নীরব চিৎকার রূপান্তরের দিকে চলে যায়।

বাংলা নাটক শ্রমজীবী মানুষের আরেক রচনাভূমি। বিশেষ করে বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ থেকে শুরু করে সেলিম আল দীনের চাকা নাটকের ভেতরে দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের পরিচয় ও পরিচয় হারানোর আখ্যান তৈরি হয়। সৈয়দ শামসুল হক, মমতাজউদদীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদসহ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের নাটকে শ্রমজীবীদের অস্তিত্বের সংগ্রাম গ্রাম নগর হাটবাজার বস্তি থেকে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্যের কাল্ট ফিগার চার্লস বুকোস্কি বা কিউবার ব্যতিক্রমী কথাাসাহিত্যিক পেদ্রো হুয়ান গুতিয়েররেস ‘ডার্টি রিয়ালিজমে’র যে ধরন-বরন তৈরি করেছেনÑ সেখানে শহুরে নিম্নবর্গে মানুষের বাস্তবতা যৌনতা-মৌনতা মুখরিত। আদতে তাঁদের লেখা শ্রমজীবী ও শ্রমশোষণের শিকার মানুষের কাহিনী হয় ওঠে না কি?

শ্রম ছাড়া জীবন হয় না। শ্রমজীবী যদি তার কাজের সঙ্গে ঐকান্তিকভাবে যুক্ত থাকেন, আনন্দের সঙ্গে নিজের কাজ করতে পারেন, তার কাজের পারিশ্রমিক যথাযথভাবে পান, তাহলে সমাজের দারুণ ভারসাম্য তৈরি হতে শুরু করে। ইউরোপের সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা পশ্চিমা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় সেই চিত্রও দেখা যায়। মার্ক্স চেয়েছিলেন, প্রকৃতি, সমাজ ও ব্যক্তিসত্তার যথাযথ বিকাশ। তিনি পদ্ধতি বা মেথড দিয়েছিলেন, যে পদ্ধতিটি গতিশীল এবং সময়ের সঙ্গে যার অভিযোজন ঘটবে। কিন্তু মানুষের দুর্ভাগ্য তা হয়নি। তাঁর মেথডকে অনড় সিস্টেম ভাবা হয়েছে। কোথাও সেটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে সেই অর্জনকে আরও দূরবর্তী করে দেওয়া হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের সত্যিকারের মুক্তি অর্জিত হয়নি। আসলে একরৈখিক কোনো কিছুর ভেতর দিয়ে তা হওয়াও সম্ভব নয়। সমন্বিত জীবন ও মানব সম্পর্কের সঠিক বিন্যাসের ভিত্তিতে যখন কর্তৃত্ববাদী ও আধিপত্যবাদী সমস্ত কিছুর অবসান ঘটবে, হয়তো তখন তা ঘটতে পারে। তখন সাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও মনের অন্যস্তরের কথা কাহিনী উঠে আসতে পারে। সেই সময়ও আগত প্রায়। 

বিবেকানন্দ বলেছিলেন যে, যুগেরও চারটি ধরন আছে। একসময় ছিল ব্রাহ্মণ যুগ: ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় শাসন বিধান ছিল তখন প্রধান; এরপর এসেছিল ক্ষত্রিয় যুগ: এ যুগে রাজরাজড়ারা যুদ্ধবিগ্রহ দেশের সীমানা বাড়ানো সাম্রাজ্যবাদ এসবই ক্ষত্রিয় যুগের লক্ষণ। সেই কালও অতিবাহিত। এখন এসেছে বৈশ্য যুগ : ব্যবসা-বাণিজ্য ও এর চালকরাই সমস্ত দণ্ডমুণ্ডের আসল কর্তা; নেতা বা রাষ্ট্রের নানান নির্বাহীরা স্রেফ এঁদের তল্পিবাহক। সামনে শূদ্র যুগ: তখন সাধারণ মানুষরাই হবে সমাজের আসল চালিকাশক্তি। ইতিহাস তাদের হাতেই সত্যিকারের গতিপথ পাবে। সাহিত্যের ইতিহাসের আগে ও পরেও এর নানান নমুনা আছে। যে কারণে লেভ তলস্তয়কে বিশাল উপন্যাস লিখতে হয়েছিল, যে উপন্যাসের নাম ‘যুদ্ধ ও শান্তি’। তিনি দেখিয়েছিলেন: ইতিহাসের পরিবর্তন কোনো ব্যক্তি-মানুষের মাধ্যমে হয় না, সেটি তখনই হয়, যখন সাধারণ মানুষরা তাদের ভূমিকা পালন করে, সাধারণ মানুষেরাই ইতিহাসের চালিকাশক্তি।Ñ এই সাধারণ মানুষদের বড় অংশ মূলত শ্রমজীবী মানুষ; সমাজ পরিবর্তনের অবিশ্বাস্য সম্ভাবনা নিত্য তারাই বুকে ধারণ করেন; সাহিত্য কেবল সেখানে জ্বলে ওঠার ইন্ধন জোগায়মাত্র।


লেখক পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। পেশা : শিক্ষকতা; তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা