× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শ্রমজীবী মানুষের সাহিত্যিক কেন্দ্রায়ন

সৈকত আরেফিন

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ১৫:২৬ পিএম

দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থান কেবল কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের সাহিত্যিক উপস্থিতির ঘটনা নয়। একে বলা যায়, বয়ানের গভীর কেন্দ্রবদল। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থান কেবল কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের সাহিত্যিক উপস্থিতির ঘটনা নয়। একে বলা যায়, বয়ানের গভীর কেন্দ্রবদল। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল স্থাপনাসমূহের গা থেকেও নির্মাতার হাতের দাগ সহজে মুছে যায়। আর ইতিহাস যখন উচ্চকণ্ঠে রাজা, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, ক্ষমতা, বিপ্লব ও বিজয়ের কথা বলে, তখনও তার জটিল বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে অনুচ্চারিত থেকে যায় সেইসব মানুষের নাম, যারা ভোরের অন্ধকার ভেঙে মাঠে যায়, প্রমত্তা নদীতে জাল ফেলে, দাঁড় টানে, কাদা মাড়ায়, ইট বহন করে, ঘর সামলায়, ক্ষুধাকে ঠেকিয়ে রাখে এবং সারা দিনের শেষে ভাঙা ঘরে ফিরে জীবনের নিবু-নিবু শিখাটিকে দুহাতে আগলে রাখে। অথচ তাদের ঘাম, শরীরের ক্ষয়, নীরব সহিষ্ণুতা এবং অদম্য বহনশক্তি সমাজের দৃশ্যমান স্থিতি, প্রতিদিনের রুটি, বাজারের গতি, ঘরের উষ্ণতা, এমনকি রাষ্ট্রের দৃঢ়তম কাঠামোর নিচেও স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে। তারাই উৎপাদনের কেন্দ্র, অথচ প্রতিনিধিত্বের প্রান্তে; তারাই জীবনযাত্রার ভিত অথচ ক্ষমতাভাষ্যের বাইরে। সম্ভবত এই গভীর বৈপরীত্যই দেশ বিভাগোত্তর পূর্ববাংলা ও বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থানকে শুধু সামাজিক বা ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এক তাৎপর্যপূর্ণ নন্দনতাত্ত্বিক রূপান্তর হিসেবেও চিহ্নিত করে।

দেশ ভাগের পর পূর্ববাংলা যে জীবনবাস্তবতার মুখোমুখি হয়Ñ দারিদ্র্য, উন্মূলতা, নদীভাঙন, ভূমিহীনতা, ভাষা-সংগ্রাম, গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর নিষ্ঠুরতা, নগরমুখী অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বঞ্চনা, মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাত এবং স্বাধীনতার পরও না-মুছে যাওয়া বৈষম্য বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে নিচুতলার মানুষের দিকে নতুনভাবে তাকাতে বাধ্য করে। এই তাকানো নিছক সহানুভূতির নয়; এর ভেতরে আছে বাস্তবতাকে তার কঠিনতম স্থানে গিয়ে ধরার শিল্পীসুলভ দায়। এখানে শ্রম কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি অস্তিত্বের ব্যাকরণ। মানুষের শরীরই তার প্রথম পুঁজি, সহিষ্ণুতাই তার মূলধন, আর বেঁচে থাকাই তার প্রতিদিনের শ্রম। ফলে শ্রমজীবী মানুষ আর কাহিনীর প্রান্তসজ্জা হয়ে থাকে না; তারা হয়ে ওঠে সমাজবাস্তবতার গভীরতম ভাষ্য, ইতিহাসের নিচুতলার অনিবার্য সাক্ষী এবং মানবিকতার এক নতুন নন্দনকেন্দ্র।

তাহলে ‘শ্রমজীবী চরিত্র’ বলতে আমরা কাদের বুঝব? কেবল কারখানার শ্রমিক কিংবা মজুরই নয়, জেলে, মাঝি, ক্ষেতমজুর, দরিদ্র কৃষিজীবী, অদৃশ্য গৃহশ্রমে ক্লান্ত নারী, উপকূলের প্রতীক্ষাময় স্ত্রী, শহুরে নিম্নবর্গ এবং সেইসব মানুষ, যাদের জীবন নিজেই এক অবিরাম পরিশ্রমের নাম তারাও শ্রমজীবী চরিত্র। এই বর্গ ধরে আমরা কয়েকটি চরিত্র বেছে নিতে পারি, যেমন, আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ীর জয়গুন, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম-এর বাসন্তী ও কিশোর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামার তমিজ ও কুলসুম, চিলেকোঠার সেপাইয়ের খিজির এবং শহীদুল্লা কায়সারের সারেং বৌয়ের নবিতুন। এই চরিত্রগুলো বেছে নেওয়ার কারণ যে, তারা কেবল ব্যক্তি নয়; তারা একেকটি জীবনভূগোল, একেকটি শ্রেণি-অভিজ্ঞতা, একেকটি ঐতিহাসিক ক্ষত, একেকটি টিকে থাকার ভাষা। এদের মধ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্য দেখায়, শ্রমজীবী মানুষকে শুধু করুণার বিষয় হিসেবে পড়া যায় না; তারা পূর্ণ মানুষÑ তাদের আছে ক্ষুধা, লজ্জা, স্বপ্ন, জেদ, কামনা, বেদনা, অপমান, নীরবতা এবং প্রতিরোধ।

ফলে দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থান কেবল কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের সাহিত্যিক উপস্থিতির ঘটনা নয়। একে বলা যায়, বয়ানের গভীর কেন্দ্রবদল। এই সাহিত্য আমাদের শেখায়, সমাজ যাদের নিচে ঠেলে রাখে, মানুষের গভীরতম সত্য অনেক সময় তারাই বহন করে। যে মানুষ মাটি চেনে, জল, খিদে, অপমান ও পরিশ্রমের নির্মম শিল্প চেনেÑ বাংলাদেশের কথাসাহিত্য শেষ পর্যন্ত তার ভেতরে খুঁজে পায় তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবিক, নৈতিক এবং নান্দনিক কেন্দ্র।

এক. 

বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের জীবন একেবারেই অনালোচিত ছিলÑ এ কথা বলা অন্যায় হবে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে, এমনকি উনিশ ও বিশ শতকের বহু কথাসাহিত্যিকের রচনায় সমাজের নিচুতলায় থাকা মানুষের প্রতি গভীর মানবিক দৃষ্টি দেখা যায়। তারা অবহেলিত মানুষকে নিছক করুণার পৃষ্ঠায় তুলে রাখেননি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের বেদনার অন্তর্লীন মর্যাদা, নীরবতার ভেতরে জমে থাকা অপমান, সামাজিক উপেক্ষার অদৃশ্য ক্ষতকে সাহিত্যিক আলোয় এনেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে সাধারণ মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা, ভদ্রসমাজের বাইরে থাকা মানুষকেও সাহিত্যের উপযুক্ত বিষয় বলে স্বীকার করার যে ঐতিহ্য, তার প্রাথমিক দীপ্তরেখা বলা বাহুল্য, তাদের হাতেই অঙ্কিত।

তবু এই মানবিক দৃষ্টিরও একটি সীমা ছিল। সে সীমা অবজ্ঞার নয়, অবস্থানের; অনুকম্পার নয়, দূরত্বের। প্রান্তিক মানুষ সেখানে দৃশ্যমান হয়েছে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে নিজের সম্পূর্ণ সামাজিক, পেশাগত ও ঐতিহাসিক ঘনত্ব নিয়ে নয়। তাদের দুঃখ আছে, বেদনা আছে, হৃদয়স্পর্শী উপস্থিতি আছে; কিন্তু তাদের শ্রমের প্রতিদিনকার কঠোরতা, পেশার অনিশ্চয়তা, উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অবমাননা, গোষ্ঠীজীবনের অন্তর্গত টানাপড়েন, কিংবা ইতিহাসের নিচুতলার ভাষা সব সময় সমানভাবে কাহিনীর ভেতরে রক্তসঞ্চার করতে পারেনি। অর্থাৎ তারা সাহিত্যে প্রবেশ করেছে বটে, কিন্তু এখনো সব ক্ষেত্রে নিজেদের জীবনবিশ্বের কেন্দ্র থেকে কথা বলছে না।

ঠিক এই বীক্ষণবিন্দুতে দেশ বিভাগোত্তর পূর্ববাংলা ও বাংলাদেশের কথাসাহিত্য বাংলা গদ্যের মানচিত্রে এক নতুন ভূগোল উন্মুক্ত করে। কারণ এই ভূখণ্ডের জীবন ছিল ভিন্নতরÑ আরও নদীনির্ভর, আরও অনিশ্চিত, আরও কাদামাটি-লেপা, আরও অভাবসংকুল, আরও দৃশ্যমানভাবে সংগ্রামময়। এখানে ভূমি স্থির নয়, নদী স্থির নয়, জীবিকাও স্থির নয়। ফলে মানুষের জীবনও নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য ছকে বাঁধা নয়। ফলত, বাংলাদেশের সাহিত্য যখন নিজের ভাষা খুঁজতে শুরু করল, তখন তার পক্ষে কেবল ভদ্রলোকের জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখা সম্ভব ছিল না; তাকে নেমে আসতেই হলো জীবনের সেই তলদেশে, যেখানে পরিশ্রম মানে বেঁচে থাকা, আর বেঁচে থাকা মানেই প্রতিদিনের কঠিন শ্রম।

রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে যদি মানবিক দৃষ্টির প্রস্তুতিপর্ব বলা যায়, তবে দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্য সেই দৃষ্টিকে আরও মাটিসংলগ্ন, আরও ক্ষুধাসংলগ্ন, আরও ইতিহাসসংলগ্ন এবং আরও শরীর ঘন করে তোলে। এখানে প্রান্তিক মানুষকে দূর থেকে দেখা হয় না; তাকে তার নিজস্ব ভূগোল, ভাষা, পেশা, অপমান, দেহ ও সময়ের ভেতর দাঁড় করিয়ে দেখা হয়। এই দেখার ভঙ্গিই বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে স্বতন্ত্র করেছে এবং এই ভঙ্গির মধ্য দিয়েই শ্রমজীবী চরিত্র সাহিত্যের কিনারায় পড়ে থাকে নাÑ সে এসে দাঁড়ায় তার দীপ্ত, দগ্ধ, স্পন্দিত কেন্দ্রে।

দুই. 

দেশভাগ কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এটি ছিল মানুষের শরীর, স্মৃতি, ভিটে, নিরাপত্তা, ভাষা, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার এক নির্মম মুহূর্ত। মানচিত্রে একটি রেখা টানা হয়েছিল, কিন্তু সেই রেখা কেবল ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করেনি; মানুষের জীবনকেও অদৃশ্যভাবে নানা স্তরে বিদীর্ণ করে দিয়েছিল। পূর্ববাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান এবং আরও পরে বাংলাদেশÑ এই দীর্ঘ রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যে সমাজ গড়ে ওঠে, তার অভ্যন্তরস্থ সত্যের এক বৃহৎ অংশ নিহিত রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে। কারণ ইতিহাসের বড় অভিঘাত সবার ওপর সমানভাবে নেমে আসে না; তার সবচেয়ে তীব্র চাপ পড়ে তাদের ওপর, যাদের অস্তিত্ব প্রতিদিনের শ্রমের সঙ্গে বাঁধা।

পূর্ববাংলার ভূগোল নিজেই এমন এক বাস্তবতা নির্মাণ করে, যেখানে শ্রম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; বেঁচে থাকার এক অন্তহীন দেহগত অনুশীলন। নদী এখানে আশীর্বাদও, অভিশাপও; জমি এখানে সম্পদও, আবার অনিশ্চয়তার আরেক নামও; প্রকৃতি এখানে জীবনদাত্রীও, আবার নির্মম বিধ্বংসীও। নদীভাঙন, চরজন্ম, বন্যা, খরা, নোনাজল, ফসলহানিÑ এসব শুধু প্রকৃতির ঘটনা নয়, সমাজেরও ভাষা। কারণ এই ভূখণ্ডে প্রকৃতির পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে বদলে দেয় জীবিকার প্রকৃতি, বসতির অবস্থান, খাদ্যের নিরাপত্তা, পারিবারিক স্থিতি, এমনকি মানুষের মর্যাদাবোধ পর্যন্ত।

ফলে এখানে জেলে, মাঝি, ক্ষেতমজুর, প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, খেতের নারী, কিংবা উপকূলের অপেক্ষমাণ নারীর জীবন বোঝা মানে কেবল তাদের অর্থনৈতিক সংকট বোঝা নয়Ñ একটি সমগ্র জীবনব্যবস্থা, এক জৈব সামাজিক ভঙ্গুরতা, এক অন্তহীন টিকে থাকার ব্যাকরণ বোঝা। শ্রমজীবী মানুষের জীবন এই সমাজে সর্বদাই পরস্পরবিরোধী: তারা উৎপাদনের কেন্দ্রীয় শক্তি, কিন্তু সামাজিক ক্ষমতার প্রান্তে; তারা বেঁচে থাকার বাস্তব কারিগর, কিন্তু মর্যাদার কাঠামোয় নিচুতলায় ঠেলে রাখা মানুষ।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্য ধীরে ধীরে এই বেষ্টিত, চাপা, অপমানিত অথচ অবিশ্বাস্যরকম স্থিতিস্থাপক মানুষগুলোকেই গভীরতর দৃষ্টি দিয়ে দেখতে শুরু করে। ভাষা-আন্দোলন, নগরমুখী সঞ্চরণ, রাজনৈতিক বৈষম্য, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার অসম বণ্টনÑ সব মিলিয়ে এই বাস্তবতা এমন এক সাহিত্যিক জরুরি অবস্থা সৃষ্টি করে, যেখানে শ্রমজীবী মানুষকে উপেক্ষা করে এই ভূখণ্ডের সত্য-বিবরণ লেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাহিত্য এখানে কেবল জীবনকে প্রতিবিম্বিত করেনি; দৃশ্যমানতার বাইরে ঠেলে রাখা জীবনকে ভাষা দিয়েছে, অভিজ্ঞতাকে মর্যাদা দিয়েছে এবং প্রান্তিকতার ভেতরে ইতিহাসের সক্রিয় স্পন্দন আবিষ্কার করেছে।

আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্ব দাবি করে। দেশ বিভাগোত্তর কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থান কেবল অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রতিনিধিত্বের সংকটও। কারা সাহিত্যোপযোগী মানুষ? কার জীবনকে ‘উপন্যাসযোগ্য’ বলে ধরা হবে? কার বেদনা শুধু পরিসংখ্যান নয়, কাহিনী হয়ে উঠবে? কার ভাষা সাহিত্যিক মর্যাদা পাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও বদলাতে থাকে। ফলে শ্রমজীবী মানুষের আবির্ভাব শুধু সমাজের তলদেশকে দৃশ্যমান করেনি; সাহিত্যের নৈতিক সংজ্ঞাও বদলে দিয়েছে।

এই সমগ্র পটভূমিতে শ্রমজীবী চরিত্রের আবির্ভাবকে তাই সাহিত্যিক ফ্যাশন বলা যাবে না কিংবা কৃত্রিম জনদরদ হিসেবেও ভাবা যাবে না। একে বরং বলা যায় ঐতিহাসিক প্রয়োজন, নৈতিক বাধ্যতা এবং শিল্পীসুলভ সততার দাবি। বাংলাদেশের সাহিত্য যদি সত্যিই এই ভূখণ্ডের গভীর জীবনকে ধারণ করতে চায়, তবে তাকে ফিরতেই হতো সেইসব মানুষের কাছে, যাদের ঘাম ছাড়া এ সমাজের ভৌত রূপরেখা অসম্ভব, কিন্তু যাদের বেদনা, বহন ও নীরব সহিষ্ণুতা ছাড়া এ সমাজের নৈতিক ইতিহাসও অসম্পূর্ণ।

তিন. 

‘শ্রমজীবী মানুষ’ কোনো একরৈখিক পরিচয় নয়। নদীর জেলে, ক্ষেতমজুর, শহুরে নিম্নবর্গ, গ্রামীণ পরিত্যক্তা নারী, উপকূলের প্রতীক্ষাময় স্ত্রীÑ এদের জীবন এক নয়, পরিশ্রমের প্রকৃতি এক নয়, দারিদ্র্যের ভাষা এক নয়, অপমানের ধরনও এক নয়। এই কারণেই এখানে আমরা বিমূর্ত শ্রেণিশব্দের বদলে কয়েকটি নির্দিষ্ট চরিত্রকে বেছে নিয়েছি। কেননা চরিত্রের ভেতর দিয়েই সামাজিক বাস্তবতা রক্তমাংস পায়; শ্রেণি তখন কেবল তত্ত্ব থাকে না, মানুষের মুখ পায়, শরীর পায়, ভাষা পায়।

ফলে এই আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ী-র জয়গুন; অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম-এর বাসন্তী ও কিশোর; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা-র তমিজ ও কুলসুম; চিলেকোঠার সেপাই-এর খিজির এবং শহীদুল্লা কায়সারের সারেং বৌ-এর নবিতুন। আমরা বলেছি, এরা কেবল স্মরণযোগ্য চরিত্র নয়; এরা প্রত্যেকে বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার আলাদা আলাদা স্তর, আলাদা শ্রমভূগোল, আলাদা অস্তিত্বরীতি এবং আলাদা নন্দনতাত্ত্বিক তাৎপর্যের বাহক।

জয়গুন গ্রামীণ দরিদ্র নারীর ক্ষুধা, মাতৃত্ব, পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন এবং বেঁচে থাকার জেদকে ধারণ করে। বাসন্তী ও কিশোর নদী, জেলে-সমাজ, পেশাজীবী সামষ্টিকতা এবং বিলীয়মান জীবনভূগোলের প্রতিনিধি। তমিজ ও কুলসুম নিচুতলার মানুষের ইতিহাস, জমি, লোকবিশ্বাস, স্বপ্ন, শ্রেণি ও মানসিক জটিলতাকে ধারণ করে। খিজির উন্মোচন করে শহুরে নিম্নবর্গ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নাগরিক প্রান্তিকতার চাপা দহন। নবিতুন দৃশ্যমান করে অদৃশ্য গৃহশ্রম, উপকূলীয় অনিশ্চয়তা, অনুপস্থিত পুরুষ-অর্থনীতির ভার এবং নারীর বহন করা নীরব জীবন।

এরা মিলে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষের এক পূর্ণতর শরীর নির্মাণ করেÑ যেখানে শ্রম আছে, ক্ষুধা, প্রেম, লজ্জা, অপমান, আশা ও পরাজয় আছে এবং আছে ভেঙে না-পড়া মানুষের অনমনীয় অন্তঃশক্তি। এই চরিত্রগুলোকে পাশাপাশি পড়লে বোঝা যায়, শ্রমজীবী জীবন কোনো একক ছাঁচে তৈরি নয়; তা নদী, মাটি, শহর, ঘর, ইতিহাস, লিঙ্গ, ভাষা ও ক্ষমতার সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত।

তবে এই নির্দিষ্ট কয়েকটি চরিত্রের নির্বাচন চূড়ান্ত বা একমাত্রিক নয়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষের আরও বহু স্মরণীয় চরিত্র আছে। কিন্তু এই প্রবন্ধে বেছে নেওয়া চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য হলোÑ এরা একত্রে গ্রাম, নদী, শহর, উপকূল, নারী, পুরুষ, পরিবার, গোষ্ঠী, ইতিহাস, ভাষা এবং শ্রমের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য দুই স্তরকেই ধরার সুযোগ দেয়। ফলে আলোচনার নকশা যেমন দৃঢ় হয়, তেমনি চিন্তার পরিসরও প্রসারিত হয়।

চার. জয়গুন

দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে যদি এমন কোনো চরিত্রের সন্ধান করতে হয়, যার শরীরের ওপর একসঙ্গে এসে জমা হয়েছে দারিদ্র্য, মাতৃত্ব, সামাজিক অবজ্ঞা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, অদৃশ্য শ্রম, দৃশ্যমান সংগ্রাম এবং টিকে থাকার প্রায় অবিশ্বাস্য জেদÑ তবে আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ী-র জয়গুন সন্দেহাতীতভাবে সেই চরিত্র। সে কেবল একটি উপন্যাসের নায়িকা নয়; সে এক সমগ্র সামাজিক বাস্তবতার ঘনীভূত রূপ।

জয়গুনের সবচেয়ে বড় শক্তি এই যে, তাকে করুণার জন্য নির্মাণই করা হয়নি। তাকে দেখে আমাদের মায়া জাগে, তবে সাহিত্য তাকে মায়ার পাত্র করে থামিয়ে দেয় না। ফলে জয়গুন দগ্ধ, কিন্তু ভগ্ন নয়; নিঃস্ব, কিন্তু নিষ্প্রাণ নয়; অবদমিত, কিন্তু অবলুপ্ত হওয়ার নয়। তার জীবনের ভেতরে গতির যে প্রবহমানতাÑ সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখা, ভাঙা সংসারকে জোড়া দিয়ে রাখা, প্রতিকূল সামাজিক আবহাওয়ার মধ্যে কোনোভাবে টিকে থাকা, অনাহারকে প্রতিদিন একটু পিছিয়ে দেওয়া, সেই প্রবহমানতাই তাকে শ্রমজীবী চরিত্রের এক অনন্য কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করে।

জয়গুনের শ্রম দৃশ্যমান ও অদৃশ্যÑ দুই-ই। সে কেবল বাইরে গিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করে না; সে ঘর রক্ষা করে, সন্তানদের টিকিয়ে রাখে, ক্ষুধার ভেতরেও জীবনকে ভেঙে পড়তে দেয় না। ফলে তার শ্রম দ্বিমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক। এই বহুগুণিত শ্রমের চাপ জয়গুনকে শুধু দারিদ্র্যের শিকার নয়, শ্রম-অভিজ্ঞতার এক গভীর নৈতিক নায়িকায় রূপান্তরিত করে।

তার জীবনে ক্ষুধা কেবল খাদ্যাভাবের সংকট নয়; তা একই সঙ্গে সামাজিক, অস্তিত্বগত ও নৈতিক। অনাহার মানুষকে শুধু দুর্বল করে না, তাকে অপমানিতও করে; ভাতের অভাব মানে নিরাপত্তার অভাব, ভবিষ্যতের অভাব, নিজের শরীরের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা। ফলে জয়গুন কেবল ভাতের জন্য লড়ে না; সে লড়ে নিজের অস্তিত্ব, সন্তানের জীবন এবং মানুষ হিসেবে নিজের মর্যাদা ধরে রাখার জন্য। তার ক্ষুধা কেবলই ব্যক্তিগত সংকট নয়; সেটি একটি সমাজের নির্মম অর্থনীতি ও নৈতিক ব্যর্থতার দলিল।

জয়গুনের মাতৃত্বও এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কোনো আবেগঘন অলংকার নয়; এটি সামাজিক শ্রমের এক জ্বলন্ত রূপ। সে সন্তানকে শুধু ভালোবাসে না; তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজের শরীর, নিজের ইচ্ছা, নিজের নিরাপত্তাকেও প্রতিদিন খরচ করে। এই মাতৃত্বের মধ্যে আবেগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো দায়; মমতা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো প্রতিরোধী বহনশক্তি। তাই জয়গুনের মাতৃত্বকে নিছক জৈব সম্পর্ক হিসেবে নয়, সামাজিক পুনরুৎপাদনের এক নির্মম শ্রমপ্রক্রিয়া হিসেবেও পড়া দরকার।

ঠিক এখানেই জয়গুন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে গভীর তাৎপর্য লাভ করে। সে দেখায়, প্রান্তিক নারী কেবল পরিবার-নির্ভর জীবনের পরিশিষ্ট নয়; সে নিজেই একটি কেন্দ্র, এক দগ্ধ নৈতিক অক্ষ। তার অভিজ্ঞতা ধার করা নয়, স্বতন্ত্র; তার দুঃখ গৃহস্থালির অন্তরালে গিলে ফেলা কোনো নীরবতা নয়, তাকে বলা যায় সামাজিক সত্যের উন্মোচনকারী শক্তি। জয়গুনের জীবন প্রমাণ করে, দরিদ্র নারীর শ্রমকে যদি সাহিত্য গুরুত্ব না দেয়, তবে সমাজের বাস্তবতা অর্ধেকই অদৃশ্য থেকে যায়, আর মানুষের ইতিহাসও অর্ধেক নির্বাক হয়ে পড়ে।

এখানে নন্দনের প্রশ্নও জরুরি। জয়গুনের সৌন্দর্য কোনো কোমল অলংকারে নয়; তা তার সহিষ্ণুতায়, তার ক্ষয়ে না-যাওয়া জীবনীশক্তিতে, তার টিকে থাকার অনমনীয়তায়। সে কোনো সুশোভিত ট্র্যাজেডির চরিত্র নয়; সে এমন এক জীবনসত্য, যার সামনে দাঁড়িয়ে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও বদলে যায়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই ধরনের চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে নন্দনের ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করেছে। অর্থাৎ সে দেখিয়েছেÑ অভাব, ক্লান্তি, অসম লড়াই এবং দারিদ্র্যের মাঝেও মানুষ হয়ে থাকার যে জেদ, তার মধ্যেও এক গভীর দীপ্তি আছে।

পাঁচ. বাসন্তী ও কিশোর

শ্রমজীবী চরিত্রের আলোচনা যদি কেবল ব্যক্তিগত দারিদ্র্য, ব্যক্তিগত ক্ষুধা বা ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার একটি বৃহৎ মাত্রা অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ পূর্ববাংলা ও বাংলাদেশের বাস্তবতায় শ্রম অনেক সময় ব্যক্তির একক অভিজ্ঞতা নয়; তা একটি গোষ্ঠীর ভাগ্য, একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়ের টিকে থাকা, একটি ভূগোলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনরীতির নাম। এখানেই অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম অনন্য তাৎপর্য নিয়ে এসে দাঁড়ায়।

এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় মনে রাখা দরকার। তিতাস একটি নদীর নাম সরলভাবে কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্যিক-নির্মাণ নয়; এটি বৃহত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের এমন এক সৃষ্টি, যার সামাজিক ভূগোল পূর্ববাংলার নদীজীবন, জেলে-সমাজ ও প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক আলোচনায় এটি অন্তর্ভুক্ত হলে তাকে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ-সংলগ্ন পূর্ববাংলার শ্রমজীবী জীবনবাস্তবতার এক পূর্বসূরি ও কেন্দ্রীয় দলিল হিসেবে পড়াই অধিক সঙ্গত।

কিশোরের চরিত্রে প্রথমেই যে সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলোÑ নদীজীবন আসলে এক পরম অনিশ্চয়তার জীবন। নদী এখানে একই সঙ্গে পথ, খাদ্য, ভরসা, আবার ধ্বংসও। জেলের শ্রমে তাই কোনো নিশ্চিন্ত স্থিরতা নেই; প্রতিটি দিনই সম্ভাবনা এবং বিপদের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ নদী দেবে, কাল কেড়ে নেবে; আজ জাল ভরবে, কাল শূন্য হাতে ফিরতে হবে; আজ জীবিকা আছে, কাল জলে কিংবা ভাঙনে সব তলিয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তা কিশোরকে কেবল শ্রমজীবী করে না, তাকে অস্তিত্বগতভাবেও বিপন্ন করে তোলে। সে এমন এক মানুষ, যার জীবন নদীর মর্জির সঙ্গে বাঁধা। ফলে তার শ্রমের মধ্যে কেবল শারীরিক পরিশ্রম নেই; আছে প্রকৃতিনির্ভরতার গভীর উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎহীনতার আচ্ছন্নতা।

কিশোরকে এই অর্থে কেবল ‘জেলে’ বললে তার সম্পূর্ণতা ধরা পড়ে না। কারণ সে একটি পেশার প্রতিনিধি হলেও, তার মধ্যে ধরা পড়ে একটি সমগ্র জীবনভাব। নদী তার জীবিকার ক্ষেত্র, কিন্তু নদী তার মানসিক ভূগোলও। সে নদীকে শুধু ব্যবহার করে না; নদী তাকে গড়ে তোলে, ক্ষয় করে, বহন করে, বিপন্ন করে। তার দেহে যেমন শ্রমের ক্লান্তি, তেমনি তার চেতনায়ও থাকে এক অদৃশ্য দোলাচলÑ জীবন কি নিজের হাতে, না স্রোতের হাতে? এই প্রশ্ন তাকে কেবল পেশাজীবী নয়, অস্তিত্বগত চরিত্রে পরিণত করে।

অন্যদিকে বাসন্তী এই জগৎকে নারীর দিক থেকে উন্মুক্ত করে। তার মধ্যে আমরা দেখি, পেশাজীবী গোষ্ঠীর অন্তর্গত নারীজীবন কীভাবে একই সঙ্গে অভাব, সম্পর্ক, সামাজিক নজরদারি, দেহ, লজ্জা, আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষয়ের মধ্যে আবর্তিত হয়। সে এমন এক নারীমুখ, যার মধ্যে শ্রমজীবী জীবনের জটিলতা সম্পূর্ণ মানবিকতায় ধরা পড়ে। বাংলা কথাসাহিত্য এখানে একটি বড় কাজ করেÑ শ্রমজীবী নারীকে কেবল ত্যাগী বা কেবল নিপীড়িতা করে না; তাকে অনুভূতিসম্পন্ন, মর্যাদাবান, দগ্ধ, জটিল এবং গভীরভাবে জীবনতাড়িত মানুষ হিসেবে নির্মাণ করে।

কিশোর ও বাসন্তীকে পাশাপাশি পড়লে একটি বড় সত্য স্পষ্ট হয়: শ্রমজীবী মানুষের জীবন কখনোই নিছক একক নয়। তাদের শ্রম সমাজ-সংলগ্ন, পরিবেশ-নির্ভর, সম্পর্ক-নির্ধারিত। জেলে-সমাজের মানুষ নদীর সঙ্গে যেমন বাঁধা, তেমনি একে অন্যের সঙ্গেও বাঁধা। ফলে তাদের বিপর্যয়ও ব্যক্তিগত সীমানা ছাপিয়ে সামষ্টিক হয়ে ওঠে। এ কারণেই এই উপন্যাস শ্রমের সামষ্টিক ভূগোল, পেশাভিত্তিক সমাজের অস্তিত্বসংকট এবং বিলীয়মান জীবনপদ্ধতির এক অনন্য দলিল। এখানে নদী কেবল প্রেক্ষাপট নয়; সে যেন ভাগ্যের দীর্ঘ, অস্থির, অনুবাদহীন বাক্য।

আরেকটি দিকে এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিতাস একটি নদীর নামÑ এ শ্রম কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়; তা সংস্কৃতিরও বিষয়। জেলে-সমাজের মানুষের নিজস্ব রীতি আছে, গান আছে, স্মৃতি আছে, সামাজিক সম্পর্কের নিজস্ব বিন্যাস আছে। ফলে তাদের জীবনকে শুধু অভাবে নামিয়ে আনলে তা অসম্পূর্ণ থাকে। এই উপন্যাসের বড় শক্তি, এটি পেশাজীবী সম্প্রদায়ের জীবনকে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঘনত্বসহ ধারণ করে। এই কারণেই বাসন্তী বা কিশোরের ট্র্যাজেডি শুধু ব্যক্তির নয়; এক সমগ্র জীবনবিশ্বের বিলয়চিহ্ন।

নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকেও এরা গুরুত্বপূর্ণ। নদীজীবনের মধ্যে সৌন্দর্য আছে, কিন্তু তা কোনো কৃত্রিম রোমান্স নয়; তা ক্ষণস্থায়ী, বিপন্ন, দগ্ধ সৌন্দর্য। মানুষের সম্পর্কের মধ্যে কোমলতা আছে, কিন্তু তা ভাঙনের সঙ্গেও মিশে আছে। এই মিশ্রতার কারণেই বাসন্তী ও কিশোর কেবল চরিত্র নয়; তারা বিলীয়মান সামষ্টিক জীবনের স্পন্দিত প্রতিমা।

ছয়. তমিজ ও কুলসুম

শ্রমজীবী চরিত্রের আলোচনা এক জায়গায় এসে যদি আরও ঘনীভূত, আরও জটিল, আরও ইতিহাসসংকুল হয়ে ওঠে, তবে তা তমিজ ও কুলসুমের মতো চরিত্রদের ঘিরেই। কারণ এদের জীবন কেবল অভাবের নয়, কেবল শ্রমের নয়, কেবল সামাজিক প্রান্তিকতারও নয়; এদের জীবন এমন এক নিম্নবর্গীয় অস্তিত্বের রূপরেখা, যেখানে স্বপ্ন ও বাস্তব, লোকবিশ্বাস ও ইতিহাস, জমি ও শরীর, শাসন ও আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও বেঁচে থাকার বুদ্ধিÑ সব একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামার তমিজের মধ্যে আমরা দেখি এমন এক মানুষকে, যার জীবনকে নিছক অর্থনৈতিক পরিভাষায় ধরা যায় না। সে পরিশ্রম করে, কিন্তু শ্রমের অর্থ কেবল মজুরি নয়; সে বেঁচে থাকে, কিন্তু প্রতিদিনই অনুভব করে তার অবস্থানের অনিশ্চয়তা; সে বাস্তবের মানুষ, কিন্তু তার ভেতরে কাজ করে ইতিহাস, স্বপ্ন, ভয় এবং লোকবিশ্বাসের ঘন স্তর। ফলে তমিজ কেবল অভাবের দলিল নয়; সে অব্যক্ত ইতিহাসের চরিত্র। ওপরতলার মানুষ ইতিহাসকে ধারণ করে ঘটনাপঞ্জিতে; নিচুতলার মানুষ তা অনুভব করে জমির সংকোচনে, অধিকারহীনতায়, ভয়ের পরিবর্তনে, দৈনন্দিনতার বিপর্যয়ে। তমিজ সেই নিচুতলার ইতিহাসকে শরীর দিয়ে বহন করে।

এখানে ‘স্বপ্ন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। তমিজের জগতে স্বপ্ন বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার আরেক মানসিক কাঠামো। বাস্তব যখন অত্যন্ত কঠিন, অত্যন্ত ক্ষয়িষ্ণু, অত্যন্ত নিষ্ঠুর, তখন মানুষ কেবল রুটির ওপর ভর করে বাঁচে না; সে বাঁচে স্মৃতি, মিথ, গুজব, বিশ্বাস এবং অদৃশ্য আশ্রয়ের ওপরও। এই স্বপ্নময়তা তাকে অবাস্তব করে না, তার বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই জটিলতাকে ধারণ করতে পেরেছে বলেই তমিজ একমাত্রিক হয়নি। সে শুধু দরিদ্র নয়, সে ইতিহাস-দগ্ধ, ভয়গ্রস্ত, আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন এবং মানসিকভাবে ঘনীভূত এক চরিত্র।

কুলসুম এই জগৎকে নারীদিক থেকে উন্মুক্ত করে। তার মধ্যে ইতিহাসের নিচুতলার গৃহস্থ বাস্তবতা, অন্তর্মুখী বেদনা এবং নীরব চাপের জটিলতা সঞ্চিত। সে নীরবতার চরিত্র হয়েও গভীরভাবে উচ্চকণ্ঠ; তার চিৎকার নেই, কিন্তু তার জীবনই কথা বলে। সে দেখায়, নিচুতলার নারীর অভিজ্ঞতা সবসময় প্রকাশ্য সংঘর্ষে ধরা পড়ে না; অনেক সময় তা গৃহস্থ দৈনন্দিনতার আবরণের ভেতরে, আচরণের ভাঁজে, আতঙ্কের আড়ালে, কিংবা অভ্যাসগত সহিষ্ণুতার মধ্যে সঞ্চিত থাকে।

তমিজ ও কুলসুমকে পাশাপাশি পড়লে স্পষ্ট হয়, শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কেবল অর্থনৈতিক রিয়ালিজম দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ তাদের জীবনে মানসিক ভূগোলও আছে। ভয় আছেÑ কিন্তু সে ভয় শুধু অভাবের নয়, অজানারও; আশা আছেÑ কিন্তু সে আশা শুধু উন্নতির নয়, স্থিতিরও; সম্পর্ক আছেÑ কিন্তু তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক চাপ দ্বারা নির্ধারিত। এই জটিলতাই এদেরকে করুণার চরিত্র নয়, ইতিহাসের জটিল বাহকে পরিণত করে। তারা কেবল সময়ের ভুক্তভোগী নয়; সময়ের নীরব ধারকও।

আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, খোয়াবনামা শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক মর্যাদা দেয়। অর্থাৎ নিম্নবর্গীয় মানুষ শুধু দুঃখের বস্তু নয়; তাদের জীবন থেকে সমাজকে বোঝার এক গভীর জ্ঞানও জন্ম নেয়। তারা জানে জমির ভাষা, ভয়ের ভাষা, অভাবের ভাষা, ক্ষমতার সামনে নীরব হয়ে যাওয়ার ভাষা এবং তবু বেঁচে থাকার কৌশল। এই জ্ঞান বইয়ের জ্ঞান নয়, কিন্তু তা তুচ্ছও নয়। ইলিয়াস এই নীরব জ্ঞানকে শিল্পে উন্নীত করেছেন।

সাত. খিজির

শ্রমজীবী চরিত্রের আলোচনা যদি কেবল গ্রাম, নদী, জমি এবং কৃষিনির্ভর সমাজে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূগোল বাদ পড়ে যায়, সেই ভূগোল শহর। কারণ শহরও শ্রমজীবী মানুষের এক অনিবার্য আবাস, যদিও তা কখনওই নিশ্চিন্ত আশ্রয় নয়। বরং শহর অনেক সময় গ্রামীণ অভাবের সম্প্রসারণ, বেকারত্বের ঘনীভবন, অদৃশ্য শোষণের নতুন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার উত্তাপে দগ্ধ আরেক প্রান্ত। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই-এর খিজিরের গুরুত্ব এখানেই। 

খিজিরের জগতে শহর কোনো পরিপাটি আধুনিকতার নাম নয়। তা ঘিঞ্জি, উদ্বিগ্ন, তপ্ত, অনিশ্চিত, এবং অসংখ্য নিম্নবর্গীয় শরীরের গোপন যন্ত্রণায় গঠিত। সে শহরের কেন্দ্রে নয়, শহরের প্রান্তে; শহর তার নয়, সে শহরে আছে মাত্র। শহরের শ্রমে সে অংশ নেয়, শহরের উত্তাপে দগ্ধ হয়, শহরের রাজনৈতিক অভিঘাত বহন করে, কিন্তু শহর তাকে কখনও পূর্ণভাবে নিজের মানুষ বলে স্বীকার করে না। এই দূরত্বই তাকে নগর-প্রান্তিক চরিত্রে পরিণত করে।

খিজিরের জীবন রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতরে অবস্থিত। এখানেই তার গুরুত্ব আরও তীব্র। ওপরতলার মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সংকট একটি সংবাদ; কিন্তু খিজিরের মতো মানুষের কাছে তা ভাতের অনিশ্চয়তা, রাস্তাঘাটের আতঙ্ক, শরীরের হুমকি, জীবিকার ছন্দভঙ্গ, কিংবা আকস্মিকভাবে ইতিহাসে জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা। ফলে খিজিরকে পড়া মানে কেবল একটি নগর চরিত্র পড়া নয়; বরং বোঝা, কীভাবে শহরের নিম্নবর্গীয় মানুষ ইতিহাসের ঢেউয়ে বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, অথচ সেই ইতিহাস লেখার সময় তার কণ্ঠ প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। শহরের দহন তার শরীরে লাগে, কিন্তু ইতিহাসের গৌরব তার নামে লেখা হয় না। এই নির্মম অসাম্যই খিজিরকে স্মরণীয় করে তোলে।

খিজিরের ভেতর দিয়ে শহুরে প্রান্তিকতার একটি বিশেষ নন্দনও ধরা পড়ে। এখানে নদীর স্রোত নেই, ক্ষেতের বিস্তার নেই, উপকূলের নোনা প্রতীক্ষা নেই; এখানে আছে স্নায়বিক উত্তাপ, চেপে-ধরা বিক্ষোভ, ভিড়ের মধ্যে একাকিত্ব, এবং নিচুতলার মানুষের দ্রুত ক্ষয়। ফলে খিজিরের জগতে নন্দন প্রশান্ত নয়; তা দগ্ধ, ঘন, চাপা এবং আধুনিক। এই নন্দন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী মানুষের আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করে। কারণ এতে বোঝা যায়, শ্রমজীবী জীবন শুধু লোকজ বা গ্রামীণ নয়; তা আধুনিক নগরবিক্ষুব্ধও।

আরও একটি জরুরি দিক হলো, খিজিরের চরিত্রে শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান সরল নয়। সে সবসময় কোনো সংগঠিত আদর্শের ভাষায় কথা বলে না; বরং পরিস্থিতির চাপ, ক্ষোভ, বঞ্চনা, আকস্মিকতা এবং বেঁচে থাকার তাৎক্ষণিক প্ররোচনার ভেতর দিয়ে রাজনীতির স্পর্শ পায়। এই স্পর্শ কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট; কখনও উচ্চারিত, কখনও দেহগত। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই অস্পষ্টতার গুরুত্ব বুঝেছে। কারণ নিচুতলার মানুষের রাজনৈতিকতা অনেক সময় মিছিলের স্লোগানে নয়, বরং ক্ষুধার উত্তাপে, শহরের অপমান-অভিজ্ঞতায়, অসম ক্ষমতার সঙ্গে প্রতিদিনের মোলাকাতে গড়ে ওঠে। খিজির সেই রাজনৈতিক নিম্নস্রোতেরই নগর-মানবিক প্রতিমা।

আট. নবিতুন

উপকূলীয় জীবন মানুষকে আরেক ধরনের ভঙ্গুরতায় উন্মোচিত করে। উপকূল মানে অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা, লবণাক্ত ক্ষয়, পুরুষের দূরগমন, প্রতীক্ষার দীর্ঘ সময় এবং জীবনকে প্রায় একা কাঁধে বহন করে নিয়ে চলা নারীর নীরব সংগ্রাম। এখানেই শহীদুল্লা কায়সারের সারেং বৌ-এর নবিতুনের তাৎপর্য। সে এমন এক নারী, যার জীবন দেখিয়ে দেয়Ñ শ্রম সবসময় দৃশ্যমান নয়; অনেক সময় তা অনুপস্থিত কারও ভার বহন করার নাম, প্রতিদিনের গৃহস্থ বাস্তবতাকে পতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার নাম।

নবিতুনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অনুপস্থিতি। কিন্তু এই অনুপস্থিতি শূন্য নয়; তা প্রবলভাবে উপস্থিত। পুরুষ-উপার্জনকারীর দূরত্ব, তার অনিশ্চিত প্রত্যাবর্তন, তার অদৃশ্য আয়ের প্রত্যাশাÑ এসব মিলে নবিতুনের জীবনে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে তাকে কেবল নিজেকে নয়, এক সমগ্র গৃহস্থ জীবনকেও টিকিয়ে রাখতে হয়। এই টিকিয়ে রাখার কাজটিই তার শ্রম। সে হয়তো জাল ফেলছে না, নৌকা বাইছে না, প্রকাশ্য শ্রমবাজারে দাঁড়াচ্ছে না; কিন্তু তার জীবন ততটাই শ্রমসাপেক্ষ, ততটাই ক্ষয়িষ্ণু, ততটাই অনিশ্চিত।

নবিতুনের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়, গৃহও এক শ্রমক্ষেত্র; প্রতীক্ষাও এক শ্রম; সহিষ্ণুতাও এক শ্রম; অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষের জন্য দরজা খোলা রাখাÑ এও এক শ্রম। ফলে সে কেবল অপেক্ষমাণ নারী নয়; সে অদৃশ্য শ্রমের এক গভীর দলিল, গৃহস্থ নীরবতার অন্তর্লিখিত মহাকাব্য।

এখানে সময়ের প্রশ্নটিও জরুরি। নবিতুনের সময় দ্রুত নয়, নদীর মতো বহমানও নয়; তা দীর্ঘ, প্রতীক্ষাময়, ক্ষয়িষ্ণু। কিন্তু এই প্রতীক্ষা নিষ্ক্রিয় নয়। অপেক্ষা করতেও তাকে জীবন সামলাতে হয়, খাদ্যের হিসাব করতে হয়, ভয়ের সঙ্গে বাস করতে হয়, গৃহের ভাঙন রোধ করতে হয়। ফলে তার সময় নিজেই এক শ্রমবিন্যাস। এই কারণে নবিতুনের চরিত্রে যে নীরবতা আছে, তা অবশ নীরবতা নয়; তা বহনের গূঢ় উচ্চারণ।

নবিতুনের গুরুত্ব আরও একটি কারণে গভীর। সে দেখায়, শ্রমজীবী নারীর জীবনকে কেবল দৃশ্যমান উৎপাদনের মানদণ্ডে বিচার করলে তার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। ঘরের ভেতরে যে হিসাব, অপেক্ষা, রাগ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, দমিয়ে রাখা কান্না, সামাজিক মর্যাদা রক্ষার নিঃশব্দ কৌশলও শ্রমের ভেতর পড়ে। সাহিত্য এই অদৃশ্যতাকে দৃশ্যমান করে বলে নবিতুন কেবল এক উপন্যাসের চরিত্র নয়; সে শ্রমধারণার পরিসর প্রসারিত করার এক নৈতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক চাবিকাঠি।

নয়. 

দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের সবচেয়ে গভীর ও জটিল রূপটি বহু ক্ষেত্রে নারীর জীবনেই সঞ্চিত। কারণ শ্রমজীবী পুরুষের দেহে শ্রম দৃশ্যমান হলেও, শ্রমজীবী নারীর জীবনে শ্রম প্রায়শ দ্বিগুণ, এমনকি বহুগুণিত। তাকে শুধু অভাবের সঙ্গে নয়, অভাবের সামাজিক ব্যাখ্যার সঙ্গেও লড়তে হয়; শুধু দারিদ্র্যের সঙ্গে নয়, দারিদ্র্যের নৈতিক বিচারকের সঙ্গেও; শুধু শ্রমের সঙ্গে নয়, শ্রমের অস্বীকৃতির সঙ্গেও।

আবু ইসহাকের জয়গুনের মধ্যে আছে ক্ষুধা, মাতৃত্ব, সামাজিক অপমান ও উন্মুক্ত সংগ্রাম; অদ্বৈত মল্লবর্মণের বাসন্তীর মধ্যে আছে গোষ্ঠীজীবন, নারীদেহ, লজ্জা, সম্পর্ক ও পেশাজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্গত জটিলতা; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কুলসুমের মধ্যে আছে ইতিহাস-ঘন নীরবতা, গৃহস্থ ভেতরকার চাপ এবং নিম্নবর্গীয় নারীঅভিজ্ঞতার মানসিক ঘনত্ব; শহীদুল্লা কায়সারের নবিতুনের মধ্যে আছে প্রতীক্ষা, অনুপস্থিতি, অদৃশ্য গৃহশ্রম এবং বহনের নৈতিক স্থৈর্য। অর্থাৎ বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী নারী কোনো একক ছাঁচে গড়া নয়; বরং বহুরূপী, বহুস্বরিক, বহুস্তরীয়।

এই তুলনামূলক পাঠ থেকে স্পষ্ট হয়, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শ্রম, গৃহ ও বাহির, দেহ ও মর্যাদা, নীরবতা ও বহন, অভাব ও আকাঙ্ক্ষা মিলিয়েই শ্রমজীবী নারীর অভিজ্ঞতা নির্মিত। ফলে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য শ্রমজীবী নারীকে পুরুষ চরিত্রের পার্শ্বচরিত্র করে রাখেনি; বরং তাকে নৈতিক, নন্দনতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক কেন্দ্র করে তুলেছে।

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় : এই চার নারীর সময়-অভিজ্ঞতাও এক নয়। জয়গুনের সময় দ্রুত, ক্ষুধাতাড়িত, অস্থির; বাসন্তীর সময় নদীর মতোÑ সামষ্টিক, ভাঙনমুখী, টলমলে; কুলসুমের সময় ইতিহাসের ভেতরে চাপা, ভারী, নীরব; নবিতুনের সময় দীর্ঘ, প্রতীক্ষাময়, ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া। এই সময়গত বৈচিত্র্য দেখায়, নারীশ্রম শুধু কাজের ধরনে নয়, সময়ের ভেতরেও আলাদা আলাদা রূপ ধারণ করে। এই পাঠ ছাড়া শ্রমজীবী নারীচরিত্রের গভীরতা পুরোপুরি ধরা যায় না।

এই নারীদের আরেকটি মিল আছেÑ তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে সমাজের নৈতিক ব্যর্থতাকে উন্মোচন করে। জয়গুন দেখায় ক্ষুধার সমাজ কীভাবে নারীর শরীর ও মাতৃত্বকে আঘাত করে; বাসন্তী দেখায় পেশাজীবী সামষ্টিকতার ভাঙনে নারী কীভাবে দেহ-মন-সম্পর্কসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; কুলসুম দেখায় ইতিহাসের চাপা প্রবাহ গৃহের অন্তরালে কীভাবে জমে থাকে; নবিতুন দেখায় পুরুষ-নির্ভর অর্থনীতির অনুপস্থিতি নারীর জীবনে কী পরিমাণ অদৃশ্য শ্রমের জন্ম দেয়। ফলে এই চরিত্রগুলোকে একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, শ্রমজীবী নারীর অভিজ্ঞতা কোনো সহায়ক উপাদান নয়; বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের মানবিক ও নৈতিক গভীরতা বোঝার অন্যতম প্রধান দরজা।

দশ. 

প্রান্তের মানুষকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসা মানে শুধু তাদের কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র করে তোলা নয়; বরং তাদের ভাষাকে, বাচনভঙ্গিকে, জীবনবোধকে, ভয়-ভরসা-লোকবিশ্বাস-দৈনন্দিন উচ্চারণের স্বরকে সাহিত্যোপযোগী বলে স্বীকার করা। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য বলা যায় এখানেই তার এক ঐতিহাসিক কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। সে প্রান্তের মানুষকে শুধু দেখে না; তাদের কথা বলার অধিকারও ফিরিয়ে দেয়।

আবু ইসহাকের জয়গুনের জগৎ, অদ্বৈত মল্লবর্মণের বাসন্তী-কিশোরের নদীভাষ্য, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের তমিজ-কুলসুমের লোকবিশ্বাস-ঘন বাচন, খিজিরের নগর-রুক্ষতা, শহীদুল্লা কায়সারের নবিতুনের নীরবতা মিলিয়ে স্পষ্ট হয় যে, শ্রমজীবী মানুষকে প্রমিত ভাষার মসৃণ পরিসরে পুরোপুরি অনুবাদ করা যায় না। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, কৌতুক, অভিমান, ভয়, প্রার্থনা, নীরবতাÑ সবই ভাষার বিশেষ ভঙ্গিতে নির্মিত। বলা বাহুল্য বাংলাদেশের কথাসাহিত্য সেই ভঙ্গিকে মর্যাদা দিয়েছে বলেই তার শ্রমজীবী চরিত্ররা কেবল বিষয় নয়, কণ্ঠস্বরও হয়ে উঠেছে; কেবল উপস্থিত নয়, উচ্চারিতও হয়েছে।

ভাষা এখানে কেবল মাধ্যম নয়, ক্ষমতার প্রশ্নও। প্রমিত ভাষা সাধারণত সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত; অন্যদিকে প্রান্তের ভাষা প্রায়ই অশুদ্ধ, অসাহিত্যিক বা লোকজ বলে আলাদা করে দেখা হয়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই শ্রেণিবিভাজনে হস্তক্ষেপ করেছে। সে দেখিয়েছে, মানুষের গভীরতম সত্য অনেক সময় তথাকথিত পরিশীলিত ভাষায় নয়, আঞ্চলিক, কথ্য, উপভাষিক, লোকায়ত ভাষাতেই সবচেয়ে নিবিড়ভাবে ধরা পড়ে। এই অর্থে প্রান্তের ভাষাকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করাকে বলা যায় ভাষার গণতন্ত্রীকরণ।

নীরবতার ভূমিকাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব প্রান্তিক অভিজ্ঞতা উচ্চকণ্ঠ নয়। নবিতুনের গৃহস্থ বহন, কুলসুমের অন্তর্মুখী দহন, এমনকি জয়গুনের কিছু মুহূর্তÑ এসবের শক্তি অনেক সময় সংলাপে নয়, বিরতিতে; উচ্চারণে নয়, স্তব্ধতায়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই অব্যক্ত অনুভবকেও ভাষা করে তুলেছে। ফলে প্রান্তের ভাষা মানে শুধু লোকভাষা নয়; তা অনুচ্চারিতের সুরও।

এই বাচনিক স্বীকৃতির মধ্যেই বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এক গভীর শিল্পগত সাফল্য অর্জন করে। কারণ প্রান্তিক মানুষের ভাষাকে সাহিত্যে স্থান দেওয়া মানে কেবল রঙিন লোকজ আবহ তৈরি করা নয়; সেই ভাষার ভেতর যে জগৎ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিক ও সামাজিক কাঠামো লুকিয়ে থাকে, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। ভাষা তখন চরিত্রের অলংকার নয়; চরিত্রের অস্তিত্বের শর্ত।

এগারো. 

তবে শ্রমজীবী মানুষ সাহিত্যে প্রবেশ করলেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে না। আবার কখনও সাহিত্য হয়তো প্রান্তিক মানুষকে দৃশ্যমান করে কিন্তু তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকার করে না। তাকে করুণার বস্তু, বেদনাবাহী প্রতীক, কিংবা সমাজবাস্তবতার আবেগময় উপাদান করে রাখে। দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের একটি বড় অর্জন হলো, এটি শ্রমজীবী চরিত্রকে ক্রমশ করুণার অবজেক্ট থেকে ইতিহাসের সাবজেক্টে পরিণত করেছে।

আবু ইসহাকের জয়গুন কেবল মায়ার নয়, মর্যাদার চরিত্র; অদ্বৈত মল্লবর্মণের বাসন্তী কেবল বেদনার নয়, জটিল মানবিকতার চরিত্র; কিশোর কেবল অনিশ্চিত জীবিকার শিকার নয়, এক নদীমাতৃক জীবনসভ্যতার প্রতিনিধি; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের তমিজ ও কুলসুম কেবল নিম্নবর্গীয় নয়, ইতিহাসবাহী; খিজির কেবল বঞ্চিত নয়, রাজনৈতিক সময়েরও চরিত্র; শহীদুল্লা কায়সারের নবিতুন কেবল অপেক্ষমাণ নয়, অদৃশ্য ইতিহাসের নির্মাতা। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই চরিত্রসমূহকে কেবল ‘দুঃখী’ বলে মূল্য দেয়নি; তাদের পূর্ণতা, জটিলতা, সময়বহনের ক্ষমতা এবং মানবিক অর্থবহতার জন্যও মূল্য দিয়েছে।

করুণা সাহিত্যে অপ্রয়োজনীয় নয়; কিন্তু যখন করুণা চরিত্রের সমস্ত জটিলতাকে গ্রাস করে, তখন চরিত্র আর পূর্ণ মানুষ থাকে না, আবেগ উৎপাদনের উপাদানে পরিণত হয়। দেশবিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই সরলীকরণকে অতিক্রম করেছে। সে বুঝেছে, দরিদ্র মানুষ কেবল অভাবের শরীর নয়; সে আকাঙ্ক্ষাসম্পন্ন, লজ্জাসম্পন্ন, স্মৃতিসম্পন্ন, মর্যাদাসম্পন্ন। তার ভেতরে দুঃখ যেমন আছে, তেমনি আছে স্বপ্ন, ক্লান্তি, প্রতিরোধ, নীরবতা, এমনকি সৌন্দর্যেরও অন্যতর রূপ।

এখানে নন্দনও পরিবর্তিত হয়ে যায়। সৌন্দর্য আর শুধু আরাম, অবসর বা মাধুর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সহিষ্ণুতা, সংগ্রাম, বহন, প্রতীক্ষা, ক্ষয় এবং মানুষ হয়ে থাকার অনমনীয়তায়ও সন্ধান পায়। এই অর্থে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য শ্রমজীবী মানুষকে শুধু বিষয় করেনি; তাদের জীবনকে নন্দনেরও অংশ করেছে। সে দেখিয়েছে, দীপ্তি শুধু আরামে নয়, বহনেও আছে, প্রতীক্ষাতেও আছে, অনাহার-অবমাননা সয়ে মানুষ হয়ে থাকার গোপন অবিনশ্বরতায়ও আছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ এই উত্তরণে চরিত্ররা কেবল ‘সমস্যা’ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে ব্যাখ্যাকারী সত্তা। অর্থাৎ তাদের জীবনকে পড়লে সমাজের অন্তর্গত কাঠামো, ইতিহাসের নিচুতলা, ক্ষমতার প্রবাহ, ভাষার শ্রেণি-রাজনীতি, গৃহস্থ শ্রমের অদৃশ্যতাÑ সবই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক শক্তিই তাদেরকে করুণার চরিত্র থেকে ইতিহাসের চরিত্রে উন্নীত করে।

বারো. 

মে দিবস কেবল একটি তারিখ নয়; এটি শ্রমের দৃশ্যমানতা দাবি করার দিন। এটি সেইসব মানুষের স্মরণদিবস, যাদের ঘাম সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়, অথচ যাদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানবিক স্বীকৃতি বারবার পিছিয়ে থাকে। বাংলাদেশের সাহিত্য আমাদের দেখায়, এই বৈপরীত্য কোনো বিমূর্ত সমাজতাত্ত্বিক সমস্যা নয়; তা জয়গুনের ক্ষুধা, বাসন্তীর দহন, কিশোরের অনিশ্চয়তা, তমিজের ইতিহাস-আক্রান্ত জীবন, কুলসুমের নীরব চাপ, খিজিরের নগরদগ্ধ বাস্তবতা, নবিতুনের বহনশীল প্রতীক্ষার মধ্যেই রক্তমাংসের সত্য হয়ে ওঠে।

এই পাঠ আজও জরুরি, কারণ শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা পাল্টালেও তার মৌল সংকট বিলুপ্ত হয়নি; বরং নতুন রূপে ফিরে এসেছে। আজকের বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিক আছে, নির্মাণশ্রমিক আছে, পরিবহনশ্রমিক আছে, জেলেজীবন আছে, নদীভাঙন আছে, উপকূলীয় বিপন্নতা আছে, শহুরে অনিরাপদ নিম্নবর্গ আছে, প্রবাসী শ্রমিকের পরিবার আছে এবং অগণিত নারী আছে যাদের শ্রম গৃহের ভেতর অদৃশ্য থেকে যায়। ফলে দেশ বিভাগোত্তর কথাসাহিত্যের শ্রমজীবী চরিত্রগুলো কেবল অতীতের নথিপত্রাদি নয়; তারা বর্তমানেরও আয়না।

মে দিবস উপলক্ষে সাহিত্যের এই পাঠ হয়তো শ্রম সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রসারিত করবে। গৃহশ্রমও শ্রম, প্রতীক্ষাও শ্রম, দারিদ্র্যের মধ্যে সন্তান টিকিয়ে রাখাও শ্রম, নদীর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করাও শ্রম, ইতিহাসের চাপা অভিঘাত বহন করাও শ্রম, শহরের অদৃশ্য প্রান্তে বেঁচে থাকাও শ্রম। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই প্রসারিত শ্রম-চেতনা নির্মাণে গভীর ভূমিকা রাখে।

এখানে সাহিত্য ও রাজনীতির সম্পর্কও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমত, রাজনীতি দাবি তোলে, সংগঠিত করে, অধিকারের ভাষা দেয়; আর সাহিত্য মুখ দেয়, অন্তর্জীবন দেয়, জটিলতা দেয়, স্মৃতি দেয়। রাজনীতি যে মানুষটির হয়ে কথা বলে, সাহিত্য তাকে জীবন্ত করে তোলে। ফলে মে দিবসের পাঠে সাহিত্যকে ফিরিয়ে আনা মানে কেবল আবেগ সংযোজন নয়; তা শ্রমের মানুষকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে পুনঃদেখা।

এই পুনঃদেখার ভেতরেই আজকের পাঠকের জন্য একটি নৈতিক প্রশ্ন অপেক্ষা করে: আমরা কাদের শ্রম দেখতে পাই, কাদের শ্রমকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, কাদের ঘামকে উৎপাদনের অদৃশ্য ব্যয় হিসেবে মেনে নিই, আর কাদের জীবনের দিকে তাকাতে ভুলে যাই? বাংলাদেশের কথাসাহিত্য শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নটিকেই শিল্পের ভেতরে স্থাপন করতে পেরেছে এ কথা বলা যায়। তাই একটি দিবসের অন্তরালে হলেও এই চরিত্রগুলোকে স্মরণ করা শুধু সাহিত্যপাঠ নয়; তা একই সঙ্গে সমাজপাঠ ও ইতিহাসপাঠ এবং মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিকে পুনর্গঠনের এক জরুরি অনুশীলন।

তেরো. 

দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্য প্রান্তিক মানুষকে কেবল দৃশ্যমান করেনি, তাকে কেন্দ্রীয়ও করে তুলেছে। আর এই কেন্দ্রায়নের সবচেয়ে বলিষ্ঠ উদাহরণগুলোর একটি নিশ্চয়ই শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থান। কারণ শ্রমজীবী মানুষকে সাহিত্যে স্থান দেওয়া আর তাকে সাহিত্যের অর্থময় কেন্দ্র করে তোলাÑ এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। প্রথমটি সহানুভূতির ফল হতে পারে কিন্তু দ্বিতীয়টি দৃষ্টির পরিবর্তনের ফল। দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্য এই দ্বিতীয় কাজটি দৃঢ়ভাবে করতে পেরেছে। 

আবু ইসহাকের জয়গুন, অদ্বৈত মল্লবর্মণের বাসন্তী ও কিশোর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের তমিজ, কুলসুম ও খিজির, শহীদুল্লা কায়সারের নবিতুনÑ এরা প্রত্যেকেই এই পুনর্নির্মাণের পৃথক পৃথক দিগন্ত। এদের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পেরেছি, শ্রমজীবী মানুষকে একমাত্রিক করলে তার মানবিকতা হারায়। তাদের আছে ক্ষুধা, কিন্তু শুধু ক্ষুধা নয়; লজ্জা, জেদ, কামনা, স্মৃতি, প্রতীক্ষা, বেদনা, অপমান, আকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা এবং ভেঙে না-পড়ার এক গোপন অন্তঃশক্তিও আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের কথাসাহিত্য শ্রমজীবী মানুষকে করুণার পাত্রে সীমাবদ্ধ রাখেনি; তাদের ইতিহাসের চরিত্রে উন্নীত করেছে।

এই রূপান্তর কেবল ভাষাগত নয়, নন্দনতাত্ত্বিকও। প্রান্তিক মানুষের ভাষা, বাচন, লোকজ বাস্তবতা, নীরবতার সুর, আঞ্চলিক উচ্চারণ এবং অভিজ্ঞতার নিজস্ব ছন্দ সাহিত্যে মর্যাদা পেয়েছে। ফলে সাহিত্যিক ভাষা বহুস্বরিক হয়েছে, মাটির আরও কাছে নেমে এসেছে। সৌন্দর্যও আর শুধু আরাম, সচ্ছলতা বা মার্জিত সংবেদনশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সহিষ্ণুতা, সংগ্রাম, বহন, প্রতীক্ষা, ক্ষয়, এবং মানুষ হয়ে থাকার অনমনীয়তায়ও সন্ধান পেয়েছে।

ফলে দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শ্রমজীবী চরিত্রের উত্থান আসলে এক গভীর সাহিত্যিক ন্যায়বোধের ইতিহাস। এটি সেইসব মানুষের প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস, যারা সমাজের ভিত নির্মাণ করেও দীর্ঘদিন প্রতিনিধিত্বের আলো থেকে দূরে ছিল। এ ইতিহাসে প্রান্ত শুধু কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে না; বরং প্রান্তের জীবন, ভাষা, দুঃখ, শ্রম এবং মর্যাদাই শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

এই অর্থে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য আমাদের শেখায়Ñ মানুষের গভীরতম সত্য প্রায়ই লুকিয়ে থাকে সেইসব জীবনে, যারা সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে, সবচেয়ে কম উচ্চারিত হয়, তবু নিঃশব্দে পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখে। আর সাহিত্য যখন তাদের দিকে সত্যিকার অর্থে ফিরে তাকায়, তখন শুধু প্রান্তই দৃশ্যমান হয় না; বদলে যায় সমগ্র কেন্দ্রের মানচিত্র, বদলে যায় ‘মানুষ’ শব্দটির অন্তর্গত ব্যঞ্জনাও।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা